
নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পরপরই হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের রাজনীতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলসহ সর্বত্র এক ধরনের অস্বস্তি ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। চলছে সমাবেশ, অবরোধ, বিক্ষোভ, নানা ইস্যুতে দাবি আদায়ের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি। সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীসহ ১৬ জনের গ্রেপ্তার, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউটের ছাত্রদের আন্দোলন, শিক্ষকদের আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের ওপর হামলার ঘটনাসহ বিভিন্ন ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া চলছে। প্রায় সব রাজনৈতিক দল নুরুল হক নুরের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছে। নুরের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও। বিষয়টি নিয়ে বিশেষ সভা ডেকেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। আর আজ রোবাবর প্রধান উপদেষ্টা বৈঠকে বসবেন বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতাদের সঙ্গে। সব মিলিয়ে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে সব পক্ষকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। তার পরও উঠছে নানা প্রশ্ন। ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে কি না, সংস্কার প্রশ্নে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না, নির্বাচন পিআর পদ্ধতিতে না প্রচলিত সংবিধান অনুযায়ী, অস্থির পরিবেশ তৈরি করে বিশেষ কোনো মহল ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে কি না ইত্যাদি অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মধ্যে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, গত বছরের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। তাদের দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ছিল বড় ইস্যু। সেটা অনেকটা সফলতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করছে সরকার। এরপর বিভিন্ন ইস্যুতে একের পর এক আন্দোলনের মাধ্যমে ক্রমাগতভাবে অস্থিরতা তৈরি করা হয়। সচিবালয়ে আন্দোলন, রাজপথে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, আনসারদের আন্দোলন, বিডিআরের চাকরিচ্যুতের আন্দোলনসহ বেশকিছু ইস্যুতে আন্দোলনের মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়। সরকার পর্যায়ক্রমে সেগুলো দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করে। এরই মধ্যে ‘মঞ্চ-৭১’ নামে একটি সংগঠনের আলোচনা সভা থেকে আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাফিজুর রহমান কার্জনসহ ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ বিষয়েরও পক্ষে-বিপক্ষে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, বিএনপিসহ বড় রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি ছিল যৌক্তিক সময়ে নির্বাচন দেওয়া। প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে ভাষণের মাধ্যমে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের একটি রূপরেখা ঘোষণা করেন। নির্বাচন কমিশন থেকেও বেশকিছু শর্তসাপেক্ষে একটি নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। সেটা বিএনপি স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ কিছু দল জুলাই সনদ, সংস্কার ইস্যুসহ বিভিন্ন দাবিতে অনড় রয়েছে। এখনো সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে সময়মতো নির্বাচন নিয়ে সংশয় রয়েছে, যা দেশকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে।
এদিকে এনসিপিসহ একাধিক রাজনৈতিক দল থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, জাতীয় পার্টিকে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করার প্রক্রিয়া চলছে। জুলাই বিপ্লবে অংশ নেওয়া নেতারা মনে করেন, ফ্যাসিবাদের অন্যতম সহযোগী ছিল জাতীয় পার্টি। স্বৈরাচার হিসেবে চিহ্নিত করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ তাদের সহযোগী জাতীয় পার্টির সম্পর্কে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করা ও নেতাদের গ্রেপ্তারের দাবি রাজনীতিতে উত্তাপ তৈরি করবে। জাতীয় পার্টির বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান শনিবার বলেন, জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষণার যে দাবি উঠেছে, তা আইনগতভাবে যাচাই-বাছাই করে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতি পুরোপুরি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে জুলাই মঞ্চ। ‘মার্চ টু জাতীয় পার্টি অফিস’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স।
