Image description
বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ : আমিনুল

‘খেলতে দেয়া হবে না বা পিচ খুঁড়ে ফেলা হবে’, হিন্দুত্ববাদীদের এমন হুমকির কাছে মাথানত করে আইপিএল থেকে বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেয়ার ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশ অবিলম্বে বাস্তবায়ন করেছে তার ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স কেকেআর। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) নির্দেশের পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি।

এদিকে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ভারতের সরকারি দল বিজেপির নেতা ও ধর্মীয় গুরুরা। তবে বিসিসিআইর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন খোদ ভারতের শান্তিকামী ও ক্রীড়াপ্রেমিকরা। ১৯৮৩ সালে বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় দলের সদস্য মদনলাল এ পুরো ঘটনাকে ‘ওপর মহলের’ চাপে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন। মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) কড়া সমালোচনা করেছেন সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার সদস্য শশী থারুর। ভারতীয় এ রাজনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিক এই প্রশ্নও তুলেছেন, ‘আমরা আসলে কাকে শাস্তি দিচ্ছি-একটি দেশকে, একজন ব্যক্তিকে নাকি তার ধর্মকে।’

এদিকে আগামী ফেব্রুয়ারিতে ভারতে বসতে যাওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা। বিশেষ করে যেভাবে ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে। এ বিষয়ে বিসিবি প্রধান আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সাফ কথা, ক্রিকেটারদের নিরাপত্তাই বিসিবির সবচেয়ে বেশি প্রায়োরিটি। এ বিষয়ে শনিবার রাতে বিসিবির বৈঠকে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানা গেছে।

গতকাল এক বিবৃতিতে কেকেআর জানায়, ‘ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশ অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে মোস্তাফিজুর রহমানকে স্কোয়াড থেকে মুক্ত করা হয়েছে’।
এর কিছু আগে বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে বিসিসিআই কেকেআরকে বাংলাদেশের খেলোয়াড় মোস্তাফিজুর রহমানকে স্কোয়াড থেকে ছাড়তে নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা যদি বিকল্প খেলোয়াড় নিতে চায়, বোর্ড সেই অনুমতিও দেবে’।
যদিও বিসিসিআই বা কেকেআরের পক্ষ থেকে ‘সাম্প্রতিক উন্নয়ন’ বলতে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা হয়নি, তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগ ঘিরে তৈরি হওয়া ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক টানাপোড়েনের মধ্যেই এ সিদ্ধান্ত এসেছে। গত কয়েকদিন ধরে এ ইস্যুতে কেকেআর ও তাদের মালিক শাহরুখ খানকে লক্ষ্য করে সমালোচনাও হয়েছে। এমনকি উত্তর প্রদেশের বিজেপি দলীয় সাবেক বিধানসভা সদস্য সঙ্গীত সোম তাকে ‘গাদ্দার’ বা দেশদ্রোহী বলেও আখ্যায়িত করে।

মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বিজেপি নেতা সংগীত সোম বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলেন, ‘১০০ কোটি সনাতনী ভারতীয়দের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিসিসিআইয়ের এ সিদ্ধান্তের জন্য ধন্যবাদ। আমরা গতকাল বলেছিলাম, এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে, কারণ ১০০ কোটি মানুষের আবেগ-অনুভূতিকে হেলাফেলা করা যায় না। এটি গোটা দেশের হিন্দুদের জয়।’

সংগীত সোম ভারতের উত্তর প্রদেশের সারধানা বিধানসভা আসন থেকে ২০১২ ও ২০১৭ সালের ভোটে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন। ২০১৩ সালে মুজফফরনগর দাঙ্গায় জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
উত্তর প্রদেশের মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা নরেন্দ্র কাশ্যপও বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই, কারণ তারা দেশের আবেগ-অনুভূতি বুঝেছেন এবং বাংলাদেশি খেলোয়াড়টিকে সরিয়ে দিয়েছেন, যেহেতু বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার চলছে-এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং সরকার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।’

মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার দাবিতে সরব ছিলেন আধ্যাত্মিক গুরু দেবকীনন্দন ঠাকুরও। তিনি বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও বলিউড তারকা শাহরুখ খানের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এএনআই দেবকীনন্দনের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে এভাবে, ‘এই সিদ্ধান্তের জন্য বিসিসিআইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার চলছে এবং সেই দেশের একজন খেলোয়াড় যদি আইপিএলে খেলেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। মিস্টার কেকেআর (শাহরুখ খান) এখন পর্যন্ত কোনো বিবৃতি দেননি। এটি বেদনাদায়ক যে, মিস্টার কেকেআর হিন্দুদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন না।’

এদিকে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেয়া নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে খোদ ভারতে। ১৯৮৩ সালে বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় দলের সদস্য মদনলাল এ পুরো ঘটনাকে ‘ওপর মহলের’ চাপে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন।
এ বিষয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’র সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মদন লাল ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, খেলাধুলার ভেতরে রাজনীতির এ অনধিকার প্রবেশ মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। তার মতে, পরিস্থিতির চাপে বিসিসিআই অনেকটা একতরফাভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মদন লাল সোজাসাপ্টা বলেছেন, ‘বিসিসিআই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারণ, তাদের চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা কারো নেই। এমনকি শাহরুখ খানেরও না; কিন্তু খেলাধুলায় কেন এত রাজনীতি ঢুকছে? আমি জানি না ক্রিকেট কোন দিকে যাচ্ছে।’

