গণতন্ত্র উত্তরণের প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বছর। আসছে ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে। একই সময়ে হবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোট। সুষ্ঠুভাবে এই নির্বাচন আয়োজনই এই মুহূর্তে সরকার এবং নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হলে পরবর্তী সরকারের সামনেও অপেক্ষা করছে অনেক চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক সংকট সামাল দেয়া হবে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এর বাইরে বৈদেশিক সম্পর্ক জোরদার এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি এবং ’২৪ এর গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সম্ভাব্য সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া হবে নির্বাচিত সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন বছরের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা। নির্বাচন আয়োজনে ইতিমধ্যে সরকার ও নির্বাচন কমিশন নানা প্রস্তুতি নিচ্ছে। সশস্ত্র বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট সব বাহিনীও প্রস্তুত নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করতে। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মাঠের অবস্থা কতোটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে তা নিয়ে শঙ্কা আছে। বিশেষ করে নির্বাচনে না থাকা গণ-অভ্যুত্থানে পরাজিত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের অবস্থান কি হয় সেটি নিয়ে ভাবছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলো এই নির্বাচনে কেমন আচরণ করে এটিও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের বিষয়ে বিশ্লেষক প্রফেসর দিলারা চৌধুরী বলেন, দেশের সব রাজনৈতিক দলকে বিএনপি, জামায়াতসহ একটি সাধারণ অবস্থানে পৌঁছাতে হবে, যা বর্তমান বাস্তবতায় নতুন বাংলাদেশের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, দেশের সব রাজনৈতিক দলকে রাষ্ট্রের মূল স্বার্থের বিষয়ে একটি সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। ভারতের আধিপত্যবাদ প্রত্যাখ্যান করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়ে সকল দলের একমত হওয়া জরুরি। ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো ফ্যাসিবাদী সরকার ক্ষমতায় আসতে না পারে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। গণতন্ত্রের চর্চা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে একে অপরকে দমনের পরিবর্তে সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। গণতন্ত্রের চর্চায় একে অপরকে ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর জোর দিয়ে প্রফেসর দিলারা চৌধুরী সতর্ক করে বলেন, ‘যদি রাজনৈতিক দলগুলো দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে না পারে, তবে দেশ বড় ধরনের সংকটে পড়বে এবং ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। আমাদের প্রত্যাশাই হলো এই সকল বিষয় সুচারুভাবে সম্পন্ন হওয়া। তিনি মনে করেন, জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্যই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পথচলাকে সুরক্ষিত করতে পারে।
নির্বাচিত সরকারের সামনে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন। আওয়ামী লীগের সময়ে লুটপাট ও অনিয়মের কারণে অর্থনৈতিক অবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। লুটপাটে বিপর্যস্ত ব্যাংক খাত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নানা উদ্যোগে পরিস্থিতি কিছুটা সামনে উঠতে পারলেও নির্বাচিত সরকারকে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা ব্যবসায়ীদের আস্থা তৈরির কাজটিও করতে হবে নির্বাচিত সরকারকে।
নতুন বছরের চ্যালেঞ্জের বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, চলমান ধারাবাহিকতা বিবেচনা করলে দেশের অর্থনীতিতে একটি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দিক থেকে ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক বছর হতে পারে। অর্থনীতি ও রাজনীতি আলাদা হলেও বাস্তবে তারা গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। তিনি বলেন, যদি নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি তুলনামূলকভাবে মসৃণ রাজনৈতিক উত্তরণ ঘটে, তাহলে বর্তমানে যে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে, তা অনেকটাই কেটে যাবে। এ ছাড়া বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষায় আছেন। এক ধরনের স্থবিরতা ছিল। কেউই নতুন করে ঝুঁঁকি নিতে চাইছেন না। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে গেলে আস্থা কিছুটা ফিরবে। এমন পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও মজুরিতে কিছুটা উন্নতি দেখা যেতে পারে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দিকে যেতে পারে এবং চাকরির বাজারেও ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে সবই নির্ভর করবে নীতিনির্ধারণের ধারাবাহিকতা ও সংস্কারের ওপর বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন নতুন বছরটি দেশের দিক পরিবর্তনের একটি বছর হতে যাচ্ছে যদি নির্বাচন এবং রাজনৈতিক উত্তরণ সঠিকভাবে হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর নুরুল আমিন বেপারী মানবজমিনকে বলেন, ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে আমাদের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা দুটোই আছে। ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সরকার গঠন কোন প্রক্রিয়ায় হবে, তা নিয়ে সবারই কৌতূহল রয়েছে। আমার ধারণা, বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন। সেক্ষেত্রে তিনি পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কোন পলিসি গ্রহণ করবেন? ভারতের সঙ্গে তার নীতি কেমন হবে? এ নিয়ে কৌতূহল আছে। তবে তিনি তার পিতা-মাতার (জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া) অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবেন এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা। বিশেষ করে বিরাটসংখ্যক ব্যাংকের নাজুক অবস্থা এবং গত ১৫ বছরে বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে নতুন সরকারকে। এ ছাড়া ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করাটাও সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জের হবে।
প্রত্যাশার বিষয়ে তিনি বলেন, চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধান করাই হবে আমাদের মূল প্রত্যাশা। আমরা একটি গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা করি, যেখানে পার্লামেন্ট বা সংসদ সুন্দরভাবে চলবে এবং বিরোধী দল সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারবে। বাংলাদেশে ব্যক্তি স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং গণতন্ত্রের শুধু পরিমাণগত নয়, বরং গুণগত উন্নয়ন হবে ।
তিনি বলেন, অর্থনীতির ক্ষেত্রে কৃষকদের উন্নয়ন এবং ‘প্রিন্সিপাল মিনস অব প্রোডাকশন’ বা উৎপাদনের উপায়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে ম্যানুফ্যাকচারিং ও ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে আরও উন্নত করতে হবে। যদি এই চ্যালেঞ্জগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করা যায়, তবে সামনে যে সরকার আসবে তারা সফলভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।