Image description
অতি জরুরি যন্ত্রপাতি নেই ক্রয় তালিকায়

রাজধানীর হাসপাতালগুলোর জন্য হাজার কোটি টাকা খরচ করে সিটি স্ক্যান, এমআরআই, লিনিয়ার এক্সিলারেটরসহ বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসাযন্ত্র কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। আসছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব চিকিৎসাযন্ত্র কেনার বিষয়ে সম্প্রতি সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে হাসপাতালগুলোর জন্য বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসাযন্ত্র কেনা হলেও সেগুলোর সুফল অনেক ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, যন্ত্রপাতি কেনার আগে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবহারকারীদের মতামত নেওয়া হয় না, যাচাই করা হয় না প্রয়োজনীয়তা। এ ছাড়া যন্ত্র স্থাপনের জায়গা আছে কি না বা, সেগুলো চালানোর জন্য প্রশিক্ষিত লোকবল আছে কি না—কোনো কিছুই নিশ্চিত করা হয় না। এমনকি কেনাকাটার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যন্ত্রের দাম যাচাই পর্যন্ত করা হয় না।

এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. রুহুল ফুরকান সিদ্দিক কালবেলাকে বলেন, এসব ভারী যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে নিডবেজ অ্যাসেসমেন্ট করা হয়েছে কি না, যন্ত্র কেনার কতদিন পরে সেটা সচল হবে, যেসব প্রতিষ্ঠানের জন্য যন্ত্রপাতি কেনা হবে, সেখানে এসব যন্ত্রপাতির প্রয়োজন আছে কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে। তারপর এসব ভারী যন্ত্রপাতি সেখানে স্থাপন করার ব্যবস্থা আছে কি না এবং সেগুলো পরিচালনা করার উপযুক্ত লোক আছে কি না সেটা নিশ্চিত হতে হবে। অন্যথায় মূল্যবান এসব যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অতীতে এ ধরনের বহু নজির রয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, মোট ১৬টি স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠান ঢাকায় এবং আটটি প্রতিষ্ঠান ঢাকার বাইরে। ঢাকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর), জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, শহীদ সোহারাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সব মিলিয়ে মোট বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক হাজার ১৪৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলো হলো—চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল বগুড়া এবং ৮টি বিভাগীয় শহরের অন্যান্য হাসপাতাল।

জানতে চাইলে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত) অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘আমরা জেনেছি বিভিন্ন চিকিৎসা যন্ত্রপাতির অভাবে রাজধানীসহ দেশের অনেক স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সেবা ব্যাহত হচ্ছে। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের সেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থ ছাড় হলে ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু হবে।’

ক্রয় তালিকায় দেখা গেছে, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লিনিয়ার এক্সিলারেটর কিনতে বাজেট ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ৩.০ টেসলা এমআরআই যন্ত্র কিনতে বাজেট ২৭ কোটি টাকা এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি কিনতে ধরা হয়েছে ৯৩ কোটি টাকা। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের জন্য ১২৮ স্লাইসের একটি সিটি এনজিওগ্রাম যন্ত্র কিনতে বাজেট ধরা হয়েছে ১৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের জন্য ১২৮ স্লাইসের সিটি স্ক্যান যন্ত্র কিনতে বাজেট ধরা হয়েছে ১২ কোটি টাকা। জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) একটি ১২৮ স্লাইসের সিটি স্ক্যান এবং একটি ১.৫ টেসলা এমআরআই যন্ত্রের জন্য বাজেট ধরা হয়েছে ৩২ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের জন্য একটি লিনিয়ার এক্সিলারেটর কিনতে ৪০ কোটি টাকা এবং একটি কার্ডিয়াক ক্যাথল্যাবের জন্য ৯ দশমিক ৫ কোটি টাকা বাজেট ধরা হয়েছে। জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের জন্য ৩.০ টেসলা এমআরআই এবং ১২৪ স্লাইস সিটি স্ক্যান কিনতে বাজেট ৪০ কোটি টাকা। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য একটি ১.৫ টেসলা এমআরআই, একটি ১২৮ স্লাইস সিটি স্ক্যান, একটি ৪ডি কলার ডপলার এবং একটি ৪ডি ইএসজি কিনতে বাজেট ৩২ কোটি টাকা। আট বিভাগীয় শহর এবং অন্যান্য হাসপাতালের জন্য ১০টি লিনিয়ার এক্সিলারেটর, ১০টি ৩.০ টেসলা এমআরআই এবং ১০টি ১২৮ স্লাইস সিটি স্ক্যান কিনতে বাজেট যথাক্রমে ৪০০ কোটি, ২৭০ কোটি ও ১২০ কোটি টাকা। এ ছাড়া মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য একটি করে দুটি কার্ডিয়াক ক্যাথল্যাব কেনার প্রস্তাবে বাজেট ধরা হয়েছে ১৯ কোটি টাকা।

