একসময় বেদখল জমি পুনরুদ্ধার করতে বছরের পর বছর আদালতের দ্বারে ঘুরতে হতো। মামলার জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা জমির প্রকৃত মালিকদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করত। তবে এখন সেই ঝামেলা আর নেই। নতুন ভূমি আইন ও বিধিমালার আওতায় মাত্র তিন মাসের মধ্যেই বেদখল জমি ফেরত পাওয়া সম্ভব। আসুন জানি, কীভাবে এই প্রক্রিয়া কার্যকর হয়।
কোথায় এবং কিভাবে মামলা করবেন?
যদি আপনার জমি থেকে কেউ জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে, তাহলে রিকভারি অফ পজিশন বা খাস দখলের জন্য মামলা দায়ের করতে হবে। আগে যেখানে জজ কোর্টে মামলা করে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতো, এখন সেই মামলা সরাসরি এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট করা যায় এবং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় মাত্র তিন মাসের মধ্যেই।
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩ ও বিধিমালা ২০২৪
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ সালে প্রণীত ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং ২৪ অক্টোবর ২০২৪ সালে গৃহীত বিধিমালা অনেক দ্রুত ও কার্যকরভাবে দখল পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করছে। বিধিমালার ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, অবৈধভাবে দখলচ্যুত ব্যক্তি তার আবেদন দাখিল করতে পারবেন এবং তা নিষ্পত্তি করা হবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে।
এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট আবেদন পদ্ধতি
যে কোনো ব্যক্তি যদি আদালত বা কর্তৃপক্ষের আদেশ ছাড়া তার জমি থেকে উচ্ছেদ হন, তিনি নির্ধারিত ফর্ম অনুযায়ী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে পারবেন। এই ফর্মটি বিধিমালার পরিশিষ্ট ৫-এ উল্লেখ রয়েছে।
আবেদন ফর্মে দিতে হবে এই তথ্যগুলো
জমির তফসিল, খতিয়ান, দাগ ও পরিমাণ; সর্বশেষ জরিপ ও নামজারী খতিয়ান; ভূমি হস্তান্তর বা উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানার তথ্য; আদালতের আদেশ থাকলে তার বিবরণ; কতদিন ধরে দখলে ছিলেন ও কিভাবে দখল করেছিলেন; উচ্ছেদের সময় ও পদ্ধতি; জমি যৌথভাবে দখল করা হয়েছিল কিনা; চলমান দেওয়ানী মামলা থাকলে তার অবস্থা; ছবি, ভিডিওসহ প্রমাণাদি।
প্রয়োজনীয় সংযুক্তি
আবেদনের সঙ্গে জমি মালিকানার দলিল, জরিপ কাগজ, নামজারী খতিয়ান, হোল্ডিং নম্বর, ভূমি উন্নয়ন করের তথ্য, নোটিশ ফর্ম, ছবি বা ভিডিও, ফটোকপি ও নির্ধারিত ফি জমা দিতে হবে।
এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কীভাবে পদক্ষেপ নেবেন?
আবেদন পাওয়ার ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিপক্ষকে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হবে। এরপর মাঠপর্যায়ে তদন্তের জন্য আদেশ দেওয়া হবে এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদন দাখিল করবেন। প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেট নিজেই তদন্ত করে, পক্ষসমূহের শুনানি গ্রহণ করে ও প্রমাণাদি যাচাই করে আদেশ দেবেন।
একতরফা আদেশ এবং দখল হস্তান্তর
প্রতিপক্ষ অনুপস্থিত থাকলে একতরফা আদেশ দিয়েও দখল পুনরুদ্ধার করা যাবে। আদেশের ১৫ দিনের মধ্যে দখল হস্তান্তর না হলে, ম্যাজিস্ট্রেট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় তা কার্যকর করতে পারেন।
অবৈধ দখলদারের বাধা হলে কী হবে?
যদি দখল হস্তান্তরে বাধা প্রদান করা হয়, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ফৌজদারি আদালতে অভিযোগ পাঠাতে পারেন। প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাও করা যেতে পারে।
অ্যাডভোকেট ছাড়াও আবেদন সম্ভব
আইনের ধারা অনুযায়ী, দখল পুনরুদ্ধারের আবেদন ব্যক্তি নিজে অথবা তার নিযুক্ত কেউ করতে পারেন। তবে আইনের জটিলতা বোঝা সাধারণ মানুষের জন্য সহজ নয়, তাই একজন দক্ষ অ্যাডভোকেটের সাহায্য নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।
প্রক্রিয়ার সময়সীমা
ভীষণ দীর্ঘসূত্রিতার ঝুঁকি এড়াতে, ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩-এর ৮ ধারায় বলা হয়েছে, আবেদন পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। দায়িত্বে অবহেলা হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেওয়ানী আদালতে মামলা থাকলে কী করবেন?
যদি দেওয়ানী আদালতে মামলা চলমান থাকে, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট সরাসরি আবেদন করা যাবে না। তবে সংশ্লিষ্ট আদালত চাইলে বা আবেদন করলে সেই মামলাটি ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট প্রেরণ করতে পারেন।
ভূমি দখল সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা ও ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিতে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩ এবং বিধিমালা ২০২৪ কার্যকর পদক্ষেপ। এই আইন অনুযায়ী, মাত্র তিন মাসের মধ্যেই ফিরে পাওয়া সম্ভব আপনার বেদখল হওয়া জমির পূর্ণ দখল। তাই আইন জানুন, প্রয়োগ করুন এবং নিজের অধিকার সুরক্ষিত রাখুন