Image description

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ বছর পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের তদন্ত কার্যক্রম শেষ হয়েছে। আগামীকাল রবিবার এই কমিশনের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে দাখিল করার কথা রয়েছে। এখন চলছে প্রিন্টের কাজ। ওই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের প্রকৃতি ও স্বরূপ উদ্ঘাটন করেছে স্বাধীন তদন্ত কমিশন। এতে ঘটনাকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য অপরাধ সংঘটনকারী, সহায়তাকারী, ষড়যন্ত্রকারী, ঘটনার আলামত ধ্বংসকারী, ইন্ধনদাতা এবং ঘটনাসংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের বিষয়টি চিহ্নিত হয়েছে। একই সঙ্গে কমিশনের তদন্তকালে তৎকালীন দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পদে পদে গাফিলতি ও ষড়যন্ত্রের কথাও উঠে এসেছে। ষড়যন্ত্রে তৎকালীন স্থানীয় এমপি ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে কমিশন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পিলখানা হত্যাকাণ্ড যে দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের ফল, কমিশন তা বের করতে সক্ষম হয়েছে। এই ষড়যন্ত্রের বিভিন্ন অংশে ঘটনার পেছনের কুশীলব এবং আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন মন্ত্রী, এমপিসহ রাজনৈতিক নেতাদের কার কতটুকু সংশ্লিষ্টতা ও ভূমিকা ছিল; ঘটনার আগে বিডিআর বিদ্রোহ মোকাবিলায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর ভূমিকা কেমন ছিলÑ এসব বিষয় বের করতে সক্ষম হযেছে তদন্ত কমিশন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন বিদ্রোহের বিষয়টি জানার পরও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি; সে বিষয়টিও থাকছে কমিশনের প্রতিবেদনে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কমিশন গোয়েন্দা ব্যর্থতার স্বরূপ ও কারণগুলোও বিশ্লেষণ করে দেখেছে। এ ছাড়া কারা ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত ও আলামত ধ্বংস করেছেÑ এ বিষয়য়টিও বের করেছে তদন্ত কমিশন। তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চরম অবহেলা ও ব্যর্থতার কারণে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে এবং তৎকালীন সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ড ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ড প্রতিহত করতে যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনিÑ এ বিষয়টিও থাকছে প্রতিবেদনে। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে বিডিআর বিদ্রোহ এবং পরে পিলখানার ভেতরে হত্যাযজ্ঞসহ অন্যান্য অপরাধের সময় সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন নিষ্ক্রিয় ছিল; কমিশনের প্রতিবেদনে তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

কমিশনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে পিলখানার ভেতরে বিডিআর বিদ্রোহের পর রাজনৈতিকভাবে সমস্যা সমাধানের নামে অযথা সময়ক্ষেপণ করা হয়। যে কারণে সেনা অভিযান চালানো হয়নি। নিষ্ক্রিয় রাখা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। এমন প্রেক্ষাপটে বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যরা নির্বিঘ্নে পিলখানার ভেতরে হত্যাকাণ্ডসহ অন্যান্য অপরাধ সংঘটন করতে সক্ষম হয়। এ ছাড়া ওইদিন সকাল থেকে পিলখানার ভেতর থেকে আটকেপড়া সেনা কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও তাদের উদ্ধারে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এসব বিষয় তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

কমিশনের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান গতকাল শুক্রবার আমাদের সময়কে বলেন, কমিশন শিগগিরই তদন্ত রিপোর্ট সরকারের কাছে জমা দেবে। তার আগে রবিবার সকালে সংবাদ সম্মেলন করা হবে। তিনি বলেন, প্রজ্ঞাপনে যেসব বিষয় আমাদের দেখার জন্য বলা হয়েছিল আমরা সে অনুযায়ী কাজ করেছি। তদন্ত প্রতিবেদনে একগুচ্ছ সুপারিশও থাকছে বলে তিনি জানান।

কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করেন, ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির ঘটনা বিদ্রোহের কারণে নয়। এটি ছিল বিডিআর জওয়ানদের বিদ্রোহ সামনে রেখে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার পরিকল্পনা। ওই ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের ৭ দিন, ১০ দিন, ১৫ দিন বা এক মাস আগে পদায়ন হওয়া কর্মকর্তাদেরও হত্যা করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পিলখানার ভেতরে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা আগে থেকেই জানতেন। তার পরও বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া হয়েছিল। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এর আগে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে দুটি তদন্ত কমিশন হয়েছিল। ওই দুই কমিশনের প্রতিবেদনও যাচাই-বাছাই করেছে স্বাধীন তদন্ত কমিশন। আগের দুটি প্রতিবেদন তৈরির সময় আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকে ডাকা হয়েছিল, তাদের স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারেনি বলে কমিশনের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন আগের কমিশনের কয়েকজন সদস্য। এমনকি ওই সময় সেনাবাহিনী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন সমন্বয়ের নামে অনেক তথ্য লুকানোর চেষ্টা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

তদন্তকালে তদন্ত কমিশন শেখ হাসিনাসহ ১৫ জনকে সাক্ষ্য দিতে ডাকলেও জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের ডাকে সাড়া মেলেনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তবে তদন্ত কমিশন পলাতক আওয়ামী নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজমের জবানবন্দি নিয়েছে ইমেইলের মাধ্যমে।

গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমানকে সভাপতি করে ৮ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কমিশনকে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে সংঘটিত ঘটনার প্রকৃতি ও স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে বলা হয়। এ ছাড়া ঘটনাকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য অপরাধ সংঘটনকারী, সহায়তাকারী, ষড়যন্ত্রকারী, ঘটনার আলামত ধ্বংসকারী, ইন্ধনদাতা এবং অপরাপর বিষয়সহ দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্ট অপরাধী ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, বিভাগ, সংগঠন ইত্যাদি চিহ্নিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর পর কমিশন তদন্তকালে অন্তত ২০০ জনের জবানবন্দি গ্রহণ করে। জব্দ করে বিপুল পরিমাণ নথিপত্র, ভিডিও ফুটেজ, অডিও রেকর্ডসহ অন্যান্য আলামত।

তদন্তকালে কমিশন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ, আইজিপি নূর মোহাম্মদ, তৎকালীন এসবি প্রধান বাহারুল আলম, তৎকালীন মন্ত্রী ফারুক খান, সাবেক এমপি আসাদুজ্জামান নূর, বর্তমান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, বিজিবির সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মইনুল ইসলাম, কারাবন্দি চাকরিচ্যুত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানসহ অন্তত ২০০ জনের বক্তব্য নেয়। এর মধ্যে ৫৫ জন সামরিক অফিসার, কারাবন্দি দণ্ডপ্রাপ্ত ২৫ জন বিডিআর সদস্য, কারামুক্ত বিডিআর সদস্য, শহীদ পরিবারের সদস্য ছাড়াও সাবেক সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীর প্রধান; বিভিন্ন গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রয়েছেন। কমিশনের তদন্তকালে ৩৩ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদর দপ্তরে বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। এ ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোড়ন তোলে। বিদ্রোহের পর সীমান্তরক্ষী এই বাহিনীর বিডিআর নাম বদলে করা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। পরিবর্তন করা হয় ইউনিফর্মও।