এর আগে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (হসপিটাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট) ডা. জয়নাল আবেদীন টিটু এক ফেসবুক পোস্টে দেশের সব স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান প্রধানকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রের তালিকা পাঠাতে বলেন। সে নির্দেশনা অনুযায়ী সব বিভাগ থেকে তালিকা পাঠানো হয়। তবে মন্ত্রণালয়ের ক্রয় তালিকার সঙ্গে সে তালিকার কিছু পার্থক্য রয়েছে।

সব বিভাগ থেকে প্রয়োজন জানিয়ে পাঠানো তালিকা অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে একটি এমআরআই, একটি কোবাল্ট-৬০ যন্ত্র ও ১৭টি ডায়াথার্মি বেই-পোলার; চট্টগ্রাম বিভাগে দুটি এমআরআই, একটি সিটি স্ক্যান, একটি সি আর্ম, ৫টি এক্স-রে, ১০টি ডায়াথার্মি; ঢাকা বিভাগে ৯টি এমআরআই, ৮টি সিটি স্ক্যান, ১৫টি সি আর্ম, ৪৯টি ইসিজি, ৩২টি ডায়াথার্মি বাই পোলার; ময়মনসিংহ বিভাগে দুটি এমআরআই, একটি সিটি স্ক্যান, একটি সি-আর্ম, দুটি এক্স-রে, দুটি ক্লোনস্কোপি, ১২টি ইসিজি, ১২টি ডায়াথার্মি বাই পোলার; রাজশাহী বিভাগে ৪টি এমআরআই, দুটি সিটি স্ক্যান, ৩টি সি-আর্ম, একটি লিভার অ্যান্ড স্পিলন স্ক্যানার, একটি এক্স-রে, ১৭টি ইসিজি, ৩টি অটোমেটেড হেমাটেলালজি এনালাইজার, ২৫টি ডায়াথার্মি বাই পোলার; রংপুর বিভাগে ১টি এমআরআই, ১টি সি আর্ম, ৮টি ইসিজি, ১টি অটোমেটেড হেমাটেলালজি এনালাইজার ও একটি ডায়াথার্মি; সিলেট বিভাগে একটি এমআরআই, একটি সিটি স্ক্যান, একটি কোবল্টা-৬০, দুটি সি আর্ম, ১৬টি ইসিজি, ১২টি ডায়াথার্মি এবং খুলনা বিভাগে ৪টি এমআরআই, ৫টি সিটি স্ক্যান, একটি কার্ডিয়াক ক্যাথল্যাব, ৮টি সি আর্ম, ৩টি ক্লোনস্কোপি, ৬টি এক্স-রে, ২৮টি ইসিজি, ৩৪টি ডায়াথার্মি বাই পোলার চাওয়া হয়েছে। এ তালিকা থেকে শুধু সিটি স্ক্যান ও এমআরআইয়ের মতো ভারী ও ব্যয়বহুল যন্ত্রগুলো মন্ত্রণালয়ের ক্রয় তালিকায় জায়গা পেয়েছে। স্বল্পমূল্যের অতি জরুরি যন্ত্রগুলো কেনার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানা গেছে।

সামগ্রিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হয়তো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব মূল্যবান ভারী যন্ত্রপাতি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে প্রথমে দেখতে হবে, যে হাসপাতালের জন্য কেনা হবে, সেখানে এর উপযোগিতা রয়েছে কি না। তারপর এগুলো কেনার পাশাপাশি চালু রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে প্রয়োজনীয় লোকবল ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নয়তো এত দামে কেনা যন্ত্রপাতির সুবিধা কেউ পাবে না।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর চিকিৎসা যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্র্রেনিং সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে সেই প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় সক্ষমতা নেই। তাই যন্ত্রগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অবশ্যই কার্যকর চুক্তি করতে হবে, যাতে যন্ত্রের ওয়ারেন্টি পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ার পরও তারা দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ করে। নয়তো দেশের জনগণ এসব কেনাকাটার কোনো সুফল পাবে না।

আব্দুল হামিদের মতে, সব ধরনের কেনাকাটার আগে মন্ত্রণালয়ের উচিত অগ্রাধিকারভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। তাহলে রাষ্ট্রের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে।