আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য নিয়ে নানা বিশ্লেষণ করছেন ভোটাররা। বিশেষ করে হলফনামায় দলগুলোর শীর্ষ নেতারা কি তথ্য দিয়েছেন। কার কি সম্পদ তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বেশি। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে জমা দেয়া মনোনয়নপত্রের সঙ্গে যে হলফনামা জমা দিয়েছেন প্রার্থীরা তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকার সঙ্গে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন। রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট বা কোনো স্থাপনা নেই। আয়কর রিটার্নে মোট সম্পদ রয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকার। এই সম্পদের উৎস হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন শেয়ার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকের আমানত হিসেবে। যেখান থেকে বছরে ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৩৫৩ টাকা আয় করেন তারেক রহমান। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচন করতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর আমীর ড. শফিকুর রহমান হলফনামায় উল্লেখ করেন, তার হাতে নগদ আছে ৬০ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৭ টাকা। পেশা হিসেবে চিকিৎসক উল্লেখ করলেও সেখান থেকে কোনো আয় দেখাননি তিনি। কৃষি খাত থেকে আয় করেন ৩ লাখ টাকা। জামায়াত আমীরের ১৭ লাখ ৭১ হাজার টাকার কৃষিজমি ও ২ লাখ ৫৪ হাজার ৮৩৪ টাকার অকৃষিজমি আছে। এ ছাড়া ২৭ লাখ টাকার ১১ দশমিক ৭৭ শতক জমিতে ডুপ্লেক্স বাড়ি আছে তার।
হলফনামায় পরামর্শক উল্লেখ করা জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বছরে আয় ১৬ লাখ টাকা। নগদ আছে সাড়ে ১৯ লাখ আর ব্যাংকে পৌনে চার লাখ টাকা রয়েছে তার। এ ছাড়া ৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকার গয়না রয়েছে। আয়কর রিটার্নে নাহিদ ৩২ লাখ ১৬ হাজার ১২২ টাকার সম্পদের হিসাব দিয়েছেন। তিনি ঢাকা-১১ আসন থেকে নির্বাচন করতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
কক্সবাজার-১ আসন থেকে ভোট করতে যাওয়া বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের বার্ষিক আয় ৬ কোটি ২১ লাখ ৮৩ হাজার ৬৩৭ টাকা। হলফনামায় আয়ের উৎসে তিনি কৃষি খাত থেকে ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা; বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক স্থান ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি থেকে ভাড়া ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা, ব্যবসা থেকে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকার কথা বলেছেন। এ ছাড়া চাকরি থেকে ২৬ লাখ ৪০ হাজার এবং অন্যান্য উৎস্য থেকে ৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা আয় করেন বলে জানিয়েছেন। তার হাতে নগদ ১ কোটি ৩৫ লাখ ৫২ হাজার ৬৭ টাকা, ব্যাংকে ৩৯ লাখ ৪৯ হাজার ৯৯২ টাকা এবং শেয়ার বাজারে ২৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ থাকার কথা জানিয়েছেন। তিনটি গাড়ি, উপহারের ১২ দশমিক ৩ তোলা স্বর্ণ, ২ লাখ ৪৫ হাজার ৪৭৫ টাকার ইলেকট্রনিক পণ্য, ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৮০০ টাকার আসবাব রয়েছে সালাহউদ্দিন আহমদের। ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে তার। নিজ নামে রয়েছে ৭ কোটি ৮৩ লাখ ৪৯ হাজার ২৬৭ টাকার সম্পদ।
ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচন করছেন বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি হলফনামায় নিজের পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন ব্যবসা, পরামর্শক। এর বাইরে কৃষি, ব্যাংক মুনাফা ও সম্মানী থেকে আয় হয় তার। কৃষি খাতে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা, ব্যবসায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ২৩২ টাকা, পরামর্শক হিসেবে ৬ লাখ টাকা। ব্যাংক মুনাফা থেকে বছরে আয় আসে ৭ হাজার ৯০১ টাকা। ফখরুলের হাতে বর্তমানে আছে ১ কোটি ২৫ লাখ ৫৮ হাজার ১১৬ টাকা ৭৭ পয়সা। বিভিন্ন ব্যাংকে জমা আছে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১৫২ টাকা ৯৬ পয়সা। এর বাইরে ১ লাখ ৪২ হাজার ৮০০ টাকার শেয়ার, ২ লাখ ৯০ হাজার টাকার ইলেকট্রনিক পণ্য ও আসবাব, একটি গাড়ি ও ১০ ভরি সোনা রয়েছে তার। এ ছাড়া ৫ একর কৃষিজমি, ঠাকুরগাঁওয়ের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া দোতলা বাড়ির তার অংশের মূল্য ১০ লাখ টাকা বলে হলফনামায় দেখিয়েছেন তিনি। নিজের নামে ৪ শতাংশ জমির মূল্য ৫ লাখ টাকা। আয়কর রিটার্নে তিনি ১ কোটি ৫২ লাখ ৭৮ হাজার ৮৮৩ টাকার সম্পদের বিবরণ দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে ভোট করার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেয়া বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে নগদ ১ কোটি ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫০ রয়েছে। আয়কর রিটার্নে তিনি ১০ কোটি ৩৪ লাখ ৯৫ হাজার ১৭৭ টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন। পেশা হিসেবে ব্যবসা করার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। আয়কর দিয়েছেন ২৪ লাখ ৪০ হাজার ৫৯২ টাকা। ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচন করতে যাওয়া বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস হলফনামায় তার পেশা দেখিয়েছেন ব্যবসা। তিনি বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক স্থান ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি থেকে ভাড়া পান ৩ কোটি ৪ লাখ ১৭ হাজার ১৮২ টাকা। শেয়ার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানত আছে ৪ কোটি ৯৩ লাখ ১০ হাজার ৩৪১ টাকা। এফডিআর ও ব্যাংক লাভ ১ কোটি ২৯ লাখ ১৭ হাজার ৬০৯ টাকা। হাতে আছে আনুমানিক ২ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এর বাইরে ১ লাখ ২ হাজার ৮৭৫ দশমিক ৭২ মার্কিন ডলার তার কাছে রয়েছে। ব্যাংকে জমা আছে ৭১ লাখ ৪৩ হাজার ৯১৯ টাকা।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নির্বাচন করছেন খুলনা-৫ আসন থেকে। তিনি ব্যবসা থেকে আয় করেন ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা। তার কাছে নগদ ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং ব্যাংকে ৭ লাখ ২৪ হাজার ৭৩৩ টাকা রয়েছে। ২০ লাখ ৭২ হাজার টাকার অকৃষিজমি ও ২ লাখ টাকার একটি ভবন আছে। আয়করে তিনি ৩৭ লাখ ৮১ হাজার ৩৩৬ টাকার সম্পদের হিসাব দিয়েছেন। আয়কর দিয়েছেন ৫ হাজার ৬২৫ টাকা।
এনসিপি’র দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ কুমিল্লা-৪ আসন থেকে নির্বাচন করবেন। তার বছরে আয় ১২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৩৯ টাকা। তিনি পেশা দেখিয়েছেন ব্যবসা। নগদ সাড়ে ১৩ লাখ টাকা, ব্যাংকে ৩ লাখ টাকা আছে তার। আর গয়না আছে ২৬ লাখ টাকার। আয়কর রিটার্নে তিনি ৩১ লাখ ৬৭ হাজার ৬১৯ টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের নির্বাচন করবেন কুমিল্লা-১১ আসন থেকে। মনোনয়নপত্রের হলফনামায় পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন ব্যবসা (চিকিৎসা)। শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানত আছে ২৩৮ টাকার। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মানী পান ১০ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। হাতে নগদ আছে ৫১ লাখ ৮ হাজার ২২৪ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা আছে ২৮ হাজার ৭২৩ টাকা। শেয়ার আছে ২২ লাখ ৫৫ লাখ ৮৭৫ টাকার। ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া ১০.০৭ শতক কৃষিজমি এবং ২২ লাখ ১৬ হাজার টাকা মূল্যের ১৫.৩২ শতক অকৃষিজমি রয়েছে তার।
এনসিপি’র উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম পঞ্চগড়-১ আসন থেকে নির্বাচন করবেন। হলফনামায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী হাতে নগদ ৩ লাখ ১১ হাজার ১২৮ টাকা ও ব্যাংকে ১ লাখ টাকা জমা আছে। তার নামে দানকৃত কৃষিজমি আছে সাড়ে ১৬ শতক। ব্যবসা থেকে তার আয় ৯ লাখ টাকা। আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী তার মোট সম্পদের মূল্য ৩৩ লাখ ৭৩ হাজার ৬২৮ টাকা।
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর নির্বাচন করবেন পটুয়াখালী-৩ আসনে। হলফনামায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী মোট সম্পদের পরিমাণ ৮৯ লাখ ৮২ হাজার ৮৪১ টাকা। ব্যবসা থেকে ১৫ লাখ ৮৫ হাজার ৪২৬ টাকা ও অন্যান্য উৎস থেকে আয় ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৬২২ টাকা। সব মিলিয়ে তার বছরে আয় ২০ লাখ ৪০ হাজার ৪৮ টাকা। হাতে নগদ রয়েছে ২৮ লাখ ৩৮ হাজার ২১৭ টাকা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা আছে ২ লাখ ৮৯ হাজার ৩১৩ টাকা। ৮২ শতক কৃষিজমি ছাড়াও পৌনে ২ লাখ টাকার কোম্পানির শেয়ার রয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অন্যান্য আমানত হিসেবে দেখানো হয়েছে ৫৫ লাখ ৮০ হাজার ৩১১ টাকা।