গত ৩ ডিসেম্বর ব্যারিষ্টার জাইমা রহমান নামের আইডি থেকে তারেক রহমান দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন এমন খবর জানিয়ে একটি পোস্ট করা হয়। বিমানের সিটে বসা তারেক রহমানের একটি ছবিও সাথে যুক্ত করা হয়। পোস্টে লেখা হয়, ‘‘কাতার এয়ারলাইন্সের A101 বিমানে ইতোমধ্যেই দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন দেশনেতা। নেতা কর্মীদের জন্য আছে চমক।’’
উক্ত পোস্টে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ হাজার মানুষ রিয়েকশন দিয়েছেন। ১ হাজার ৮শ জন পোস্টে কমেন্ট করেছেন এবং দেড় হাজার জন পোস্টটি শেয়ার করেছেন। পোস্টের কমেন্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেশিরভাগ মানুষ পোস্টটি বিশ্বাস করে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ এবং ‘ফি আমানিল্লাহ’ লিখে কমেন্ট করেছেন। অথচ খবরটি ছিল অসত্য। তারেক রহমান আগামীকাল ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার কথা রয়েছে। ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার যাচাই করে জানিয়েছে ফেসবুক পোস্টে শেয়ার করা ছবিটি এআই জেনারেটেড।
এর আগের দিন ২ ডিসেম্বর একই আইডি থেকে তারেক রহমান দেশে ফিরছেন দাবি করে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরের একটি ভিডিও ক্লিপ ছড়ানো হয়। তবে দ্য ডিসেন্ট সে সময় জানিয়েছিল এ দাবিটিও অসত্য। চলতি বছরের জুন মাসে স্ত্রী ডা. জুবাইদা বাংলাদেশ থেকে লন্ডনে পৌঁছালে তারেক রহমান তাঁকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান। ভিডিওটি সে সময় ধারণ করা।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের বড় মেয়ে ব্যরিস্টার জাইমা রহমানের নামে খোলা এই আইডিতে ফলোয়ার সংখ্যা ২ লক্ষ ৩৪ হাজার। আইডিটি থেকে নিয়মিত বিএনপির পক্ষে প্রচারণা চালানো হয়। তবে এই আইডিটি ভুয়া।
জাইমা রহমানের প্রকৃত ফেসবুক আইডিটি ভিন্ন। তিনি সম্প্রতি তার ফেসবুক আইডি খুলেছেন এবং তা বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। ডিসেম্বরের ২৪ তারিখ পর্যন্ত প্রকৃত আইডিতে ফলোয়ার সংখ্যা ১ লক্ষ ২৩ হাজার।
জাইমার নামে পরিচালিত ভুয়া ফেসবুক আইডির এক্টিভিটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আইডিটি থেকে Mohammed Azizul Hoque নামের এক ব্যক্তির পোস্ট নিয়মিত শেয়ার করা হয়। এবং অনেক ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির আইডিতে করা একই পোস্ট ব্যারিষ্টার জাইমা রহমান নামক আইডিতেও পোস্ট করা হয়। এই ব্যক্তিই এই প্রোফাইল চালান কিনা তা নিশ্চিত হতে পারেনি দ্য ডিসেন্ট।
Mohammed Azizul Hoque আইডির ট্রান্সপারেন্সি অনুযায়ী এই ব্যক্তি সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী। যিনি নিজেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা চেতনা দল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সভাপতি হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন।
জাইমা রহমানের নামে এমন শুধু একটি নয়, আরও বেশ কয়েকটি আইডি ও পেইজ পরিচালিত হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। এভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের বা তাদের পরিবারের সদস্যদের নামে বহু ভুয়া আইডি ও পেইজ পরিচালিত হচ্ছে। তবে দ্য ডিসেন্ট এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১ লক্ষ ফলোয়ারের বেশি এমন ভুয়া পেইজগুলোর বেশিরভাগই বিএনপির নেতা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নামে। এসব পেইজ থেকে প্রায়ই অসত্য তথ্য এবং অনেক সময় অসংলগ্ন কন্টেন্ট শেয়ার করা হয়, যা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদেরকে বিভ্রান্ত করে।
এসব ফেইক আইডি ও পেইজের মধ্যে ফলোয়ার সংখ্যা ১ লক্ষের অধিক এমন ১১টি পেইজ/আইডি রয়েছে বিএনপির শীর্ষ নেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নামে। দুটি পাওয়া গেছে জামায়াতে ইসলামীর দুই নেতার নামে। এর বাইরেও ১ লাখের নিচে ফলোয়ারযুক্ত অসংখ্য পেইজ রয়েছে দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতাদের নামে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার সহধর্মিনী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে ব্যরিস্টার জাইমা রহমান, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার নামে রয়েছে এসব ভুয়া আইডি ও একাউন্ট।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য এবং ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. মু শফিকুল ইসলাম মাসুদ ও ইসলামী বক্তা এবং কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের জামায়াতের মনোনীত সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থী মুফতি আমির হামজার নামেও একটি করে ভুয়া পেইজ রয়েছে।
আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নামে পরিচালিত ভুয়া আইডিগুলো থেকে প্রচার করা অসত্য তথ্য ভোটারদরে আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে এমন বিবেচনায় দ্য ডিসেন্ট এই ধরনের ভুয়া পেইজ ও আইডিগুলোর মধ্যে যেগুলোর ফলোয়ার এক লাখের বেশি সেগুলোর তালিকা এই রিপোর্টে তুলে ধরেছে। পাশপাশি কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তির ভুয়া আইডি থেকে কী প্রচার করা হয় তারও বিশ্লেষণ করেছে।
ভুয়া আইডিগুলো চিহ্নিত করতে প্রথমে দ্য ডিসেন্ট নিজস্ব পদ্ধতি অবলম্বন করে প্রাথমিক সন্দেহজনক তালিকা তৈরি করেছে। এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে যে, এই পেইজগুলো ভুয়া।
১ লাখের বেশি ফলোয়ার যুক্ত ১৩টি পেইজের মধ্যে বিএনপি নেতাদের নামে পরিচালিত ১১টি যে ভুয়া পেইজ তা নিশ্চিত করেছেন বিএনপির তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান। আর জামায়াতের দুই নেতার নামে পরিচালিত পেইজগুলো ভুয়া বলে নিশ্চিত করেছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এড. এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
১ লাখের বেশি ফলোয়ারযুক্ত ১৩টি পেইজের বাইরেও আরও কয়েকশত পেইজ ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত করেছে দ্য ডিসেন্ট। নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো
সবচেয়ে বেশি ভুয়া একাউন্ট জাইমা রহমানের নামে
সবচেয়ে বেশি ভুয়া পেইজ ও আইডি পাওয়া গেছে তারেক রহমানের বড় মেয়ে ব্যরিস্টার জাইমা রহমানের নামে।
ফেসবুকে বাংলা এবং ইংরেজিতে জাইমা রহমানের নামের বানান ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সার্চ করে অন্তত ১৫৫টি আইডি ও ১৬০টি পেইজ খুঁজে পেয়েছে দ্য ডিসেন্ট। এসব পেইজ ও আইডি থেকে বিএনপির পক্ষে ও অন্যান্য দলের বিপক্ষে প্রচারণা, নানা ভুয়া তথ্য ছড়ানো, জাইমা রহমানের নানা ছবি শেয়ার, জাইমা রহমানের ছবি ব্যবহার করে নানা এআই ভিডিও কনটেন্ট বানানো হয়।
এরমধ্যে ফলোয়ারের দিক থেকে বড় ৪টি আইডি ও পেইজের এক্টিভিটি পর্যালোচনা করা হয়েছে, যার প্রত্যেকটির ফলোয়ার লক্ষাধিক। এরমধ্যে প্রায় ৩ লক্ষ ফলোয়ারবিশিষ্ট পেইজ Zaima Rahman। পেইজের ইন্ট্রোতে এটি জাইমা রহমানের একমাত্র অফিসিয়াল পেইজ হিসেবে দাবি করা হয়েছে। ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল পেইজটি খোলা হয়। পেইজের এডমিন একজনই, যিনি বাংলাদেশেই অবস্থান করেন।
পেইজের শেষ ৩০টি কনটেন্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মূলত জামায়াতের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হয় এই পেইজ থেকে। পাশাপাশি অন্যান্য কিছু রাজনীতিবিদ ও এক্টিভিস্টদেরকে ট্রল এবং সরকারের নানা পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের সমালোচনা করা হয়।
জাইমা রহমানের নামে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফলোয়ারবিশিষ্ট ফেইক পেইজ ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। পেইজটি ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ খোলার পর ৪ দফা নাম পরিবর্তন করা হয়। এরমধ্যে চলতি বছরের ২২ জুন তৃতীয় দফায় পরিবর্তিত নাম ছিল Anis Rahman। পরে ৮ অক্টোবর বর্তমান নামটি দেওয়া হয়। এই পেইজেরও এডমিন একজনই, যিনি সৌদিআরব প্রবাসী।
পেইজের শেষ ৩০টি কন্টেন্ট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিএনপির পক্ষে নানা পোস্ট করা হয়। অনেকক্ষেত্রে জাইমা রহমানের ডিপফেক ভিডিও এবং ভুয়া ফটোকার্ডও পোস্ট করা হয়েছে।

জাইমা রহমানের আসল পেইজ মনে করে কমেন্ট করেন অনেকে।
১ লক্ষ ৭০ হাজার ফলোয়ারবিশিষ্ট আরেকটি পেইজ Zaima Rahman। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল তৃণমূল নামে ২০১৪ সালের ১৮ অক্টোবর পেইজটি খোলা হয়। বিএনপি সংবাদ, Bnpnews24 সহ নানা নামে ৭ দফা নাম পরিবর্তন হয় মাঝখানে৷ এই পেইজের এডমিন একজনই, যিনি বাংলাদেশেই বসবাস করেন।
পেইজের শেষ ৩০টি কন্টেন্টের বিশ্লেষণে দেখা যায়, গুজব প্রচার, বিএনপির পক্ষে ইনফ্লুয়েন্স তৈরি, জামায়াত এবং ডাকসু নেত্রী ফাতেমা তাসনিম জুমার বিপক্ষে প্রচারণা করা হয়েছে পেইজটি থেকে।
২ লক্ষ ৩০ হাজার ফলোয়ারবিশিষ্ট সবচেয়ে জনপ্রিয় আইডি ব্যারিষ্টার জাইমা রহমান। আইডিটি নিয়ে প্রতিবেদনের শুরুতে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে জাইমা রহমানের রিয়েল ফেসবুক পেইজ রয়েছে। নাম Zaima Rahman। চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর পেইজটি খোলা হয়েছে।
ডা. জুবাইদা রহমানের নামে ৭০টি ভুয়া একাউন্ট
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমানের নামেও অন্তত ৭০টি ফেসবুক একাউন্ট ও পেইজ রয়েছে ফেসবুকে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ফলোয়ার আছে এমন ৩টি পেইজ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ ৯৯ হাজার বিশিষ্ট পেজ ডাঃ জোবাইদা রহমান। ‘Dr. Zobaida Rahman ডাঃ জোবাইদা রহমান’ নামে পেইজটি খোলা হয় ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট। ২০২৭ সালের ৩ মার্চ এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ছাত্র দল বিজয় নগর’। একই বছরের ৪ ডিসেম্বর আরেক দফা নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ডাঃ জোবাইদা বিজয় নগর’ এবং সর্বশেষ একই বছরের ১৪ ডিসেম্বর ‘ডাঃ জোবাইদা রহমান’ নামটি দেওয়া হয়।
পেইজটিতে ৫ জন এডমিনের মধ্যে ৪ জনের প্রাইমারি লোকেশন সৌদিআরব ও একজন বাংলাদেশে। পেইজের প্রোফাইল ফটো হিসেবে বর্তমানে বেগম খালেদা জিয়ার ছবি দেওয়া। তবে পূর্বের অনেকবার প্রোফাইল ফটো হিসেবে ডা. জুবাইদা রহমান ও তারেক রহমানের ছবি ছিল।
পেইজের শেষ ৩০টি পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিএনপির পক্ষে ও জামায়াতের বিপক্ষে পোস্ট করা হয়।
এই পেইজ থেকে Ismail Bin Aziz, মোহাম্মদ মারুফ এবং Monaiyem Monna নামের ৩টি আইডিকে নানা পোস্টে ট্যাগ করা হয়। এবং এসব ব্যক্তিদের পোস্টও পেইজ থেকে শেয়ার করা হয় নানা সময়ে। উক্ত ৩ আইডির সবাই সৌদিআরব প্রবাসী। তবে এই ব্যক্তিরা পেজ পরিচালনার সাথে যুক্ত কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
৪ লক্ষ ৭৭ হাজার ফলোয়ারবিশিষ্ট আরেকটি পেইজ আছে ড. জুবাইদা রহমানের নামে। পেইজটি খোলা হয় ২০১৬ সালের ৪ মার্চ। এই পেইজের ৩জন এডমিনের ৩জনেরই প্রাইমারি লোকেশন মালয়েশিয়ায়। বিএনপির পক্ষে কিছু পোস্ট ও তারেক রহমানের পারিবারিক কিছু ছবি পোস্ট করা হয়েছে উক্ত পেইজ থেকে।
ডা জুবাইদা রহমান নামে ১ লক্ষ ফলোয়ার বিশিষ্ট একটি আইডি আছে ফেসবুকে। তারেক রহমান, জাইমা রহমান এবং জুবাইদা রহমানের নানা ডিপফেক ভিডিও বানিয়ে আপলোড করা হয় আইডিটি থেকে। চালানো হয় বিএনপির পক্ষে প্রচারণাও।
উক্ত আইডির কন্টেন্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইতিপূর্বে চিহ্নিত করা জাইমা রহমান এর নামে পরিচালিত ভুয়া পেইজ ব্যারিষ্টার জাইমা রহমান আইডিতে পোস্ট করা নানা কন্টেন্ট ডাঃ জুবাইদা রহমানের ভুয়া আইডিতেও পোস্ট করা হয়েছে। এবং এই আইডির নানা পোস্টে ব্যারিষ্টার জাইমা রহমান আইডি থেকে কমেন্টও করা হয়েছে। পাশাপাশি জাইমার ভুয়া আইডির পোস্ট শেয়ারকারী Mohammed Azizul Hoque নামক ব্যক্তির একাধিক পোস্ট এই আইডি থেকেও শেয়ার করা হয়। তবে ব্যারিষ্টার জাইমা রহমান ও ডা জুবাইদা রহমান আইডি দুটির সাথে এই আজিজুলের কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা তা দ্য ডিসেন্ট আলাদা করে যাচাই করতে পারেনি।
তারেক রহমানের নামে ভুয়া আইডি ও পেইজ
ফেসবুকে তারেক রহমানের ভেরিফায়েড ও জনপ্রিয় পেইজ আছে। যেখান থেকে নিয়মিত দলীয় কার্যক্রমের আপডেট দেওয়া হয়। ভেরিফায়েড পেইজ থাকার পরেও তারেক রহমানের নামে রয়েছে অনেকগুলো ভুয়া একাউন্ট ও পেইজ। এর মধ্যে জনপ্রিয় দু’টি ভুয়া আইডি ও পেইজ সনাক্ত করেছে দ্য ডিসেন্ট। এসব পেইজকে তারেক রহমানের প্রকৃত পেইজ মনে করে মন্তব্য করেন কর্মী-সমর্থকদের অনেকে।

তারেক রহমানের আসল পেইজ মনে করে অনেকের কমেন্ট।
Tareque Rahman F নামের ফেইক আইডিটির ফলোয়ার সংখ্যা ১ লক্ষ ৯৩ হাজার। ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আইডিটি খোলা হয়। আইডিটি একজনেরই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে—আইডি ট্রান্সপারেন্সি অনুযায়ী ওই ব্যক্তি বাংলাদেশেই বসবাস করেন।
আইডিটির এক্টিভিটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, তারেক রহমানের নানা ভিডিওর অংশ কাট করে আপলোড করা হয়। তার এআই জেনারেটেড নানা ছবিও পোস্ট দেওয়া হয়। করা হয় বিএনপির পক্ষে নানা প্রচারণা। নানা পোস্টে তারেক রহমানের মূল পেইজও ট্যাগ করা হয় আইডিটি থেকে।
উক্ত আইডিতে Travel love নামক একটি পেইজের পোস্ট শেয়ার করতে দেখা যায়। সে পেইজের ইন্ট্রোতে তারেক রহমানের নামে ফেইক আইডির এডমিন হিসেবে উল্লেখ করা আছে।
প্রায় ৭৫ হাজার ফলোয়ারবিশিষ্ট আরেকটি পেইজ আছে—নাম Tarique Rahman Live। Zaima Rahman নামে পেইজটি খোলা হয় ২০২০ সালের ৫ মার্চ। পরবর্তীতে ৬ দফা নাম পরিবর্তন করে এ নাম রাখা হয়।
পেইজটি কনটেন্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, তারেক রহমানের নানা ভিডিও এবং বিএনপি সংশ্লিষ্ট নানা সংবাদ-ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়।
রিজভীর নামে আইডি খুলে ছড়ানো হয় বিভ্রান্তিকর বার্তা
গত ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর নামে একটি ফেসবুক একাউন্ট থেকে একটি পোস্টে লিখা হয়- ‘‘কথাছিল ত্যাগীদের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন হবে, এখন দেখা যাচ্ছে ত্যাগীদের দিন শেষ দালালদের বাংলাদেশ।’’
পোস্টটিতে রিয়েক্ট দেন ১৩ হাজার জন। কমেন্ট করেন ২ হাজার ৩০০ জন। এই পোস্টটি শেয়ার হয় ২ হাজার ৬০০ বার। পোস্টের কমেন্টবক্স লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অনেকে রিজভীর একাউন্ট মনে করে কমেন্ট করেছেন। এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় তখন।
এরপর একই দিন রিজভীর পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি দিয়ে বিএনপি জানায়, রিজভীর নিজের কোনো ফেসবুক একাউন্ট নেই। বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক মুহম্মদ মুনির হোসেন স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে রিজভী বলেন, ‘‘অজ্ঞাত কুচক্রী মহল কর্তৃক আমার নামে ভূয়া ফেসবুক এ্যাকাউন্ট খুলে বিভিন্ন বক্তব্য, মন্তব্য ও মতামত প্রকাশ করা হচ্ছে-যা সম্পূর্ণরুপে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। আমি এর আগেও গণমাধ্যমে বলেছি এবং থানায় জিডি করেছি যে, আমি নিজের নামে কখনোই Facebook Account খুলিনি। আমার নামে খোলা এই সমস্ত ভূয়া Facebook Account থেকে কোনও মতামতের সংগে আমার কোন ন্যুনতম সংশ্লিষ্টতা নেই। ভুয়া Facebook Account এর মাধ্যমে আমার নামে বানোয়াট বক্তব্য ও মতামত প্রকাশের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণসহ ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে আমার নামে খোলা ভুয়া একাউন্টগুলি বন্ধ করে দেয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। পাশাপাশি এসব ভুয়া ফেসবুক একাউন্টে প্রচারিত বক্তব্য ও মন্তব্যে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য বিএনপি নেতাকর্মীসহ সর্বসাধারণের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।”
