Image description

এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। এটি অপ্রত্যাশিত না হলেও দেশের গার্মেন্টস শিল্পের আকস্মিক বিপদ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইচ্ছে পূরণে জুয়া খেলেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি পণ্য প্রবেশে নতুন শুল্কারোপ করেছেন। বাংলাদেশসহ ১৮৫টি দেশ ও অঞ্চলের ওপর নতুন করে শুল্কারোপ করেছে। বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কের হার বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ ধার্য করা হয়েছে। ন্যূনতম ১০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ট্যারিফের কবলে পড়েছে এসব দেশ। যা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের ওপর বেশি শুল্কারোপ মূলত দায়িত্বশীলদের তৎপরতার অভাবে হয়েছে। প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা এবং ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে নেগোসিয়েশন করায় বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তান ও ভারতের শুল্ক কমানো হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠনগুলোর মার্কিনি আমদানিকারকদের সঙ্গে দ্রুত নেগোসিয়েশন শুরু করা জরুরি।
বাংলাদেশের আবহাওয়ার যেন কোনো পরিবর্তন নেই। ৫ আগস্টের পরিবর্তনের ঢেউ আছড়ে পড়লেও তা প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উপর প্রভাব ফেলতে পারেনি। দিল্লির পাপেট শেখ হাসিনার শাসনামলে দেখা গেছেÑ মন্ত্রী-এমপি, আমলা-কামলা, পাইক-পেয়াদা-চাপরাশি সবাই মনে করতেন, শেখ হাসিনাই সব কিছু করবেন, সব সামাল দেবেন। এখন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, আমলা, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সেক্টরে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সবাই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপর নির্ভরশীল। নিজেরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ‘চেয়ার’ আঁকড়ে রেখেছেন অথচ তাদের ভাবখানা এমনÑ সব কিছুই করবেন ড. ইউনূস। আমেরিকা, চীন, ভারতসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন, দরাদরিÑ সবকিছু ড. ইউনূসই সামাল দেবেন। তারা চেয়ারে বসে শুধুই গলাবাজি আর উপভোগ করবেন। শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা আরো এক ধাপ এগিয়ে। তারা কারণে-অকারণে সরকারের কাছে প্রণোদনা, ব্যাংকঋণ, ঋণের সুদ কমানো এবং সুযোগ-সুবিধার দাবি করেন; ব্যবসায়ী সংগঠন হিসেবে বিদেশে নতুন নতুন বাজারের সন্ধান এবং বাংলাদেশি পণ্যের বড় আমদানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে দেশের স্বার্থে আলোচনার কোনো উদ্যোগ নেন না।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সঙ্কট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে দ্রুত কূটনৈতিকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জিএসপি সুবিধা পুনর্বহালের চেষ্টা চালাতে হবে। পাশাপাশি, রফতানি বাজারের বৈচিত্র্য আনতে নতুন বাজার অনুসন্ধান, উৎপাদন খরচ কমানো এবং পণ্যের মানোন্নয়নের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের কারণে পণ্যের দাম বাড়বে। যার কারণে চাহিদা কমে যাবে। ফলে পণ্য রফতানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মার্কিন শুল্কারোপÑ এটি অপ্রত্যাশিত ছিল না। তবে তাদের বাড়ানোর মাত্রাটা আশ্চর্যান্বিত করেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করা যেতে পারে। তাদের জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে যে, কি বিবেচনা বা হিসেবে এই শুল্কারোপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলা রফতানিতে বাংলাদেশের কোনো শুল্ক নেই। বাংলাদেশ স্ক্র্যাপ আমদানি করে আমেরিকা থেকে। সেখানে শূন্য শুল্ক। পেট্রোলিয়াম গ্যাস আমদানিতে ৩১ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। এই হচ্ছে প্রধান প্রধান আমদানি। তাহলে আমেরিকা কেন ৭৪ শতাংশের কথা বলছে, সেটি জানতে চাওয়া দরকার। এসব নিয়ে দরকষাকষি করতে হবে। তাদের বলতে হবেÑ তোমাদের কাছ থেকে তুলা এনে আমরা পণ্য তৈরি করে তোমাদের দেশে রফতানি করছি, এখানে আমাকে ছাড় দিতে হবে। ট্রাম্প প্রশাসনও বলেছে, যারা তাদের পণ্য ব্যবহার করে রফতানি করবে, তাদের বিশেষ সুবিধা দেয়া হবে।

