Image description
 

শিক্ষা প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) কার্যত অভিভাবকহীন অবস্থায় রয়েছে। গত প্রায় তিন মাস ধরে সংস্থাটির মহাপরিচালক (ডিজি) পদটি শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মাউশির গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি শাখার দায়িত্ব মাত্র দুইজন পরিচালককে অতিরিক্তভাবে পালন করতে হচ্ছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছেন প্রায় ৪০ হাজার সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাউশির একিউএইউ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণ এই তিনটি শাখার পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন মাধ্যমিক শাখার পরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। অন্যদিকে কলেজ ও প্রশাসন শাখার পরিচালক প্রফেসর বি এম আব্দুল হান্নান নিজ শাখার পাশাপাশি মাউশির মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে একজন পরিচালকের ওপর একাধিক শাখার দায়িত্ব পড়ায় নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে।

মাউশি সূত্র জানায়, প্রতিদিন এমপিও সংক্রান্ত ফাইল, বদলি, পদোন্নতি, ইনক্রিমেন্ট, অবসর সুবিধা, প্রতিষ্ঠান অনুমোদনসহ শত শত আবেদন জমা পড়ে। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর না থাকায় বহু ফাইল দিনের পর দিন আটকে থাকছে। এতে শিক্ষক-কর্মচারীদের ঢাকা এসে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অবস্থান করতে হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি ছাড়াই ফিরে যেতে হচ্ছে নিজ নিজ কর্মস্থলে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কলেজ শিক্ষক বলেন, ‘এমপিও সংশোধনের জন্য গত এক মাসে তিনবার শিক্ষা ভবনে এসেছি। প্রতিবারই বলা হচ্ছে পরিচালক সাহেব ব্যস্ত, ফাইল দেখা সম্ভব হয়নি। আমাদের মতো শিক্ষকরা কীভাবে বারবার ঢাকা এসে খরচ বহন করবেন?’ একই ধরনের অভিযোগ করেন কয়েকজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীও।

নিয়মিত পরিচালক না থাকায় মাউশির প্রশাসনিক কাজেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি স্বীকার করেছেন মাউশির ৭ কর্মকর্তা। তারা বলছেন, নিয়মিত পরিচালক না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিয়ে মাধ্যমিক শাখার পরিচালকের কাছে ধরনা দিতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফাইল স্বাক্ষর হতে দীর্ঘ সময় লাগছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রান পেতে নিয়মিত পরিচালক দরকার বলেও জানান তারা।

মাউশির সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক প্রফেসর বি এম আব্দুল হান্নানকে কল দেওয়া হলে তিনি মিটিংয়ে আছেন বলে ফোন কেটে দেন।

তিন মাস ধরে ডিজিহীন মাউশি
মাউশির ডিজি পদটি শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং শিক্ষানীতির বাস্তবায়নে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক অবস্থান। সারা দেশের মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগ, এমপিও ব্যবস্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন, এমনকি পরীক্ষাসংক্রান্ত বিষয়েও এই পদধারীর সিদ্ধান্তের প্রভাব ব্যাপক। কিন্তু দীর্ঘদিন ডিজি না থাকায় এসব কার্যক্রমে কার্যকর সমন্বয় দেখা যাচ্ছে না।

১৫ মাসে তিনজন মহাপরিচালক পরিবর্তনের ঘটনাকে নজিরবিহীন বলছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। সর্বশেষ গত ২২ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কলেজ ও প্রশাসন শাখার পরিচালক প্রফেসর বি এম আব্দুল হান্নানকে ডিজির অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার আগে ১৪ অক্টোবর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আজাদ খানকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। অথচ তার জায়গায় স্থায়ীভাবে নতুন ডিজি নিয়োগ এখনো হয়নি।

জানা গেছে, গত ৬ অক্টোবর নতুন ডিজি নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ পর্যন্ত ৬৩ জন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা এই পদে আবেদন করেছেন। এদের মধ্যে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, কলেজ অধ্যক্ষসহ প্রভাবশালী কর্মকর্তারাও রয়েছেন। শিক্ষা উপদেষ্টার নেতৃত্বে গঠিত সার্চ কমিটি প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাই করবে। এক্ষেত্রে একাডেমিক যোগ্যতা ও প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয়ও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে মাঠপর্যায়ের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। স্কুল-কলেজে নেই কার্যকর মনিটরিং। মাউশির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রেই জানেন না প্রতিষ্ঠানগুলোতে কীভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অথচ মাউশির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অফিস রয়েছে, রয়েছে ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয়ও। এসব কার্যালয়ে পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তাসহ মনিটরিং কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করলেও বাস্তবে নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম চোখে পড়ছে না।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দেশের সব সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশি থেকে একাধিক বিধিমালা প্রণয়ন করা হলেও সেগুলো ঠিকমতো মানা হচ্ছে কি না তা দেখার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মান ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলায়।

শিক্ষা প্রশাসনের এমন অবস্থায় দ্রুত স্থায়ী মহাপরিচালক নিয়োগ এবং শাখাভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ পরিচালক পদায়নের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক সংগঠন ও শিক্ষা বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন এই অচলাবস্থা চলতে থাকলে শিক্ষক-কর্মচারীদের ভোগান্তির পাশাপাশি সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থায় আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (কলেজ) মো: শাহজাহান মিয়া দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘মাউশির ডিজিসহ অন্যান্য শূন্য পদে নিয়োগের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। নির্বাচনের পূর্বে এ পদগুলোতে নিয়োগ দিতে হলে নির্বাচন কমিশনের অনুমতির একটি বিষয় রয়েছে। এজন্য কিছুটা দেরি হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি নির্বাচনের পূর্বেই এ পদগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে।’

সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।