
কুড়িগ্রাম জেলা সদরের আলু চাষি শাহ্ আলম বকুল। মৌসুমের শুরুতে তিনি এনজিও থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নেন। আবাদ করে আলু পেয়েছেন ছয় হাজার ৬০০ কেজি। ঋণ পরিশোধের চাপ থাকায় মাঠ থেকেই সব আলু বিক্রি করে দিয়েছেন। প্রতি কেজি আলু ১১ টাকা দরে বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৭২ হাজার টাকা। যদিও প্রতি কেজিতে তাঁর খরচ হয়েছে ২০-২১ টাকা। তিনি এখানো ২৮ হাজার টাকার ঋণ মাথায় নিয়ে ঘুরছেন।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার রায়গঞ্জের কৃষক আব্দুল করিম। চলতি মৌসুমে ১২ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ছয় একর জমিতে আলু আবাদ করেছিলেন। অর্থের সংস্থান করতে তিনি চড়া সুদে আত্মীয়-স্বজন ও এনজিও থেকে এবং স্বল্প সুদে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। উৎপাদিত আলুর প্রায় ৭০ শতাংশ বিক্রি করে দিলেও অর্ধেক ঋণও পরিশোধ করতে পারেননি তিনি। এখনো ছয় লাখ টাকা ঋণ পরিশোধ করতে হবে তাঁকে।
আব্দুল করিম কালের কণ্ঠের কাছে আক্ষেপ করে বলেন, ‘লাভের আশায় এবারে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে ছয় একর জমিতে আলুর আবাদ করে ৬৪ হাজার ৫০০ কেজি আলু পেয়েছিলাম। এর মধ্যে মাত্র ৫০০ বস্তা বা ২০ হাজার কেজি আলু হিমাগারে রাখতে পেরেছি। ঋণ পরিশোধের চাপে ৪৪ হাজার ৫০০ কেজি আলু বিক্রি করেছি। বাজারে দাম কম থাকায় পেয়েছি মাত্র সাড়ে ছয় লাখ টাকা। এর মধ্যে ছয় লাখ টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করেছি।
কিছু খরচ পরবর্তী শস্যের জন্য করতে হয়েছে। ফলে এবারের রোজার ঈদে পরিবারের জন্য কিছুই করতে পারিনি। বাকি ঋণের টাকা কিভাবে দেব, সেই চিন্তায় দিন পার হচ্ছে। আমার মাঠে ভুট্টা, মরিচ ও কচু আছে। মজুদ আলুর ভালো দাম পেলে আর আগামী শস্যে ভালো লাভ পেলে ঋণ পরিশোধ করতে পারব। তা না হলে ঋণখেলাপি হতে হবে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আলুর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা এক কোটি ১৩ লাখ ৮৭ হাজার টন। এবারে দেশে আলুর আবাদ লক্ষ্যমাত্রা চার লাখ ৬৭ হাজার হেক্টর। গত অর্থবছরে আলুর আবাদ ছিল চার লাখ ৫৮ হাজার হেক্টর। আলুর উৎপাদন ছিল এক কোটি ৯ লাখ ৬৫ হাজার টন। ফলে চলতি অর্থবছরে আলুর আবাদ ও উৎপাদন দুটিই বাড়বে বলে কৃষি বিভাগ মনে করছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সারা দেশে আলুর ফলন হলেও দাম না পাওয়ার কারণে হতাশ আলু চাষিরা। দেশের বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজারে আলুর দাম পড়ে গেছে। বর্তমান বাজারদরে প্রতি একর জমিতে কৃষকের ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এভাবে দরপতন হলে আগামী বছর আলু উৎপাদনে বিপর্যের শঙ্কা দেখা দিচ্ছে। আলু চাষ করে কুড়িগ্রামের কৃষক শাহ্ আলম বকুল কিংবা আব্দুল করিমের মতো কৃষকের জীবনের উন্নয়ন হয় না। তাঁদের এক ব্যাংক খেকে ঋণ নিয়ে আরেক ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে হয়। ঋণের জালে এভাবে আবদ্ধ হয়ে জীবন পার করতে হয়।
কৃষকরা বলছেন, তাঁরা সহজ শর্তে এনজিও থেকে ঋণ পান। সেখানে কাগজপত্র আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও কম। ফলে তাঁরা সেখান থেকে বেশি ঋণ নেন। যদিও সেখানে বেশি সুদ দিতে হয় তবু তাঁরা সেখানে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ ও হিমাগারসংকটের কারণে বেশির ভাগ কৃষক তাঁদের আলু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। তার পরও ঋণের টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। তাঁরা এখন চেয়ে আছেন পরের মৌসুমের ফসলের দিকে। সেটি দিতে ব্যর্থ হলে দেশের আলু চাষিরা ঋণখেলাপি হতে বাধ্য।
কুড়িগ্রামের রায়গঞ্জ বাজারের সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী কাজল বলেন, ‘এবারে আলু চাষিদের ব্যাপক লস হইছে। তাদের আবাদের টাকাও ওঠে নাই। একটা ঈদ গেল, কিন্তু কোনো আনন্দ নাই তাদের জীবনে। আসলে কৃষকরা কখনোই ভালো থাকে না। ঋণ নিয়ে ফসল ফলায় কিছু লাভ হলে হলো, না হলে আবার ঋণ নিয়ে ফসল ফলায় তারা। আমার দোকানেই কৃষকের লাখ লাখ টাকার বাকি রয়েছে। যখন কৃষক ফসল বিক্রি করে তখন টাকা দেয়। কিন্তু পুরোপুরি ঋণ খুব কম কৃষক পরিশোধ করতে পারে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের কৃষকদের দামের এই ধরনের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারিভাবে কেনা ও সংরক্ষণে নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভারতের ব্যবস্থাপনাটি একটি উদাহরণ হতে পারে। ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ২৩টি ফসল কিনে থাকে। কৃষকের যে উৎপাদন খরচ হয় তার চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি দামে কৃষকের কাছ থেকে এসব পণ্য ক্রয় করা হয়। সারা দেশে তাদের কৃষিপণ্যের উন্নত মজুদাগার ও সংরক্ষণাগার রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে শুধু ধান ও চাল সরকারিভাবে কেনা হয়। মজুদাগার না থাকায় কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কেনা হয় না।
এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, এবারে আলু চাষিরা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছেন। প্রতি কেজিতে ন্যূনতম পাঁচ থেকে সাত টাকা লোকসান হচ্ছে তাঁদের। এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের জন্য তিনটি কাজ করতে হবে। প্রথমত, সরকারিভাবে আলু কেনা হোক। দ্বিতীয়ত, হিমাগারগুলোতে ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হোক। হিমাগার মালিকদের কারসাজি রোধে হিমাগারগুলোতে প্রকৃত কৃষকদের জন্য মোট গুদাম সক্ষমতার ন্যূনতম ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ করতে হবে। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা প্রকৃত কৃষকদের তালিকা যাচাই-বাছাই করবেন। তৃতীয়ত, প্রক্রিয়াজাত কম্পানিগুলোকে ও রপ্তানি বাড়াতে উৎসাহিত করতে হবে।