নোয়াখালীতে তিন দিনে ২ জন খুনের শিকার হয়েছেন ও পৃথক পৃথক ঘটনায় আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নোয়াখালী শহরের মাইজদীতে চিকিৎসকের ভূল চিকিৎসায় রোগির মৃত্যুর অভিযোগও রয়েছে।
জানা গেছে, মাইজদী হাউজিং এলাকার ইএনটি হাসপাতালে নাক, কান ও গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. মজিবুল হকের ভুল অপারেশনে রিংকি আক্তার (২০) নামের এক রোগির মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়েছে চিকিৎসকসহ হাসপাতালটির অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ সময় উত্তেজিত জনতা হাসপাতালটি ভাংচুরের চেষ্টা করলে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে।
নোয়াখালী সদর থানার ওসি কামরুল ইসলাম জানান, রোগির লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও জানান, দুই দিন আগে এই রোগি চিকিৎসা নেন। আজ রক্তপাত শুরু হলে তাকে বেগমগঞ্জের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি মারা গেলে রোগির স্বজনরা মাইজদী হাসপাতালে নিয়ে আসে। আমরা সেখান থেকে লাশ উদ্ধার করি। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নামাজরত অবস্থায় মাদরাসা ছাত্রের মৃত্যু
নোয়াখালীর চাটখিলে তাহাজ্জুদের নামাজরত অবস্থায় আকরাম হোসেন (১২) নামে এক মাদরাসা মৃত্যু হয়েছে।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) সন্ধ্যার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিষ্ণুরামপুর নুরানী হাফিজিয়া মাদরাসার প্রধান শিক্ষক হাফেজ মহিন উদ্দিন। এর আগে, শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ৪টার দিকে উপজেলার নোয়াখলা ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর নুরানী হাফিজিয়া মাদরাসার হেফজ খানায় তাহাজ্জুদের নামাজরত অবস্থায় ওই মাদরাসা ছাত্রের মৃত্যু হয়।
মৃত আকরাম লক্ষীপুর জেলার কমলনগর উপজেলার ফারুক হোসেনের ছেলে এবং নোয়াখলা ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর নুরানী হাফিজিয়া মাদরাসার হেফজ বিভাগের ছাত্র ছিল।
বিষ্ণুরামপুর নুরানী হাফিজিয়া মাদরাসার প্রধান শিক্ষক হাফেজ মহিন উদ্দিন আরও বলেন, আকরাম বিষ্ণুরামপুর নুরানী হাফিজিয়া মাদরাসা থেকে ১৬ পারা কোরআন হেফজ সম্পন্ন করে। প্রতিদিনের ন্যায় শুক্রবার দিবাগত রাত সোয়া ৪টার দিকে অন্য ছাত্রদের সাথে সে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ত উঠে। পরবর্তীতে তাহাজ্জুদ নামাজরত অবস্থায় আকরাম অসুস্থ হয়ে আরেক ছাত্রের কোলে ঢলে পড়ে। তাৎক্ষণিক মাদরাসার ছাত্ররা তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। সকালে মাদরাসা মাঠে জানাজা শেষে লাশ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
চাটখিল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো.আব্দুস সুলতান বলেন, এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছি। তবে এ বিষয়ে কেউ কোন অভিযোগ করেনি।
কবিরহাটে তরুণকে কুপিয়ে হত্যা
নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলায় তুচ্ছ ঘটনায় আনোয়ার হোসেন সাব্বির (২২) নামে এক তরুণকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ তাৎক্ষণিক দুজনকে আটক করেছে বলে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেন কবিরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো.শাহীন মিয়া।
এর আগে, গতকাল বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উপজেলার ধানশালিক ইউনিয়নের চর গুল্যাখালী গ্রামের পান বেপারী বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। পরে গুরুত্বর আহত অবস্থায় ভিকটিমকে ঢাকা নেওয়ার পথে একই দিন দিবাগত রাত ২টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
নিহত সাব্বির উপজেলার চাপরাশিরহাট ইউনিয়নের ৮নম্বর ওয়ার্ডের রামেশ্বপুর গ্রামের তাজু ড্রাইভার বাড়ির মো.লিটনের ছেলে। অপরদিকে আটককৃতরা হলেন, উপজেলার ধানশালিক ইউনিয়নের পান বেপারী বাড়ির মো.সিরাজের ছেলে আব্দুর সোবহান শামীম (৩০) ও তার স্ত্রী ফারহানা আক্তার (২৩)।
নিহতের বন্ধু আনোয়ার হোসেন শাকিল বলেন, পারিবারিক কলহের জেরে ৪-৫ দিন আগে উপজেলার ধানশালিক ইউনিয়নের চর গুল্যাখালী গ্রামের পান বেপারী বাড়ির আমার খালা মানোয়ারা বেগমের খেতের লাউ গাছ গোপনে কেটে ফেলে তার দেবর শামীম। তিনি বিষয়টি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জানালে তারা তাকে হাতেনাতে দুর্বৃত্তকে ধরতে পরামর্শ দেয়।
গতকাল বুধবার বিকেলে তার মরিচ গাছের চারা কেটে ফেলার সময় তিনি তার দেবর শামীমকে দেখে ফেলে। সাথে সাথে তাকে জিজ্ঞাসা করলে উল্টো তার দেবর আমার খালাকে মারধর শুরু করে। খবর পেয়ে সন্ধ্যার দিকে আমি আমার বন্ধু সাব্বিরসহ আমার খালার বাড়িতে গিয়ে তাকে হাসপাতালে পাঠাই। এরপর আমরা আমার খালার বসতঘরে তালা দিয়ে চলে আসার পথে শামীম আমাদের সাথে কথা বলতে এগিয়ে আসেন।
একপর্যায়ে তিনি বলেন মহিলারা-মহিলারা গন্ডগোল হয়েছে, তিনি কিছু করেননি। এরপর আমরা কেন এসেছি বলেই ক্ষিপ্ত হয়ে শামীম তার হাতে থাকা দেশীয় অস্ত্র দিয়ে সাব্বিরকে মাথায় কুপিয়ে গুরুত্বর আহত করে। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে কবিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিয়ে যায়। কর্তব্যরত চিকিৎসক তার অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে প্রেরণ করে। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে বুধবার দিবাগত রাত ২টার দিকে তিনি মারা যান।
কবিরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীন মিয়া আরও বলেন, পারিবারিক কলহের জেরে মাথায় কুপিয়ে ওই তরুণকে গুরুত্বর আহত করা হয়। পরে ঢাকায় নেওয়ার পথে সে মারা যায়। পুলিশ অভিযানে রয়েছে। পরে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানানো হবে।
মারধরে ব্যবসায়ীর মৃত্যুর অভিযোগ
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে দেনা পাওনা নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের লোকজনের মারধরে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আব্দুর রহীম (৫৭) নামের এক ব্যবসায়ীর অবস্থায় মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) দুপুরের দিকে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
এর আগে, গতকাল বুধবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে উপজেলার আমিশা পাড়া ইউনিয়নের আমিশা পাড়া বাজারে ওই ব্যবসায়ীকে মারধরের এই ঘটনা ঘটে।
নিহত আব্দুর রহিম (৫৭) পাশ্ববর্তী লক্ষীপুর জেলার পার্বতীপুর গ্রামের মোহাম্মদ উল্যার ছেলে এবং সোনাইমুড়ী আমিশাপাড়া বাজারের মিথিলা বেকারীরর মালিক।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বুধবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে টাকা দেনা-পাওনাকে কেন্দ্র করে উপজেলার আমিশাপাড়া বাজারের মিথিলা বেকারীর মালিক আব্দুর রহিমকে বাজারে মারধর করে প্রতিপক্ষের লোকজন। এতে আব্দুর রহিম অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে তাকে চাটখিল সেন্ট্রাল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
সোনাইমুড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিঠুন চক্রবর্তী বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তবে এ ঘটনায় কেউ এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ করেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নকলে ধরা খেয়ে স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা
নোয়াখালীর সদর উপজেলায় বার্ষিক পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের সময় ধরা খেয়ে এক ছাত্রী আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মৃত ফারহানা আক্তার মোহনা (১২) উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের বিনোদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ছিল এবং একই ইউনিয়নের পন্ডিতপুর গ্রামের বেন্টর বাড়ির মো.ফরহাদের মেয়ে।
বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের বিনোদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শৌচাগারে এ ঘটনা ঘটে।
নিহতের চাচা সাইফুল ইসলাম তানিম বলেন, সকালে স্কুলে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষায় অংশ নেয় মোহনা। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাড়ির লোকজন জানতে পারে সে আত্মহত্যা করেছে। খবর পেয়ে তার স্বজনেরা বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে আসে। তখন তাদের জানানো হয় পরীক্ষা চলাকালীন সে নকলে ধরা পড়ে। এতে সে অভিমানে আত্মহত্যা করেছে। তবে বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখলে আত্মহত্যার সঠিক কারণ জানা যাবে।
বিনোদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোস্তাক সরওয়ার রিজভী বলেন, পরীক্ষা কেন্দ্রে মোহনা নকল করতে গিয়ে ধরা পড়ে। পরে পরীক্ষার হলে দায়িত্বরত শিক্ষক তার উত্তরপত্র দিয়ে দেন। পরীক্ষা শেষে ওই ছাত্রী আমাদের বিদ্যালয়ের পাশের বিনোদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শৌচাগারের গ্রিলে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। পরে শিক্ষার্থীরা দেখতে পেয়ে তাকে উদ্ধার করে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে।
সুধারাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো.কামরুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে হাসপাতালে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।
শীর্ষনিউজ