বিশ্লেষকরা আরও বলেন, দেশের স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। রোডম্যাপ ঘোষণা করা হলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য করা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। গত ২৮ আগস্ট নির্বাচনের একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করে কমিশন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করবে কমিশন। শিক্ষক প্রতিনিধি, নারী সমাজ, সুশীল সমাজ, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেবে। কিছু অমীমাংসিত ইস্যুতে এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি ইসি। জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বেশ কিছু দল পিআর পদ্ধতি, জুলাই সনদসহ বেশ কিছু ইস্যুতে অনড় রয়েছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি বিদ্যমান সংবিধানের মধ্যে থেকে নির্বাচন করার পক্ষে। কেউ কেউ বলছেন, রোডম্যাপ ঘোষণার পর যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। বিষয়টিকে তারা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছেন, নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসবে এ ধরনের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ আরও বেশি বেশি দেখা দেবে। সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ধৈর্যের সঙ্গে এসব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাই সংস্কার, জুলাই সনদসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দরকার জুলাই বিপ্লবের স্পিরিটধারীদের রাজনৈতিক ঐক্য জরুরি।
এদিকে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খোদ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার নিজের ভেরিফাই ফেসবুক পেজে তিনি বলেন, ‘আমরা গণতান্ত্রিক উত্তরণের এক অত্যন্ত নাজুক সময়ের মধ্যে আছি। যার প্রথম পদক্ষেপ হলো জাতীয় নির্বাচন। সম্মিলিতভাবে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, আজকের ঘটনার মতো অস্থিতিশীল ঘটনাগুলো যেন আর না ঘটে এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার পথ যেন বাধাগ্রস্ত না হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘গণতন্ত্রপন্থি অংশীজনরা, যার মধ্যে বিএনপি ও তার মিত্ররাও রয়েছে, তাদের অবশ্যই সংযম ও সহনশীলতা বজায় রাখতে হবে। গত বছরের গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত চেতনাকে অবশ্যই প্রাধান্য দিতে হবে। তিনি দেশকে অবশ্যই মবের শাসন এবং বর্তমান অস্থিরতার পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে হবে বলে জানান।’
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত রোডম্যাপকে সুষ্ঠু নির্বাচন ভন্ডুল করার নীলনকশা বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, ‘প্রচলিত পদ্ধতি ও নতুন পিআর পদ্ধতি; দুটির মধ্যে একটি নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত রোডম্যাপ ঘোষণা ইসির বড় ধরনের অপরাধ। নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে রিফর্ম চার্টারের মাধ্যমে আগামী নির্বাচন করতে বাধ্য করবে জামায়াতে ইসলামী।’
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের ওপর হামলার পর অন্তর্বর্তী সরকার গতকাল একটি বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিকে ঐক্যের আহ্বান জানানো হয়। এতে বলা হয়, ‘জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব শক্তির ঐক্যই আমাদের সংগ্রামের অর্জনকে রক্ষা করবে, জনগণের ম্যান্ডেটবিরোধী সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবে এবং গণতন্ত্রে সফল উত্তরণ নিশ্চিত করবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দৃঢ়ভাবে পুনর্ব্যক্ত করছে যে জাতীয় নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হবে। জনগণের কাছে এটি আমাদের অঙ্গীকার। নির্বাচন বিলম্বিত বা ব্যাহত করার যে কোনো ষড়যন্ত্র কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। জনগণের ইচ্ছাই চূড়ান্তভাবে প্রতিফলিত হবে এবং কোনো অশুভ শক্তি আমাদের গণতন্ত্রের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না।’
দেশের চলমান নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান শনিবার কালবেলাকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যা করছেন তাতে আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। তবে শোনা যাচ্ছে, তার টিমের মধ্যে কিছুটা বিভাজন তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ চাচ্ছেন আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগে ক্ষমতা অন্যের হাতে চলে যাক। সেজন্যই গত শুক্রবার একটি অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে।’ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণে আমি অবাক হয়েছি। তবে দেশের চলমান পরিস্থিতিতে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং আরও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে কোনো সমস্যার সমাধান হওয়াটা বাঞ্ছনীয়।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি ও সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ চলমান অস্থিরতার জন্য বর্তমান সরকারকে দায়ী করে বলেন, ‘বিভিন্ন সংস্থার জরিপে উঠে এসেছে দেশের ৭১ শতাংশ জনগণ পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন চায়। সেখানে একটি দলের আপত্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে পিআর পদ্ধতি চালু না করলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কোনোভাবেই বিপ্লবী সরকার বলা যাবে না। সরকার যদি জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়, তবে জনগণ দাবি আদায়ে রাজপথে নামতে বাধ্য হবে। তাই জনগণ রাজপথে নামার আগেই জনগণের দাবি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, যে পদ্ধতির নির্বাচনে স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও জনগণের সরকার গঠিত হয়নি, সেই পদ্ধতি জনগণ আর চায় না। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের তৈরি আইনে নির্বাচন হলে আবারও ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটবে। এজন্য জনগণ প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন চায়। পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণের সংসদ ও জনগণের সরকার গঠিত হবে।’
