Image description

বারবার মুখ থুবড়ে পড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন আশার আলো। লাখো রোহিঙ্গা স্বপ্ন দেখছে ভিটেমাটিতে ফিরে যেতে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া তালিকাভুক্ত ৮ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে প্রথম ধাপে ১ লাখ ৮০ হাজার মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার যোগ্য বলে জানিয়েছে দেশটির জান্তা সরকার। চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে আছে আরও ৭০ হাজার রোহিঙ্গা। বাকি সাড়ে ৫ লাখ রোহিঙ্গাকে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে দ্রুত প্রত্যাবাসন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার কথাও জানিয়েছে মিয়ানমার। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেনটেটিভ খলিলুর রহমানকে এ কথা জানিয়েছেন মিয়ানমারের জান্তা সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী ইউ থান শিউ। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে গত শুক্রবার বৈঠক করেন তারা।

সূত্র জানায়, বর্তমানে বাংলাদেশে সাড়ে ১২ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। তাদের মধ্যে ভাসানচরে পুনর্বাসন করা হয়েছে ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে। ২০২০ সালের পর বাংলাদেশ নতুন করে আরও ৭০ হাজার মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে।

মিয়ানমার জান্তা সরকারের পক্ষ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণায় উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রিত লাখো রোহিঙ্গার মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ, অবিশ্বাস কাজ করছে তাদের মধ্যে। নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার জন্য সব সময়ই প্রস্তুত তারা। যেতে মন চাইলেও ভয়ে আছেন রোহিঙ্গারা। কারণ জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে দেশটির বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মি যুদ্ধ করে রাখাইনের অধিকাংশ অঞ্চল দখল করে রেখেছে। এখন জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চাইলেও সেটা আরাকান আর্মি মানবে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

উখিয়ার কুতুপালং ডি-৫-এর হেডমাঝি শামসুল আলম কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা আমাদের দেশে যেতে চাই; কিন্তু কে আমাদের রিসিভ (গ্রহণ) করবে। আমাদের মুসলিম অধ্যুষিত তিন জেলা রাচি ডং, বুচি ডং, মংডুতে জান্তার কোনো অস্তিত্ব নেই। বর্তমানে এসব এলাকা আরাকান আর্মির দখলে।’

কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প সি-২ আশ্রিত রোহিঙ্গা নুরুল মোস্তফা বলেন, ‘আমরা কোথায় যাব? জান্তা সরকার আমাদের কোথায় রাখবে? পুরো মিয়ানমারই এখন অশান্ত।’

মোছনি নয়াপাড়া ক্যাম্পের হেডমাঝি ঈমাম হোছেন বলেন, ‘মিয়ানমার আমাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। আমরা নিজ দেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। আমাদের কোনো ভোটাধিকার নেই। ম্যাট্রিকের পর পড়ার সুযোগ নেই। জান্তা সরকার আমাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিলে আমরা বাপ-দাদার ভিটেমাটিতে অবশ্যই ফিরে যাব।’

টেকনাফের জাদিমুড়া ক্যাম্পের রোহিঙ্গা আলী আহম্মেদ বলেন, ‘আমি ২০১৭ সালে জীবন বাঁচাতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসি। সেই থেকে এখন পর্যন্ত ক্যাম্পের মধ্যে বসবাস করছি। কিন্তু ক্যাম্পের এই জীবন আর ভালো লাগছে না। আমরাও পৃথিবীর অন্য দেশের নাগরিকদের মতো নিজ দেশে বসবাস করতে চাই। সম্প্রতি ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত নেওয়ার বিষয়ে যে কথা আমরা শুনেছি, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের।’

নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নবী হোসেন বলেন, ‘প্রাণ বাঁচাতে আমরা যখন মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলাম, এর পর থেকে বলে আসছি আমরা নিরাপদে রাখাইনে ফেরত যেতে চাই। কারণ রাখাইনে আমাদের ধনসম্পদ, বাড়িঘর, ব্যবসা-বাণিজ্য সব ছিল। এখন ক্যাম্পে ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করতে হচ্ছে। ঝুপড়ি একটি-দুটি ছোট রুমে ছেলেমেয়ে ও স্বামী-স্ত্রী কত কষ্ট করে বসবাস করছি, তা আমরা বুঝতেছি। তাই ক্যাম্পের জীবন ছেড়ে নিজের বাড়িঘরে থেকে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ব। মিয়ানমার জান্তা সরকার আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে আমরা ফেরত যেতে প্রস্তুত।’

টেকনাফ হ্নীলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে আশ্রয়ে রয়েছে। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে একাধিকবার বৈঠক ও আলোচনা হয়েছে। তবু কোনো রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার সরকার ফেরত নিয়ে যায়নি। এখন নতুন করে আমরা আশার বাণী শুনছি। আমরা সেই আশার বাণীর দ্রুত বাস্তবায়ন চাই। আমরাও চাই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন করা হোক।’

কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক হুইপ শাহজাহান চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ‘আমার বাড়ি উখিয়ায়। মিয়ানমার জান্তার নির্যাতনে বাস্তুহারা রোহিঙ্গারা সবাই আমার নির্বাচনী এলাকায় আশ্রিত। গত মাসে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ও জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উখিয়ায় লাখো রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতার করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের প্রচেষ্টা ও জান্তা সরকারের ঘোষণা সবই আমি পজিটিভ হিসেবে দেখছি। তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সফলতা নির্ভর করবে তিনটি পক্ষের ওপর। বাংলাদেশকে অবশ্যই সামরিক জান্তার পাশাপাশি রাখাইন দখলে নেওয়া আরাকান আর্মির সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হবে।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। রাখাইনের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল। সেখানে নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সম্প্রতি জাতিসংঘের মহাসচিবও বলেছেন, রাখাইনে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই প্রত্যাবাসনের কথা বিবেচনা করা হবে। এখন সেখানে রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য বাড়িঘর নেই। দ্বিতীয়ত, যেসব এলাকায় রোহিঙ্গাদের বসতি ছিল, সেসব এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে? কখন, কীভাবে, কার ক্লিয়ারেন্সে তা সম্ভব হবে—এসবই অনিশ্চিত।’

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মিজানুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা সামরিক জান্তা কর্তৃক প্রত্যাবাসনের ঘোষণা আমি পজিটিভ হিসেবে দেখছি। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে হবে। যে কোনো কিছুর জন্য আমরা প্রস্তুত রয়েছি।’