ঘাটে ঘাটে টোল আদায়ের যন্ত্রণায় দিশেহারা বরিশাল ইলিশ মোকামের সাধারণ ব্যবসায়ীরা। সরকারি দুই দপ্তরকে আলাদাভাবে টোল দিতে হচ্ছে তাদের। একই বাজার থেকে দুই দপ্তরের এভাবে রাজস্ব আদায়ের রেকর্ড নেই দেশের আর কোথাও। এর মধ্যে আবার বিআইডব্লিউটিএ-এর (বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ) নামে অবৈধভাবে টোল নিচ্ছেন কতিপয় বিএনপি নেতা। অথচ এখানে এখন পর্যন্ত ইজারাদার নিয়োগ করা হয়নি বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) দেওয়া ইজারা নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। মৎস্য আড়তদার সমিতির নামেও এখানে টাকা নেওয়া হয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। প্রতি মন মাছে আলাদা করে ওই টাকা নেন সমিতির নেতারা। এভাবে বেপরোয়া টোলের কারণে দিনদিন বাড়ছে মাছের দামও।
নগরীর পোর্ট রোডে কীর্তনখোলা নদীর তীরে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী পাইকারি মৎস্য বাজার। দেশজুড়ে যার পরিচিতি ইলিশ মোকাম নামে। দেশে উৎপাদিত ইলিশের শতকরা প্রায় ৬৮ ভাগের কেনাবেচা হয় এই মোকামে। সেই সঙ্গে চলে নানা ধরনের মাছের কয়েক কোটি টাকার বিকিকিনি। একসময় বিআইডব্লিউটিএ-এর নিয়ন্ত্রণে ছিল এই মোকাম। দলিল-দস্তবেজ অনুযায়ী মোকামের মালিকও তারা। সেভাবেই এখানে চলছিল তাদের টোল আদায়। বছর সাতেক আগে মোকামে ঢোকে বরিশাল সিটি করপোরেশন। ভেতরে থাকা শহীদ জিয়া পাইকারি মৎস্য বাজারটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইজারা দেয় তারা। তখন থেকেই বিআইডব্লিউটিএ-এর সঙ্গে শুরু হয় নগর ভবনের ঠান্ডা লড়াই।
মোকামের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, আড়তদারদের টাকায় গড়ে ওঠা এই বাজারের জমির মালিক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। শহীদ হওয়ার পর তার সম্মানে ব্যবসায়ীরা বাজারটির নাম দেন ‘শহীদ জিয়া পাইকারি মৎস্য বাজার’। জমিটি কেনা হয় তারই নামে। ব্যবসায়ীদের টাকায় গড়া বাজারের টোল নিতেন আড়ত মালিকরা। নগর ভবনের অনুমতি নিয়ে টোল আদায়ের পাশাপাশি রাজস্বের একটা অংশ দেওয়া হতো সিটি করপোরেশনকে। সাদিক আব্দুল্লাহ মেয়র হওয়ার পর ব্যবসায়ীদের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হয় বাজারের নিয়ন্ত্রণ। বাজারঘাট তথা বিআইডব্লিউটিএ-এর ইজারা তুলে দেওয়া হয় তার অনুগত এক আওয়ামী লীগ নেতার হাতে। এক হাতে তিনি তুলতেন দুই দপ্তরের টোল। তখন থেকেই শুরু মোকামে দ্বৈত টোল আদায়ের দুর্গতি।
৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ পালিয়ে গেলে মোকামের নিয়ন্ত্রণ যায় বিএনপি নেতাদের হাতে। নির্বাচন ছাড়াই আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হন মহানগর মৎস্যজীবী দলের সদস্য আব্দুস সালাম এবং সদস্য সচিব মো. কামাল। আগের মতো মৎস্য বাজারের টোল আদায়ের দায়িত্ব আড়তদারদের দেওয়ার জন্য নগর ভবনে আবেদন করেন তারা। তবে জমির মালিকানা স্বত্বের