Image description
 

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ই-লানিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের (ই-লার্নিং) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ হাসান রাসেলের ক্যাশিয়ার মাসুদ আলম ও তার পরিবারের স্বার্থ সংশ্লিষ্টদের সকল ব্যাংক লেনদেন বন্ধ রাখতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) চিঠি দিয়েছিল। সেই অনুযায়ী ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংসহ মাসুদ আলমের সকল ব্যাংক হিসাব বন্ধ থাকার কথা।

তবে দুদক ও বিএফআইইউ’র নির্দেশ উপেক্ষা করে এই প্রকল্পের লেনদেন চালিয়ে যাচ্ছে মাসুদ আলম। বিএফআইইউর নির্দেশনা উপেক্ষা করে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংয়ের ব্যাংক হিসাব চালু রাখা হয়েছে।

ব্যাংক ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ জুনভিত্তিক এবং ৩০ সেপ্টেম্বরভিত্তিক ই-লার্নিং ও আর্নিংয়ের ২৪ কোটি টাকা করে দুটি বিল দিয়েছে যুব ও ক্রিড়া মন্ত্রণালয়। ফলে মোট ৪৮ কোটি টাকার এই বিল ব্যাংকে জমা দেয় ই-লার্নিং। কৌশলে সেই টাকা ব্যাংকের হিসাব থেকে তুলে ফেলে এবং পলাতক জাহিদ হাসান রাসেল ও কোম্পানির ডিরেক্টর কারাবন্দী সচিব মেজবাহ উদ্দিনকে সরবরাহ করেছে ই-লার্নিং।

অথচ গত জুনে দুদক থেকে ই-লার্নিংয়ের মাসুদ আলম ও তার পরিবারের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সকলের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে সেই নির্দেশনা কৌশলে উপেক্ষা করে লেনদেন চালিয়ে যাচ্ছে ই-লার্নিং।

অভিযোগ রয়েছে, যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাবেক এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঘুষ দিয়ে ৩০০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে নেয় ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড। অথচ ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লি.-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে ছাত্র হত্যা ও উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ৭০টির মতো মামলা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণহত্যা মামলাও রয়েছে মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠানকে ২৯৭ কোটি টাকার ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রকল্পের কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে জুলাই আন্দোলনে মাসুদের ভূমিকা ছিল নেতিবাচক। একারণে তার নামে গণহত্যা মামলাও হয়। কিন্তু এসব কিছু উপেক্ষা করে গত বছরের শেষ দিকে ই-লার্নিংকে কাজটি দেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার তৎকালীন এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন এই প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য ই-লার্নিংয়ের মাসুদ আলমের কাছ থেকে ১০ কোটি টাকা ঘুষ নেন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ওই প্রকল্পের পরিচালক মো. আব্দুল হামিদ খানের বিরুদ্ধেও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।

মাসুদ আলমের মতো আওয়ামী ঘনিষ্ঠদেরকে কাজ দেওয়ায় খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অস্বস্তি দেখা দেয়। জানা গেছে, মাসুদ আলম এক সময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে নাম অন্তর্ভুক্ত থাকায় ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লি. সাধারণ মানুষদের কাছে পরিচিতি পায়। এই পরিচিতি কাজে লাগিয়ে তিনি বেশ কিছু আইটি খাতের প্রতিষ্ঠান খুলে বসেন। এর মধ্যে নগদহাট বাংলাদেশ লিমিটেডের মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং ধাঁচের ব্যবসার মাধ্যমে অনেক টাকা হাতিয়ে নেন। পরে ওই প্রতিষ্ঠানের নাম বদলে প্রমিস মার্ট করা হয়। প্রমিস গ্রুপের এই প্রতিষ্ঠানের টাকায় প্রমিস অ্যাসেটসহ মোট ১৫টি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন মাসুদ।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মাসুদ আলম কিছুটা আড়ালে থেকে প্রমিস গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গত এক বছরে তাকে কোনো অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি।

২০২৪ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগের ব্যানারে শরিয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেন মাসুদ আলম।

নির্বাচনী হলফনামার সঙ্গে প্রদত্ত আয়কর নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত মাসুদ আলমের নিট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৯ কোটি ৯৫ লাখ ৩১ হাজার ৪৭৯ টাকা। ২০২৩-২৪ করবর্ষে তার আয় ছিল ২১ লাখ ৩ হাজার টাকা। হলফনামায় স্থাবর সম্পদের বিবরণ দিতে গিয়ে মাসুদ উল্লেখ করেছেন, তার নিজ নামে ৬টি বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। অর্জনকালে ওই সম্পদের মূল্য ছিল ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। তবে ধারণা করা হচ্ছে, হলফনামা ও আয়কর নথিতে উল্লিখিত তথ্যের বাইরেও বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে মাসুদ আলমের।

দুদক ইতোমধ্যে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সম্পদের তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। একইসঙ্গে স্ত্রীসহ মাসুদ আলমের পালিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে।

ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লি. বেসিস ও বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সদস্য। এই দুটি সংগঠনে মাসুদ আলমের যোগাযোগের জন্য দুটি আলাদা মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়েছে। অথচ দুটি নম্বরই বর্তমানে বন্ধ পাওয়া যায়।

বিডি প্রতিদিন