Image description

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার গত ফেব্রুয়ারিতে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে সন্ত্রাসী ও অস্ত্রবাজদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করে। দীর্ঘদিন চলার পর সেই অভিযান কিছুটা শিথিল হয়ে পড়ে। যদিও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো বরাবরই দাবি করে আসছে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজসহ সব ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান নিয়মিতভাবে চলমান রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, যারা দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট করছে তাদের ‘ডেভিল’ আখ্যায়িত করে অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে অপারেশন ডেভিল হান্ট। পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে বৃহত্তর পরিসরে পরিচালিত এই যৌথ অভিযানটির প্রথম দফা ঘোষণা করা হয় গত ৮ ফেব্রুয়ারি। আনুষ্ঠানিকভাবে ফেজ-১-এর অভিযান চলে ২ মার্চ পর্যন্ত। এরপর নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকলেও সেটিকে আর ডেভিল হান্ট অপারেশন হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ফেজ-১ অভিযানে মোট ১২ হাজার ২২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় ৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১৮৮টি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে ধারাবাহিক অভিযানে বিভিন্ন মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিসহ গ্রেফতার করা হয় আরও কয়েক হাজার জনকে।

তবে পুলিশ সদর দফতরের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ফেজ-১-এ গ্রেফতার হওয়া অপরাধী ও মামলার আসামিদের বড় একটি অংশ পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়। যার সঠিক সংখ্যা বা তথ্য পুলিশের কাছে নেই।

এরই মধ্যে গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরীফ ওসমান বিন হাদিকে গুলির ঘটনা ঘটে। ১৮ ডিসেম্বর তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান ওরফে রাহুল আগে ডেভিল হান্ট অভিযানে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে ছিলেন। পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে পুলিশ ও র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

 

এই ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হলে ১৩ ডিসেম্বর থেকে অপারেশন ডেভিল হান্টের দ্বিতীয় দফা বা ফেজ-২ ঘোষণা করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.)।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা ফয়সল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ফেজ-২ অভিযানে ১৩ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ হাজার ৩৭৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সময়ে উদ্ধার করা হয়েছে ১০৭টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৫৩ রাউন্ড গুলি, ১৬৯ রাউন্ড কার্তুজ, ৮৯টি দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেনেড, মর্টারের গোলা, গানপাউডার, আতশবাজি ও বোমা তৈরির বিভিন্ন উপকরণ। পাশাপাশি বিভিন্ন মামলায় ওয়ারেন্টভুক্ত আরও ১২ হাজার ৩৪৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। সব মিলিয়ে এ সময়ে গ্রেফতার সংখ্যা দাঁড়ায় ২২ হাজার ৭২৫ জন।

এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-১-এর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে পরবর্তীতে পরিস্থিতির আবারও অবনতি হওয়ায় ফেজ-২ শুরু করতে হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ফেব্রুয়ারিতে প্রথম দফায় ব্যাপক গ্রেফতার হলেও জামিনে মুক্তি পেয়ে অনেক অপরাধী পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। কারও কারও বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, ‘হঠাৎ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি করছে। এ কারণেই সরকার দ্বিতীয় দফায় ডেভিল হান্ট অভিযান শুরু করেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও সন্ত্রাসীদের হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে। তবে এখনও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শিথিল হলে অপরাধীরা আরও সক্রিয় হয়ে উঠবে, যা নির্বাচনকালীন পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।’

এদিকে সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) পুলিশ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় আইজিপি বাহারুল আলম মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যেকোনও মূল্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে হবে। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।’ পাশাপাশি থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে তৎপরতা বাড়ানো এবং সরকার ঘোষিত পুরস্কারের বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচারের নির্দেশ দেন তিনি।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) বলেন, ‘বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভেতরে ফ্যাসিস্টের দোসর, সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীরা ওত পেতে রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়টি না জেনেই এসব ব্যক্তিকে দলে স্থান দেওয়া হচ্ছে। দলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এসব সুযোগসন্ধানী দুষ্কৃতকারীদের চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।’

সর্বশেষ বিজিবি দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি বিজিবি সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘কোনও অপরাধী বা সন্ত্রাসী যাতে সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে, সে বিষয়ে আরও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।’