দ্য ডিসেন্ট এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফেসবুকে রিজভীর নামে অন্তত ৫০টি আইডি এবং ৬০টি পেইজ রয়েছে। এরমধ্যে লাখের উপরে ফলোয়ারবিশিষ্ট বেশ জনপ্রিয় একটি পেইজ ও দুটি আইডি সক্রিয় রয়েছে। মানুষকে ধোকা দিতে একাউন্টগুলো বেশ গুছিয়ে পরিচালনা করা হয়।
রিজভীর নামে সবচেয়ে জনপ্রিয় ভুয়া ফেসবুক পেইজ Ruhul Kabir Rizvi 2.0। ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট পেইজটি খোলা হয়েছে—যার বর্তমান ফলোয়ার সংখ্যা প্রায় ২ লক্ষ। বাংলাদেশ থেকে দু’জন এডমিন পেইজটি পরিচালনা করেন।
পেইজের শেষ ৩০টি কনটেন্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপির পক্ষে, জামায়াতের বিপক্ষে নানা পোস্ট ছাড়াও সমসাময়িক নানা ব্যাপারে বিভ্রান্তিমূলক পোস্ট করা হয়েছে পেইজটি থেকে।

রিজভীর নামে ফেইক পেইজের পোস্ট সত্য ধরে নিয়ে অনেকের কমেন্ট।
এক লক্ষ ৩৪ হাজার ফলোয়ারবিশিষ্ট আইডি Ruhul Kabir Rizvi। ২০২০ সালের ২৭ জুন আইডিটি খোলা হয়। বাংলাদেশ থেকে একজনই এটি পরিচালনা করেন। বিএনপি বিষয়ক নানা সংবাদ, দলীয় বিবৃতি এবং রিজভীর ব্যক্তিগত নানা কার্যক্রম পোস্ট করা হয়।
রিজভীর নামে ফেসবুকে আরেকটি জনপ্রিয় আইডি Ruhul Kabir Rizvi। সম্প্রতি বিভ্রান্তিকর ভুয়া মন্তব্য প্রচার করা হয় এই একাউন্ট থেকে। এটি ২০২৪ সালের ২০ ডিসেম্বর খোলা হয়, যা বাংলাদশ থেকে একজনই পরিচালনা করেন।
মির্জা ফখরুল, এ্যানি এবং রুমিন ফারহানার নামেও ফেইক একাউন্ট
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে বেশ জনপ্রিয় একটি ফেইক আইডি আছে ফেসবুকে। ২০১২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আইডিটি খোলা হয়েছে—যার ফলোয়ার সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৬০ হাজার। বাংলাদেশ থেকে একজনই আইডিটি চালান। ইন্ট্রোতে লেখা আছে, ‘I am Mirza Fakhrul Islam Alamgir Member Of Parliament from Bogra-6 , Bogra’। তবে তার আসল ফেইসবুক পেইজের নাম Mirza Fakhrul Islam Alamgir।
আইডির এক্টিভিটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপি সংশ্লিষ্ট নানা সংবাদ এবং মীর্জা ফখরুলের রাজনৈতিক নানা কার্যক্রমের খবর পোস্ট করা হয়েছে আইডি থেকে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির নামে ৭১ হাজার ফলোয়ারবিশিষ্ট একটি ফেইক ফেসবুক আইডি বেশ সক্রিয়। আইডিটি ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট খোলা হয়েছে, যা বাংলাদেশ থেকেই একজন পরিচালনা করেন। Shahid Uddin Chowdhury Anee Fans Club নামক পেইজের পোস্ট নিয়মিত শেয়ার করা হয় এই আইডি থেকে। পাশাপাশি এ্যানির নানা রাজনৈতিক কার্যক্রমের আপডেটও দেওয়া হয় সেখানে।
তার আসল ফেসবুক পেইজ হলো Shahiduddin Chowdhury Anee।
বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার নামেও আছে অনেক ফেইক আইডিও পেইজ। এরমধ্যে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা নামক আইডিটির ফলোয়ার সবচেয়ে বেশি। ১ লক্ষ ২২ হাজার ফলোয়ারবিশিষ্ট আইডিটি খোলা হয় ২০২৩ সালের ৭ আগস্ট। যা সৌদিআরব থেকে একজন দ্বারা পরিচালিত।
আইডিটি থেকে বিএনপি বিষয়ক নানা মন্তব্য এবং রুমিন ফারহানার নানা ছবিও ও ভিডিও পোস্ট করা হয়।
