কিশোরগঞ্জের ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে দুটিতে এখনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি বিএনপি। ফলে অঘোষিত কিশোরগঞ্জ-১ ও কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্তত ১৬ নেতা বেশ তৎপর। এলাকায় নিয়মিত সভা-সমাবেশ, মিছিলসহ নানা কর্মসূচি করে যাচ্ছেন তাঁরা। যদিও একটি আসন বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিক কোনো দলকে ছেড়ে দেওয়ার আলোচনা আছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রায় ৯ মাস আগে জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এর পর থেকে দলটি প্রচারণার মাঠে বেশ সক্রিয়।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সব আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া গণ অধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতারাও আছেন প্রচারে। সিপিবি ও গণসংহতি আন্দোলনের নেতারাও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা ভাবছেন।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতটি আসনের মধ্যে বিএনপি পাঁচটিতে এবং আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) দুটিতে জয়লাভ করে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি দুটিতে আর আওয়ামী লীগ পাঁচটিতে জয়লাভ করে। ২০০১ সালে বিএনপি দুটি আসনে এবং আওয়ামী লীগ পাঁচটি আসনে জয়ী হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জেলায় একটি আসন কমিয়ে ছয়টি করা হয়। সেবার আওয়ামী লীগ পাঁচটি ও জাতীয় পার্টি একটি আসন পেয়েছিল।
কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর)
বিএনপি এখনো আসনটিতে প্রার্থী ঘোষণা করেনি। দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে সক্রিয় আছেন কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি রেজাউল করিম খান (চুন্নু), জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওয়ালীউল্লাহ্ রাব্বানী। এ ছাড়া প্রচার চালাচ্ছেন সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ হিলালী, জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি রুহুল হোসাইন, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল, হোসেনপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জহিরুল ইসলাম ও জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য এম আতিকুর রহমান।
এখানে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মোসাদ্দেক আলী ভূঁইয়া প্রচার চালিয়ে আসছেন। গণ অধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া)
আসনটিতে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আলোচিত সাবেক বিএনপি নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। তখন আসনটি শুধু কটিয়াদী উপজেলা নিয়ে ছিল।
দলীয় সূত্র জানায়, এখানে প্রকাশ্যে কেউ জালাল উদ্দীনের বিরোধিতা না করলেও মনোনয়নপ্রত্যাশী অনেক নেতা নানাভাবে তৎপরতা চালাচ্ছেন।
এ আসন থেকে এবার বিএনপির প্রার্থী পাকুন্দিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) জালাল উদ্দীন। পাকুন্দিয়া পৌরসভার এই সাবেক মেয়র প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, এখানে প্রকাশ্যে কেউ জালাল উদ্দীনের বিরোধিতা না করলেও মনোনয়নপ্রত্যাশী অনেক নেতা নানাভাবে তৎপরতা চালাচ্ছেন। তবে জালাল উদ্দীনের দাবি, তাঁর আসনে বিএনপির সবাই এককাট্টা।
এখানে জামায়াতের প্রার্থী কটিয়াদী উপজেলা শাখার কর্মপরিষদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মোড়ল। তিনি বলেন, তিনি সবচেয়ে তরুণ প্রার্থী। বিগত সরকার পতনের আন্দোলনে তরুণদের ভূমিকা বেশি। তাই তিনি তরুণদের নিয়ে আশাবাদী।
কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল)
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এম ওসমান ফারুক আসনটিতে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। সবশেষ ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। ওসমান ফারুক বলেন, বিগত স্বৈরাচার সরকার তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল। প্রায় আট বছর তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে কাটাতে হয়েছে। তবে এলাকার জনগণ তাঁকে ভালোবাসে।
বিগত স্বৈরাচার সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল। প্রায় আট বছর যুক্তরাষ্ট্রে কাটাতে হয়েছে।ওসমান ফারুক বলেন, বিএনপির প্রার্থী
২০০৮ সালে এখানে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচন করেছিলেন জেলা শাখার সাবেক সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা। তিনি এবারও মনোনয়নের প্রত্যাশা করেন। তিনি বলেন, এমন লোককেই বিএনপির মনোনয়ন দেওয়া উচিত, যিনি দলের দুঃসময়ে এলাকা ছেড়ে যাননি।
জামায়াতের প্রার্থী সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের শ্যালক কর্নেল (অব.) জেহাদ খান।
আসনটিতে বিগত সরকারের সময় সংসদ সদস্য ছিলেন জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব মুজিবুল হক (চুন্নু)। ৫ আগস্টের পর একাধিক মামলার আসামি হওয়ায় তিনি অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায় আছেন। তবে শোনা যাচ্ছে দল নির্বাচনে গেলে তিনি এ আসনে এবারও প্রার্থী হতে পারেন।
এখানে জামায়াতের প্রার্থী কর্নেল (অব.) জেহাদ খান। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের শ্যালক। পেশায় চিকিৎসক জেহাদ খান বলেন, তিনি মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। অল্প সময়ে মানুষ তাঁকে আপন করে নিয়েছে।
কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম)
আসনটিতে আলোচিত বিএনপি নেতা আইনজীবী মো. ফজলুর রহমানকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এখানে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছেন বিএনপির আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী আব্দুর রহিম মোল্লা। তিনি বলেন, ফজলুর রহমানকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দিলে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী আদর্শ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ বিষয়ে ফজলুর রহমান বলেন, তাঁর জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে জনবিচ্ছিন্নরা বিরোধিতা করছে।
এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে তৎপর ঢাকা মহানগর উত্তরের মজলিশে শুরা সদস্য শেখ রোকন রেজা। ছাত্রশিবিরের সাবেক এই ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক প্রথমবার সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন।
কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী)
বিএনপি এখনো এখানে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের শরিক কোনো দলকে আসনটিতে ছাড় দিতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
বিএনপির শরিক দলের মধ্যে এখানে আলোচনায় আছেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম এবং বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান ও ১২-দলীয় জোটের সমন্বয়ক সৈয়দ এহসানুল হুদা।
এই আসনে বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল, জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য জি এস মীর জলিল, বাজিতপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র এহসান কুফিয়া, সাবেক সচিব মো. আবদুল ওয়াহাব, নিকলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি বদরুল মোমেনসহ অন্তত আটজন দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী।
বিএনপির শরিক দলের মধ্যে এখানে আলোচনায় আছেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম এবং বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান ও ১২-দলীয় জোটের সমন্বয়ক সৈয়দ এহসানুল হুদা।
এদিকে এখানে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে আসছেন জেলা আমির রমজান আলী। তিনি বলেন, স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতনের পর জামায়াত সম্পর্কে মানুষের ধারণা পাল্টেছে, জনসম্পৃক্ততাও বেড়েছে।
কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর)
বিএনপি এখানে মনোনয়ন দিয়েছে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শরীফুল আলমকে। এ নিয়ে তিনি পঞ্চমবারের মতো সংসদ নির্বাচন করতে যাচ্ছেন।
জামায়াত এখানে মনোনয়ন দিয়েছে কবির হোসাইনকে। তিনি ভৈরব উপজেলা জামায়াতের আমির। প্রথমবারের মতো তিনি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন।
মো. শরীফুল আলম বলেন, তিনি আশা করছেন আগামী নির্বাচনে জেলার ছয়টি আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন।
জামায়াত এখানে মনোনয়ন দিয়েছে কবির হোসাইনকে। তিনি ভৈরব উপজেলা জামায়াতের আমির। প্রথমবারের মতো তিনি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন।