বিদায়ী বছরে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কে নতুন গতি পেয়েছে। বিপরীতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এ ছাড়া চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। তবে গত এক বছরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো গতি আসেনি।
ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কে গতি
গত বছর ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কে গতি এসেছে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
গত বছর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বেশ কয়েকটি সফর বিনিময় হয়েছে।
পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান গত ২১-২৪ আগস্ট ঢাকা সফর করেন।
অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী চলতি বছর পাকিস্তান সফর করেন। এ ছাড়া ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন গত ৩ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানে ১০ দিনের সফরে যান। এসব সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক গভীর হয়েছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, কেউ কেউ বলেন আমরা নাকি পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছি। কিন্তু আমরা আদৌ কোনো ঝোঁক নিচ্ছি না। আমরা যা করছি, তা হলো পাকিস্তানের সঙ্গে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, যাতে আমাদের স্বার্থ রক্ষা পায়।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক তলানিতে
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বিভিন্ন ইস্যুতে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে টানাপোড়েন চলে আসছিল। তবে গত বছর সেই টানাপোড়েন আরও বৃদ্ধি পায়। বছরের শেষে এসে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
৫ আগস্টের পর থেকেই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা, বাণিজ্য বিধিনিষেধ, পুশ-ইন, ভিসা বন্ধ, সীমান্ত হত্যাসহ নানা ইস্যুতে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে তিক্ততা ও টানাপোড়েন চলে আসছে। গত বছর এসব ইস্যুতে টানাপোড়েন আরও তীব্র হয়েছে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে নিরাপত্তা ইস্যু।
বছরের একেবারে শেষ সময়ে এসে নিরাপত্তা ইস্যু ঘিরে দুই দেশের হাইকমিশনারকে দফায় দফায় তলব ও পাল্টা তলবের ঘটনাও ঘটে। ভারতের নয়াদিল্লি, কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে থাকা বাংলাদেশ মিশনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে দুই দফা তলব করা হয়। বিপরীতে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনারকেও তলব করে বাংলাদেশে থাকা ভারতের মিশনগুলোর নিরাপত্তা চাওয়া হয়।
২০২৫ সালে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কোনো সফর বিনিময় হয়নি। তবে ৪ এপ্রিল থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বৈঠকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত হত্যা, গঙ্গা চুক্তি নবায়ন এবং তিস্তা নদীর পানিবণ্টনসহ বিভিন্ন ইস্যু আলোচনায় তোলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য
অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, চীন, রাশিয়াসহ বড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে আসছে। বিশেষ করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমানতালে সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যেও বাংলাদেশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো বাংলাদেশের চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর না করাকে পছন্দ করলেও ঢাকা নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার দিকেই বেশি মনোযোগী, কোনো নির্দিষ্ট বলয়ের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে আগ্রহী নয়।
এদিকে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি হয়েছে। এ উপলক্ষে দুই দেশের মধ্যে নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ৫০ বছর পূর্তিতে চলতি বছর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীন সফর করেন। সে সময় দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা সই হয়।
ভিসা সুবিধা কমেছে
চলতি বছর বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পর্যটক ভিসা সুবিধা কমেছে। অনেক দেশের ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের কারণে বাংলাদেশিদের ভিসা জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ভিসা নিয়ে মানব পাচারের ঘটনাও থেমে নেই। এতে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে।
এ কারণে বিভিন্ন দেশ ভিসা নীতিতে পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশিদের জন্য তারা ভিসায় কড়াকড়ি আরোপ করেছে। চলতি বছর অনেক দেশ অন-অ্যারাইভাল ভিসাও বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইতালি, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশের ভিসা সুবিধা কমেছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গতি নেই
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কোনোভাবেই সম্ভব হয়নি।
২৪-২৬ আগস্ট কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৪০টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন। এই সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। এ ছাড়া ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি’ বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাত দফা প্রস্তাব দেন।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু যেন কোনোভাবেই হারিয়ে না যায়, সেই চেষ্টা আমরা করছি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইস্যুটি আমরা তুলে ধরেছি। তারা যেন রোহিঙ্গা ইস্যুকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।