বৈধ কোনো কাগজপত্র না থাকায় তা দেয়নি বিসিসি। বিসিসি প্রশাসক বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার রায়হান কাওসার জানিয়ে দেন, জমির মালিকের ওয়ারিশদের এ ব্যাপারে আবেদন করতে হবে। পরে ৭০ লাখ টাকায় বাজারটি ইজারা দেওয়া হয় সোহাগ নামে এক ব্যক্তির কাছে। এদিকে একই বাজারসহ ঘাট ইজারা দিতে টেন্ডার আহ্বান করে বিআইডব্লিউটিএ। ১ কোটি ৫০ লাখ টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা হন শাখাওয়াত হোসেন নামে এক ইজারাদার।
বিআইডব্লিউটিএ-এর টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও প্রায় ৪ মাস প্রতিদিন এই মোকাম থেকে ৬০-৭০ হাজার টাকা আদায় হচ্ছে সংস্থাটির নামে। বরিশাল মহানগর বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক আল আমিন খান এবং তার সহযোগীরা উঠাচ্ছেন এই টাকা। যার কোনো আইনি বৈধতা নেই। ব্যবসায়ীরা জানান, ট্রলার নৌকা থেকে প্রতি মন মাছে ১০০ টাকা নেন তারা। সড়কপথে আসা মাছে নেওয়া হয় মনপ্রতি ৬০ টাকা। এছাড়া মোকামের অভ্যন্তরে থাকা দোকান থেকে আদায় করা হয় ৫০ টাকা করে। অন্যদিকে নগর ভবনের নামে দোকানপ্রতি ২০ থেকে ১০০ টাকা নেয় বিসিসির ইজারাদার। এছাড়া আড়ত মালিক সমিতিও মনপ্রতি ২০ টাকা নেয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। এক হিসাবে দেখা যায়, দৈনিক এই মোকামে গড়ে ১২শ মনের মতো মাছ আসে। তাতে তিন গ্রুপের নেওয়া টোল বাবদ প্রতিদিন আদায় হয় প্রায় দেড় লাখ টাকা।
বিআইডব্লিউটিএ বরিশাল বন্দর বিভাগের কর্মকর্তা ফারুক হোসেন বলেন, এখনো মৎস্য বাজারে কোনো ইজারাদার নিয়োগ হয়নি। সর্বোচ্চ দরদাতা যিনি, তিনিও জমা দেননি নিরাপত্তা জামানত কিংবা চুক্তির অগ্রিম টাকা। বরং নগর ভবন সেখান থেকে টাকা তুলছে বলে অভিযোগ করছে তারা। বিষয়টি লিখিতভাবে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি।
বৈধ কার্যাদেশ না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে টোল আদায় করছেন জানতে চাইলে আল আমিন খান বলেন, আমরা সর্বোচ্চ দরদাতা নির্বাচিত হয়েছি। বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের মোটা অঙ্কের পে অর্ডার জমা আছে। তাদের মৌখিক নির্দেশেই টোল উঠাচ্ছি। তবে আল আমিন কিংবা শাখাওয়াতের তরফ থেকে সরকারি রাজস্ব খাতে কোনো টাকা জমা হচ্ছে না বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
ব্যবসায়ীরা বলেন, এভাবে ঘাটে ঘাটে টোল দিতে গিয়ে লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। এ কারণে মাছের দামও বাড়ছে। যার খেসারত দিচ্ছেন ক্রেতারা।
অভিযোগ সম্পর্কে আড়তদার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন খান বলেন, মোকাম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাসহ সমিতি ও মসজিদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা ব্যয় হয়। সেজন্য মনপ্রতি ২০ টাকা করে নেওয়া হয়। আড়তদাররা তো মাসে মাত্র ৫০ টাকা দেন। তাতে কিছুই হয় না।