Image description

ঢাকার আগারগাঁওয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মূল ভবনের ফটকের সামনে প্রতিদিনই চাকরিপ্রার্থীদের ভিড় দেখা যায়। কেউ ফলাফল জানতে আসেন, কেউ নতুন বিজ্ঞপ্তির আশায়। কারও হাতে বিসিএসের আবেদনপত্র, কেউবা আসেন মৌখিক পরীক্ষার জন্য।

৪৪তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত একজন বললেন, ‘৪৪তম বিসিএসে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দিন থেকে ৩ বছর ১১ মাস পেরিয়ে গেলেও আমার এখনো নিয়োগ হয়নি।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই চাকরিপ্রত্যাশীর ভাষ্য, ‘পিএসসির এই দীর্ঘসূত্রতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পিএসসি নিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের আকাঙ্ক্ষা ছিল বেশি। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণে পিএসসির গত এক বছরের কার্যক্রম নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে চাকরিপ্রার্থী ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। তাঁরা বলছেন, নতুন কমিশনের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে—বিসিএস পরীক্ষা নেওয়া ও খাতা দেখায় গতি আনা, পরীক্ষা ফি কমানো, প্রশ্নপত্র নিজস্ব ছাপাখানায় ছাপানো, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কমানো এবং সিলেবাস পরিবর্তনে উদ্যোগী হওয়া। তবে বিসিএস নন-ক্যাডার নিয়োগ জটিলতা না কমা, প্রশ্নপত্রে ভুল, পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে হয়রানি ও অকারণে চাকরি থেকে অব্যাহতির মতো কর্মকাণ্ড এখনো বন্ধ করতে পারেনি পিএসসি। অবশ্য পুলিশ ভেরিফিকেশন ও চাকরি থেকে অব্যাহতির বিষয়টি পিএসসির অধীনে নয়।  

আমরা একাধিক সমস্যা একসঙ্গে মোকাবিলার চেষ্টা করছি। “ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার” লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে আছি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সময়মতো চাহিদাপত্র পেলে ৫০তম বিসিএস থেকেই এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
পিএসসির সদস্য অধ্যাপক সোহেল রহমান

নতুন কমিশনের যত উদ্যোগ

সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)
সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)ছবি: সংগৃহীত

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছরের ৮ অক্টোবর সোহরাব হোসাইনের নেতৃত্বাধীন ১২ সদস্যের কমিশন পদত্যাগ করে। এরপর অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের নেতৃত্বে দায়িত্ব নেয় পিএসসির ১৪তম কমিশন। শুরুতে চেয়ারম্যানসহ ৪ জন সদস্য ছিলেন, ধাপে ধাপে সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৯।

নতুন কমিশনের এক বছরের কার্যক্রমে কিছু পরিবর্তন স্পষ্ট হয়েছে। কমিশন দায়িত্ব নিয়ে বিসিএস পরীক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে পদক্ষেপ ও নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি বছর ৪৬তম বিসিএস থেকে লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে ‘সার্কুলার ইভালুয়েশন সিস্টেম’ চালু হয়েছে। কমিশন প্রত্যাশা করছে, এর ফলে দীর্ঘসূত্রতা কমবে। বিসিএসের আবেদন ফি ৭০০ টাকা থেকে কমিয়ে ২০০ টাকা করা হয়েছে। মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কমানোয় চাকরিপ্রত্যাশীদের মানসিক চাপ কমবে এবং মূল্যায়নে স্বচ্ছতা বাড়বে। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পিএসসি এখন নিজস্ব ডিজিটাল প্রিন্টিং প্রেস ব্যবহার করছে। ৪৯তম (বিশেষ) বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সেখানে ছাপানো হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের জন্য ইউনিক আইডি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

পিএসসির সদস্য অধ্যাপক সোহেল রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা একাধিক সমস্যা একসঙ্গে মোকাবিলার চেষ্টা করছি। “ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার” লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে আছি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সময়মতো চাহিদাপত্র পেলে ৫০তম বিসিএস থেকেই এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।’

কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনপ্রশাসনে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে এবং অতিরিক্ত দীর্ঘ নিয়োগপ্রক্রিয়াকে সহজতর করতে বিসিএস পরীক্ষা এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে শেষ করার জন্য একটি নির্দিষ্ট বার্ষিক ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা যেতে পারে।
চাকরিপ্রার্থী
চাকরিপ্রার্থীপ্রতীকী ছবি

নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর ফলাফল প্রকাশেও গতি এসেছে। ৪৭তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় গত ১৯ সেপ্টেম্বর। ৯ দিনের ব্যবধানে এর ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এর আগে ৪৬তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছিল মাত্র ১৩ দিনে। ৪৮তম (বিশেষ) বিসিএসের আবেদন গ্রহণ থেকে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত সময় লেগেছে মাত্র ৩ মাস ১১ দিন। আগে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে এক বছরের বেশি সময় লাগত। তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পর ৮ নভেম্বর ৪৪তম বিসিএসের সম্পূরক ফল প্রকাশিত হয়। এতে ১ হাজার ৬৭৬ জন প্রার্থীকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।

পিএসসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম প্রথম আলোকে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী পিএসসি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও বাস্তবে প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা সীমিত। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের মতো বিধি প্রণয়নের স্বাধীনতা পিএসসির নেই। ২০১১ সালের পর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কমিশন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি দপ্তরের মতো কাজ করছে। যদি প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা পাওয়া যায়, তাহলে এক বছরের মধ্যে বিসিএস সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।’

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন বিসিএসের নিয়োগপ্রক্রিয়া এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে শেষ করার কথা বলেছে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনপ্রশাসনে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে এবং অতিরিক্ত দীর্ঘ নিয়োগপ্রক্রিয়াকে সহজতর করতে বিসিএস পরীক্ষা এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে শেষ করার জন্য একটি নির্দিষ্ট বার্ষিক ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা যেতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর মনে করেন, পিএসসির সদস্য সংখ্যা বাড়ানো যৌক্তিক। তবে বিসিএস ও অন্যান্য নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নের মান নিয়ে সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব প্রশ্ন প্রায় ক্ষেত্রেই মুখস্থনির্ভর। প্রার্থীর বিশ্লেষণক্ষমতা, চিন্তনদক্ষতা ও সৃজনশীলতার কোনো যাচাই বর্তমান প্রশ্নে সম্ভব নয়। প্রশ্নপদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনা দরকার এবং পিএসসিকে অবশ্যই নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে।

যোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি, কিন্তু চাকরি পাচ্ছি না। অথচ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে এখন ৪ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি পদ শূন্য।
রহমান খলিল, চাকরিপ্রার্থী

চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা

একজন চাকরিপ্রার্থী প্রথম আলোকে বলেন, আবেদন ফি ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কমানো প্রার্থীবান্ধব। কিন্তু কাঠামোগত সংস্কার কিছুই হয়নি। পিএসসি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের টানাপোড়েনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমেনি, কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে।

৪৯তম বিসিএসের (বিশেষ) শিক্ষা ক্যাডারের এমসিকিউ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় চলতি বছরের ১০ অক্টোবর। প্রশ্নপত্রে একাধিক বানান ও তথ্যগত ভুল পাওয়া যায়। লেখক ও গবেষক নাদিম মাহমুদ অন্তত ১১টি ভুল চিহ্নিত করেছেন, যেমন ‘গণ-অভ্যুত্থান’ লেখা হয়েছে ‘গনঅভুধান’, ‘উচ্চারণ’ লেখা হয়েছে ‘উচ্চারন’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরীক্ষার্থী বলেন, ‘প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়লেও মানসম্মত ও নির্ভুল প্রশ্ন প্রণয়ন করতে পারছে না পিএসসি।’

প্রশ্নপত্রে বানান ভুল কোনোভাবেই কাম্য নয় উল্লেখ করে পিএসসির চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোনেম বলেন, ভবিষ্যতে যাতে এমন ভুল না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে পিএসসি।

নতুন কমিশনও নন-ক্যাডার নিয়োগ জটিলতা নিয়ে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কিছু করতে পারেনি। ৪৩তম বিসিএসে মাত্র ৬৪২ জনকে সুপারিশ করায় চাকরিপ্রার্থীরা আন্দোলনে নেমেছেন। পিএসসি জানিয়েছে, নিয়োগ বিধিমালা ২০২৩ সংশোধনের বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়ে ফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত সাড়া মেলেনি।

রহমান খলিল নামের একজন চাকরিপ্রার্থী বলেন, ‘যোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি, কিন্তু চাকরি পাচ্ছি না। অথচ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে এখন ৪ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি পদ শূন্য।’

বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও পুলিশ ভেরিফিকেশন জটিলতারও অবসান হয়নি। পুলিশ বা নিরাপত্তা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদনের (ভেরিফিকেশন) কারণে চূড়ান্ত নিয়োগ আটকে যেতে পারে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার ২৮তম থেকে ৪২তম বিসিএসের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে নাম না আসা ২৫৯ জন চাকরিপ্রার্থীকে নিয়োগ দিয়েছে।

চাকরিপ্রার্থী বলছেন, ভেরিফিকেশনে দীর্ঘসূত্রতার কারণে এখনো অনেক চাকরির নিয়োগ আটকে থাকছে। তাঁদের ভাষ্য, পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশনে রাজনৈতিক পরিচয়ের বিবেচনায় বাদ দেওয়ার বিষয়টি সংবিধানপরিপন্থী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক মনে করেন, পিএসসি যদি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে সরকারের বৃত্তে আটকে না থেকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজস্বতা বজায় রাখে, তবে মানুষ পিএসসির প্রতি আস্থাশীল হবে। এ জন্য পিএসসির প্রশাসনিক স্বাধীনতা বাড়াতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান কমিশনের জন্য মাননির্ভর প্রশ্ন প্রণয়ন ও নন–ক্যাডার নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পিএসসি ঘোষিত ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আসবে।