মূলত বিভিন্ন সেক্টরে দায়িত্বশীলদের অদক্ষতা, অযোগ্যতা ও অদূরদর্শিতার কারণে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশি পণ্য প্রবেশে বেশি শুল্ক আরোপ করেছে মার্কিন প্রশাসন। হোয়াইট হাউজের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সরকার দাবি করেছেÑ বাংলাদেশ কার্যকরভাবে আমেরিকান পণ্যের ওপর ৭৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। এরই বিপরীতে এখন থেকে বাংলাদেশের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। প্রধান উপদেষ্টার ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেছেন, বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের শুল্ক পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের শুল্ক পর্যালোচনা করছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দ্রুত শুল্ক যৌক্তিকীকরণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। প্রশ্ন হচ্ছেÑ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ কী পরিমাণ পণ্য আমদানি করে? ওই মার্কিন পণ্যে কতটুকু শুল্ক পায় বাংলাদেশ? এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের শুল্ক পর্যালোচনায় এনবিআরকে দেয়া হচ্ছে; এ উদ্যোগ আগে নেয়া হয়নি কেন?

অর্থনীতিবিদদের মতে, মার্কিন শুল্ক বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের রফতানি আয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম বৃহৎ বাজার হওয়ায়, নতুন শুল্কের কারণে পোশাক খাতের রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে। শুল্ক বৃদ্ধির ফলে রফতানি খরচ বেড়ে যাবে, যা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যকে তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল করে তুলবে। ফলে ক্রেতারা কম দামে অন্য দেশ থেকে পোশাক আমদানির দিকে ঝুঁকতে পারে। প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা। ভিয়েতনাম, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভারতসহ অন্যান্য রফতানিকারক দেশের তুলনায় বাংলাদেশি পণ্যের দাম বেড়ে যাবে, যা ক্রেতাদের বিকল্প উৎস খুঁজতে উৎসাহিত করবে। উচ্চ শুল্কের ফলে মার্কিন আমদানিকারকদের জন্য বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি করা কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে, যার ফলে রফতানি আয় হ্রাস পেতে পারে। তৈরি পোশাক শিল্পে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে, যা শিল্পের সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। রফতানি কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমবে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ২০১৩ সালে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিল করেছিল। শ্রমিক নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের শর্ত না মানার অভিযোগের ভিত্তিতে জিএসপি বাতিল করা হয়। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জিএসপি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি জিএসপি সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করাই ভালো কৌশল হতে পারে। সে ক্ষেত্রে শ্রমিক নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ এবং শ্রম আইনের উন্নয়ন ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আস্থা অর্জন করাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উচিত মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা এবং জিএসপি সুবিধা পুনরুদ্ধারের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। পাশাপাশি, রফতানি বাজারের বৈচিত্র্যকরণ এবং প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা বৃদ্ধির জন্য অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খরচ হ্রাস ও পণ্যের গুণগত মান উন্নত করার দিকে মনোযোগ দেয়া জরুরি।