
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করায় বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। এতদিন বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ। পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের একক বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র এবং দীর্ঘদিন ধরে দেশটির বাজারে তৃতীয় পোশাক রপ্তানিকারক। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, বৈশ্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
স্থানীয় সময় বুধবার বিকাল ৪টায় হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নতুন করে শুল্ক আরোপে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৮৪০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে, যার ৯০ শতাংশই তৈরি পোশাক। এ ছাড়াও জুতা, টেক্সটাইলসামগ্রী ও কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়। বাংলাদেশ থেকে ২০২৪ সালে ৮৩৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে দেশটিতে। এর মধ্যে ৭৩৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক, যা আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া প্রতি বর্গমিটার পোশাকের দাম ছিল ৩ দশমিক ১০ ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হয়েছে ২২১ কোটি ডলারের পণ্য। তুলা ছাড়াও অন্যান্য কৃষিপণ্যের মধ্যে রয়েছে খাদ্যশস্য, বীজ, সয়াবিন, গম এবং ভুট্টা, যন্ত্রপাতি এবং লোহা ও ইস্পাত পণ্য। দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি ৬১৫ কোটি ডলার।
রপ্তানিকারক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন করে শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের দাম বাড়বে। চাহিদা কমবে। রপ্তানির ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। চীনের মতো পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ না করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের দিকে যাওয়া উচিত। সমাধান না হলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে বলেও মনে করে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৃতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক এবং রপ্তানি থেকে আয় ৭৩৪ কোটি ডলার। ১৬৫১ কোটি ডলার রপ্তানি করে চীন প্রথম এবং ১৪৯৮ কোটি ডলার রপ্তানি করে ভিয়েতনাম দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘নতুন এ শুল্ক নীতি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের (আরএমজি) চাহিদা কমে যাবে। আমাদের বিক্রিও কমে যাবে। যার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের ওপর। আরেকটা প্রভাব পড়বে সেটা হলো; ক্রেতারা এখন আমাদের বলবে শুল্ক বাড়ার ফলে দাম অনেক বেড়ে গেছে। আমদানি করে পণ্য বিক্রি করতে পারছি না, পারব না। সুতরাং দাম কমাও। তখন আমাদের চাপ দিয়ে দাম কমাবে। একদিকে ব্যবহার কমে যাবে, অন্যদিকে দাম কম পাব।’
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ অপ্রত্যাশিত ছিল না কিন্তু মাত্রাটা আমাদের কিছুটা আর্শ্চয করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হিসাব করে প্রযোজ্য অতিরিক্ত শুল্ক ৩৭ শতাংশ আরোপ করেছে। এটা যোগ হবে মার্কিন বাজারে আমাদের চলমান গড় ১৫ শতাংশের সঙ্গে। সবকিছু মিলে ৫০ থেকে ৫২ শতাংশ শুল্ক বসবে বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর। যেকোনো বিচারেই এটা বড় মাত্রার আমদানি শুল্ক। ফলে মার্কিন ভোক্তারা বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা কমিয়ে দেবে। যদিও আমাদের রপ্তানির ৯০ শতাংশই তৈরি পোশাক। যেমন ১০ ডলারের একটি টিশার্টে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলে দাম হত ১১ দশমিক ৫০ ডলার। এখন অতিরিক্ত ৩৭ শতাংশ শুল্ক বসালে ওটার দাম হবে ১৫ ডলার। এতে চাহিদার একটা সংকোচন হবে। বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ট্রাম্প কিন্তু বলেছেন, যেসব পণ্যে মার্কিন উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে তারা শৈথিল্য দেখাবে। এটার বাইরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পেট্রোলিয়াম গ্যাস আমদানিতে ৩১ শতাংশ শুল্ক আছে। দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানি পণ্য আয়রন স্ক্র্যাপের ওপর শুল্ক নাই। কারণ ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করেছে আর আমদানি করেছে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের একটি রপ্তানি উদ্বৃত্ত আছে। এটার মাশুল দিতে হবে আমাদেরকে। সেটার কতখানি যৌক্তিকতা আছে এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করা দরকার।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরবর্তী সময়ে আমরা টিকফায় এগুলো তুলতে পারি অথবা তাদের অনুরোধ করতে পারি। অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ আমাদের মনে করিয়ে দিল প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রপ্তানিকারকদের ব্যবসার খরচ কমাতে হবে। সংস্কারগুলো করে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাজার বহুমুখীকরণে নজর দেওয়া, বিশেষ করে আঞ্চলিক বাজারের দিকে। সর্বোপরি দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নজর এবং হোমওয়ার্ক চালিয়ে যেতে হবে।’ বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘নতুন ট্যারিফ ঘোষণার ফলে বিশ্বব্যাপী সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব পড়বে। প্রতিযোগী দেশগুলোর প্রত্যেকেরই খরচ বেড়ে যাবে। এতে আমরা সবাই অবশ্যই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হব। যে ধারণা থেকে এটা করা হচ্ছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিল্প পুনরুদ্ধার করা হবে। আমার মনে হয় না, এটা সহসা হবে। কারণ একটা শিল্প ডেভেলপ করা রাতারাতি সম্ভব নয়। এর পেছনে শ্রমের খরচসহ অনেক ফ্যাক্টর আছে। ফলে দেশটির মানুষের খরচ বেড়ে যাবে। এই খরচ যদি বেড়ে যায়, তাহলে তাদের মূল্যস্ফীতি বাড়বে। এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো কিছু হবে না। সমগ্র বিশ্ব একটা ধূম্রজালের মাঝে পড়বে।’