রুমিন ফারহানার নামে আরেকটি ফেইক পেইজ আছে যার ফলোয়ার সংখ্যা ৮৭ হাজার। পেইজটি ২০২৩ সালের ১৯ জুলাই খোলা হয় Md Jahanulla নামে। পরে একই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর নাম পরিবর্তন করে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা করা হয়। তবে পেইজটি থেকে নাচ-গানের ছোট্ট ছোট্ট ক্লিপই পোস্ট করা হয়।
তবে Rumeen Farhana আইডিটি তার মূল আইডি।
জামায়াতের ড. মাসুদ ও মুফতি আমির হামজার নামে ভুয়া পেইজ
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য এবং ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. মু শফিকুল ইসলাম মাসুদের নামে ফেসবুকে রয়েছে একাধিক ভুয়া আইডি ও পেইজ। এসবের মধ্যে Dr. Shafiqul Islam Masud পেইজটি সবচেয়ে জনপ্রিয়—যার ফলোয়ার সংখ্যা ১ লক্ষ ২২ হাজার। পেইজটি খোলা হয় ২০২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। দু’জন এডমিন কাতার থেকে পেইজটি পরিচালনা করেন।
পেইজের শেষ ৩০টি কনটেন্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, সমস্যাময়িক নানা ইস্যুর পাশাপাশি জামায়াতের পক্ষে ও বিএনপির বিপক্ষে প্রচারণা করা হয় পেইজ থেকে।
তার প্রকৃত পেইজের নাম Dr. Md. Shafiqul Islam Masud।
ইসলামী বক্তা এবং কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের জামায়াতের মনোনীত সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থী মুফতি আমির হামজার নামেও আছে ফেইক ফেসবুক পেইজ। ২০১৭ সালের ৬ মার্চ পেইজটি খোলা হয়। বাংলাদেশ থেকে দু’জন এডমিন এটি পরিচালনার সাথে যুক্ত।
মুফতি আমির হামজার নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের নানা ভিডিও এবং ওয়াজ মাহফিলের নানা ক্লিপ পোস্ট করা হয় পেইজটি থেকে।
আমির হামজার রিয়েল পেইজের নাম Mufti Amir Hamza।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে এসব ভুয়া ফেসবুক পেইজ ও একাউন্ট মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড খোরশেদ আলম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশে একটা বেশিরভাগ যেহেতু মানুষ হয়তো অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত, ফলে এসব পেইজ বা একাউন্টের কনটেন্ট তাদের মধ্যে খুব দ্রুতই ইম্প্যাক্ট তৈরি করতে পারে। এক ধরণের ট্রাস্ট তৈরি করতে পারে। এই ব্যাপারটায় তারা বিভ্রান্ত হয় বা কনফিউজড হয়।’’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সভাপতি শিবলী নোমান মনে করেন, এ ধরনের ভুয়া পেইজ ও অ্যাকাউন্টের প্রভাব নিশ্চিতিভাবেই নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। তার মতে, প্রথাগত গণমাধ্যমের উপর বিভিন্ন শ্রেণির জনগণের বৈধ/অবৈধ অবিশ্বাস, যা সামাজিক মাধ্যমকে তথ্যের সূত্র হিসেবে শক্তি দেয়।
তিনি বলেন, ৪০ বয়সোর্ধ্ব জনগোষ্ঠী, যারা ভুয়া তথ্য, গুজব, মিসইনফরমেশন, ডিজইনফরমেশন প্রপঞ্চের সাথে পরিচিত নন এবং প্রথাগত গণমাধ্যমের তথ্যের সাথে ভুইফোড় পেইজগুলোর তথ্যকে গুলিয়ে ফেলেন। এই অংশটি সার্বিকভাবে গণমাধ্যম স্বাক্ষরতাহীন গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হলেও, তাদের বয়স, অভিজ্ঞতা ও জনমত তৈরিতে সামাজিক ভূমিকা একটি আলাদা প্রভাবশালী গোষ্ঠী হিসেবে সামনে আনে।