উল্লেখযোগ্যভাবে, বিসিসিআইয়ের এ ঘোষণার ঠিক একদিন আগেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ২০২৬ সালের ঘরোয়া মৌসুমের সূচি প্রকাশ করে। সেই সূচিতে রয়েছে ভারতের বিপক্ষে তিনটি ওয়ানডে ও তিনটি টি-টোয়েন্টির একটি সাদা বলের সিরিজ, যা মূলত ২০২৫ সালে হওয়ার কথা থাকলেও পরে পুনঃনির্ধারণ করা হয়। এর আগে ফেব্রুয়ারি-মার্চে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিতে বাংলাদেশ দল ভারতের মাটিতে খেলবে।
আইপিএলে মোস্তাফিজের অভিজ্ঞতা নতুন নয়। ২০১৬ সালে টুর্নামেন্টে অভিষেকের পর সানরাইজার্স হায়দরাবাদ, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স, রাজস্থান রয়্যালস, দিল্লি ক্যাপিটালস ও চেন্নাই সুপার কিংসের হয়ে খেলেছেন তিনি। এখন পর্যন্ত ৬০ ম্যাচে তার উইকেট সংখ্যা ৬৫। গত বছরের শেষ দিকে আইপিএল নিলামে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে তাঁকে দলে নেয় কেকেআর, যেখানে দলটি নতুন করে সাজাতে আকাশ দীপ, শ্রীলঙ্কার মাথিশা পাথিরানা ও অস্ট্রেলিয়ার অলরাউন্ডার ক্যামেরন গ্রিনকেও যুক্ত করেছিল।

আইপিএল ২০২৬ মৌসুমের আগে দল পাওয়া একমাত্র বাংলাদেশি ক্রিকেটার ছিলেন মোস্তাফিজ। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) রংপুর রাইডার্সের হয়ে খেলছেন।
এ ঘটনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) শিগগিরই একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, মাঠের বাইরের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা যে ক্রিকেটের সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করছে, মোস্তাফিজ ইস্যুতে সেটাই যেন আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠল।

মোস্তাফিজ ইস্যুর পর ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ : আমিনুল
মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স ছেড়ে দেওয়ায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিতে বাংলাদেশ দলের জন্য ভারত সফর করা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক এবং বিএনপির ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আমিনুল হক। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক এই ফুটবলার।
সংবাদমাধ্যমকে আমিনুল বলেন, ‘সামনে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। মোস্তাফিজ ইস্যুর পরে সে ক্ষেত্রে আমাদের ক্রিকেটাররা ভারতে গিয়ে খেললে একটা শঙ্কার জায়গা থেকে যাবে। সে শঙ্কার জায়গাটা কীভাবে দ্রুত কাটিয়ে উঠবে, সেটা আমি আমাদের ক্রিকেট বোর্ড এবং সরকারের যারা দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের ওপর ছেড়ে দিলাম। আপনারা দ্রুত সময়ের মধ্যে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন, কীভাবে সুরাহা করা যায়।’
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পরবর্তী পর্বের আয়োজক ভারত ও শ্রীলঙ্কা। টুর্নামেন্টটি শুরু হবে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি। তার আগে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) শেষে ২৬ জানুয়ারি ভারতের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে লিটন দাসের দলের।
‘সি’ গ্রুপে পড়েছে বাংলাদেশ। এই গ্রুপের বাকি দলগুলো হলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নেপাল, ইংল্যান্ড ও ইতালি। ৮ ফেব্রুয়ারি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হবে।

উল্লেখ্য, মোস্তাফিজুর রহমানকে কেকেআর দলে ভেড়ানোয় বিজেপি নেতা কৌস্তভ বাগচি সম্প্রতি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন, আইপিএলের কোনো দলে যদি কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটার রাখা হয় এবং কলকাতায় ম্যাচ খেলতে চায়, আমরা তা হতে দেব না। প্রয়োজনে আমরা শাহরুখ খানকেও (কলকাতা নাইট রাইডার্সের কর্ণধারদের একজন) কলকাতায় ঢুকতে দেব না।
আধ্যাত্মিক গুরু দেবকিনান্দান ঠাকুর কলকাতা দল ও শাহরুখের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন মোস্তাফিজকে সরিয়ে দিতে।
মোস্তাফিজকে বাদ দেয়ার দাবি জানান শিব সেনা নেতা সাঞ্জায় নিরুপাম। কংগ্রেস নেতা সুপ্রিয়া শ্রিনাতে প্রশ্ন তোলেন, বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের আইপিএলের নিলামে রাখা হলো কেন? এমনকি অল ইন্ডিয়া ইমাম অর্গানাইজেশনের প্রধান ইমাম উমার আহমেদ ইলিয়াসিও কলকাতার সমালোচনা করে ক্ষমা চাইতে বলেন শাহরুখকে।