শুক্রবার গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের ওপর হামলার পর শনিবার জরুরি বৈঠকে বসেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সেখানে অভিযানে অংশ নেওয়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের কার কী ভূমিকা ছিল, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। ওই সভায় উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, ‘পুলিশের কিছু কর্মকর্তার হঠাৎ করেই অতি উৎসাহী হয়ে ওঠার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের এসব কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডে নীতিনির্ধারকরা বিব্রত হলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে একরকম তাদের পক্ষে অবস্থান নিতে হচ্ছে। এতে জনজীবনে নিরাপত্তাহীনতাসহ পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।’
পুলিশের এক ডিআইজি কালবেলাকে বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে কোনো ধরনের সংস্কার ছাড়াই ‘বঞ্চিত দাবিদার’ কতিপয় কর্মকর্তাদের পুলিশের নেতৃত্বে নিয়ে আসা হয়; কিন্তু মাঠপর্যায়ে ইউনিটের দায়িত্ব দেওয়া কর্মকর্তাদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। রাজধানীর রমনা বিভাগে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও দফায় দফায় প্রশ্ন উঠছে। পুলিশ কি এখানে সরকার বা রাজনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে পরিস্থিতি আরও নিবিড়ভাবে মোকাবিলা করতে পারত না।’
বিশেষজ্ঞ মতামত:
বর্তমান পরিস্থিতি নাজুক হলেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয় বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘সব জায়গায় সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। নুরুল হক নুরের ওপর হামলাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু কর্মকাণ্ড সরকারকে বিব্রত করেছে। তবে সরকারের হাতে নানা ম্যাজিক থাকে। সরকার নিশ্চয়ই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ নুরুল হক নুরের ওপর হামলা, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, ‘নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসবে এ ধরনের পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জ বাড়তেই থাকবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নির্বাচনকেন্দ্রিক অনেক ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে সেগুলো দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়। নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তপশিল ঘোষণার পর ইসির অধীনে কাজ করবে। এখন তারা নিজ নিজ ইউনিটের কর্মকর্তাদের অধীনে কাজ করছে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের উচিত মাঠপর্যায়ে এমন কোনো কাজ না করার যাতে পুলিশের বা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে। যে কোনো অভিযানের সময় ধৈর্য ধরে কাজ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়, এসব ঘটনা জাতীয় নির্বাচনের ওপর প্রভাব পড়বে না।’
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক ও ইনস্টিটিউট ফর ইনোভেশন ইন পলিসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইআইপিডি) নির্বাহী পরিচালক মো. বোরহান উদ্দিন কালবেলাকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি রাজনীতিসহ সর্বত্র এক ধরনের উত্তাপ তৈরি হয়েছে। সব পক্ষই যেন অধৈর্য হয়ে উঠেছে। এর মূল কারণ হচ্ছে ক্ষমতার জন্য দৌড়। ক্ষমতামুখী হয়ে গেলে এনসিপিসহ জুলাই বিপ্লবের পর যেসব রাজনৈতিক দল তৈরি হয়েছে, তারা অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। জুলাই সনদ না করে মৌলিক সংস্কার না করে নির্বাচন হলে আবার আওয়ামী লীগের মতো ফ্যাসিবাদের উত্থান হতে পারে। সংস্কার প্রশ্নে সব রাজনৈতিক দলের কনসেপ্ট এক জায়গায় আসতে হবে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সবাইকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থেকে একটি বটম লাইন তৈরি করতে হবে। তা হলে কেউ নির্বাচনে যেতে চাইবে কেউ আটকাতে চাইবে। এটা দেশকে আরও অস্থিতিশীল করে ফেলবে। নির্বাচনের সময় পুলিশি আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ সংস্কার না করে নির্বাচন দিলে তারা ফ্যাসিবাদী আমলের মতো আচরণ করবে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হলেও তাদের সমর্থকদের বড় একটি অংশ রয়ে গেছে। এরা যে কোনো সময় অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব পক্ষের ঐক্য থাকবে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেশের বর্তমান স্থিতিশীলতার জন্য রাজনৈতিক ঐক্যের বিকল্প নেই।