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন অন্যান্য দেশের ওপর শুল্কারোপ করছিল, তখন ভেবেছিলাম বাংলাদেশ শুল্কের বাইরে থাকলে রফতানি খাতে বড় সুবিধা নিতে পারবে। কিন্তু এখন বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্কারোপ করায় এই সুবিধা আর কাজে লাগানো গেল না। চীন, ভারত, পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের ওপর বেশি শুল্কারোপ মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্কনীতি। চীন, ভারত, পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য রফতানিতে বেশি শুল্ক দিতে হয়। সে হিসাবে ৫০ শতাংশ পাল্টা শুল্কারোপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। এতে করে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান নাজুক হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র পণ্য রফতানিতে ৭৪ শতাংশ শুল্ক দেয়। যেহেতু বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বড় আকারে আমদানি করে না; তাই চাইলেই এ শুল্ক কমিয়ে আরোপিত শুল্ক সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারে। এক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম বড় বাজার। প্রতি বছর দেশটিতে প্রায় ৮৪০ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি হয়, যা মোট রফতানির বড় অংশ। যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়েছে, যা দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য উদ্বেগজনক সঙ্কেত। নতুন শুল্ক হার অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ করা হয়েছে। এ কারণে মার্কিন ক্রেতাদের জন্য বাংলাদেশি পোশাকের দাম বাড়বে এবং দেশটির বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠবে। অর্থনীতিবিদ ও রফতানি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্যের ওপর নতুন শুল্কারোপের ফলে রফতানি আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, যা বাংলাদেশের রফতানির মূল অংশ, এই শুল্ক বৃদ্ধির কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নতুন শুল্কের ফলে মার্কিন ক্রেতাদের জন্য বাংলাদেশি পোশাকের দাম বাড়বে, যা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। এতে করে ক্রেতারা বিকল্প সরবরাহকারীদের দিকে ঝুঁকতে পারেন, ফলে রফতানি আদেশ হ্রাস পেতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, শুল্কারোপের ফলে মার্কিন বাজারে রফতানি কমতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপরে যেসব কারণে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে, সেগুলো দূর করে এ শুল্ক কমিয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে পারলে নেতিবাচক প্রভাব থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি বাংলাদেশের রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবেÑ এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই প্রভাব পড়বে আমেরিকার অর্থনীতিতে চাহিদা কমার কারণে। ধারণা করা হচ্ছে, এই ট্যারিফ (শুল্ক) আরোপ করায় আমেরিকার অর্থনীতিতে মন্দা আসবে। সব কিছুর দাম বাড়বে। এতে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমতে পারে। ফলে বাংলাদেশ থেকে রফতানি কমার আশঙ্কা রয়েছে। তবে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান খুব বেশি পরিবর্তন হবে না। কারণ অন্যান্য দেশের ওপরও যুক্তরাষ্ট্র বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে, এমনকি কিছু দেশের ক্ষেত্রে তা বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। ফলে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ অন্য দেশগুলোও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে, বাড়তি সুবিধা পাবে না।

দক্ষিণ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর সেলিম রায়হান বলেন, বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত গ্যাট ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মৌলিক নীতিগুলোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। ‘সর্বাধিক অনুকূল দেশ’ নীতি যেভাবে বিভিন্ন দেশের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করত, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট দেশ ও পণ্যের ওপর পৃথক শুল্ক হার নির্ধারণ করছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরো অনিশ্চিত করে তুলবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করেছেন, যাকে ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে অনেক দেশ। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ করা হয়েছে। এত দিন দেশটিতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে ১৫ শতাংশ করে শুল্ক ছিল। বাংলাদেশের প্রধান দুই রফতানি বাজারের একটি যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাকের একটি বড় অংশ রফতানি হয় দেশটিতে। যুক্তরাষ্ট্রে বছরে বাংলাদেশের রফতানি হয় প্রায় ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন (৮৪০ কোটি) ডলার, যা প্রধানত তৈরি পোশাক। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রফতানি দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন (৭৩৪ কোটি) ডলারে। নতুন করে উচ্চমাত্রায় এই শুল্ক আরোপে বাংলাদেশের রফতানি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অর্থনীতি বিভাগের সাবেক প্রফেসর ড. এম এম আকাশ বলেন, মার্কিন শুল্কারোপের চাপ কমাতে বাংলাদেশের রফতানিকে বহুমুখীকরণ করতে হবে। বহু দেশে বহুরকম পণ্য আমদানি করে এটা আমাদের সামলাতে হবে। আমাদের স্ট্র্যাটেজিক ট্রেড (কৌশলগত বাণিজ্য) করতে হবে। আমরা আগে ফ্রি ট্রেডের কথা বলতাম, আরো আগে প্রটেকশনিস্ট ট্রেডের (রক্ষণশীল বাণিজ্য) কথা বলতাম। এখন দুটো কৌশলই অকেজো হয়ে যাবে। আমাদের কৌশলগত বাণিজ্যের দিকে এগোতে হবে। কোথাও আমাদের রক্ষণশীল হতে হবে, কোথাও ফ্রি ট্রেড করতে হবে, কোথাও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে হবে, কোথাও ভারতের সঙ্গে বাড়াতে হবে। কোথাও ভিয়েতনামের বাজার আমরা দখল করে নেবো, কোথাও ভিয়েতনাম আমাদের বাজার দখল করে নেবো। আমেরিকান কোনো কোনো পণ্যের ওপর আমরাও শুল্ক বসিয়ে দেবো। নানা রকম কৌশল নিয়ে চলতে হবে।

মূলত মার্কিনিরা যাকে শত্রুরাষ্ট্র মনে করে সেই চীনের ওপর ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের ওপর সেটি ৩৭ শতাংশ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পোশাক শিল্পের মালিক এজেএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের ব্যর্থতা এবং ‘ড. ইউনূস সবকিছু সামলাবেন’ এ মানসিকতার কারণে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্কারোপ অস্বাভাবিক হারে করা হয়েছে। এ ছাড়াও ট্রাম্পের এই শুল্কা আরোপে ভারতের পণ্যের ওপর ২৬ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। পাকিস্তানের পণ্যের ওপর ২৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ, ভিয়েতনামের পণ্যের ওপর ৪৬ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার পণ্যে ৪৪ শতাংশ, তাইওয়ানের পণ্যে ৩২ শতাংশ, জাপানের পণ্যে ২৪ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যে ২৫ শতাংশ, থাইল্যান্ডের পণ্যে ৩৬ শতাংশ, সুইজারল্যান্ডের পণ্যে ৩১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার পণ্যে ৩২ শতাংশ, মালয়েশিয়ার পণ্যে ২৪ শতাংশ, কম্বোডিয়ার পণ্যে ৪৯ শতাংশ, যুক্তরাজ্যের পণ্যে ১০ শতাংশ, দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্যে ৩০ শতাংশ, ব্রাজিলের পণ্যে ১০ শতাংশ, সিঙ্গাপুরের পণ্যে ১০ শতাংশ, ইসরাইলের পণ্যে ১৭ শতাংশ, ফিলিপাইনের পণ্যে ১৭ শতাংশ, চিলির পণ্যে ১০ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ার পণ্যে ১০ শতাংশ, তুরস্কের পণ্যে ১০ শতাংশ, কলম্বিয়ার পণ্যে ১০ শতাংশ, মিয়ানমারের পণ্যে ৪৪ শতাংশ, লাওসের পণ্যে ৪৮ শতাংশ এবং মাদাগাস্কারের পণ্যের ওপর ৪৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকদের সাথে ব্যবসায়ীদের আলোচনা করা দরকার। পণ্যের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা করতে হবে। তারা যাতে এমনভাবে মূল্য নির্ধারণ করে, যাতে ট্যারিফটি সমন্বয় করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ যাতে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বাঁধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও আলাপ করতে হবে। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলোচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের পদক্ষেপ নজরে রেখে কৌশল নির্ধারণে একটি পর্যবেক্ষণ সেলও খুলতে হবে। নির্দিষ্ট কোনো দেশকে উদ্দেশ্য করে যুক্তরাষ্ট্র এই শুল্ক আরোপ করেনি। দেশটির সঙ্গে যেই দেশগুলোর বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, সেসব দেশের ওপরেই এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশ দেশটিতে সাড়ে আট বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি এবং দেড় বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। সুতরাং এখানে প্রায় সাত বিলিয়ন ডলারের মতো বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ফলে নতুন শুল্ক আরোপের মধ্যে বাংলাদেশ পড়তে পারে এমন ধারণা আগে থেকেই ছিল।