Image description

Zulkarnain Saer ( জুলকারনাইন সায়ের)


 
চলমান বিভিন্ন ঘটনার আলোকে সেনাবাহিনীর লেঃকর্নেল পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা এই লিখাটি পাঠিয়েছেন,কোনরকম সংশোধন/পরিবর্তন ছাড়াই প্রকাশ করা হলো।
 
"সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি বাস্তবতা
 
আমি আর আমার দল দিনরাত খেটে যাচ্ছি, এই ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে রাস্তায় শান্তি বজায় রাখার জন্য। দুষ্কৃতীদের ধরছি, ঝগড়া থামাচ্ছি, পুলিশ যখন পারছে না, তখন আমরা সবকিছু ধরে রাখার চেষ্টা করছি। ঈদ এর আগে একটা ভিডিও দেখলাম আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ এ - কত দিন যে এইভাবে ইফতার মাঝ পথে রেখে ছুটেছি সেটা নাই বা বললাম। আমাদের প্রতিটা সেনাসদস্যর কাছে এটা একটা প্রাকটিক্যাল স্মৃতি। কিন্তু সত্যি বলতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় যে নেগেটিভ কথাবার্তা চলছে, তা দেখে আমার হৃদয় ভেঙে যায় । আমরা তো সাধ্যমতো চেষ্টা করছি, কিন্তু আমরা একা এটা ঠিক করতে পারি না।
 
সেনাবাহিনীর কাজের পরিধি খালি এরেস্ট করাতেই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ সেই বহুল আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেসি আমাদের সুপারম্যান বানিয়ে দেয় নাই। আসুন দেখি এর পরের ধাপ গুলি কি কি এবং এই ধাপ সমূহের নায়করা কারা। সবার প্রথমে আসে কেস দেয়া ও বিচার করা।
কেস কে দেয়? পুলিশ। মামলার ধারা কে দেয়? পুলিশ। এরেস্ট করে থানায় দেবার পর থেকে পুলিশের উপর সব। মামলা দেয়ার সাথে সাথে কোন ধারায় মামলা দেয় হবে সেটা পলিশ ঠিক করে। চাঁদাবাজি করে ধরা খেলেও অনেক সময় ১৫১ ধারায় চালান দেয়। ১৫১ হলো খুব হালকা একটা মামলা। সাথে সাথে জামিন পেয়ে পুনরায় একই কাজে লিপ্ত হয় এরা। কেন পুলিশ মামলা হালকা করে দেয় সেটা আমরা সবাই গেস করতে পারি।
একদিকে পুলিশের বড়কর্তাদের দেখেন —আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার—এরা অবসরপ্রাপ্ত লোক; খোদা বক্স, যিনি আগে পুলিশের বড় কর্তা ছিলেন আর এখন অন্তর্বর্তী সরকারে আছেন, তিনি এদের ফিরিয়ে এনেছেন। তারা জানে নির্বাচন হলেই তাদের ছুটি, তাই এরা কেন গণ্ডগোল ঠিক করতে যাবে? আইজিপির তো আবার দাদা মশাইয়ের সাথে ভালো দোস্তি— যে সবসময় অনলাইনে সেনাবাহিনীকে গালি দেয়, বলে আমরা পুলিশের কাজ চুরি করছি। আমি এখানে জীবন বাজি রেখে কাজ করছি, আর সে আমাদের বিরুদ্ধে বিষ ছড়াচ্ছে। আইন শৃংখলার মূল দায়িত্ব পুলিশের - কিন্তু ওই বিশিষ্ট চিন্তক সাহেবের কথা শুনলে মনে হবে সেটা সেনাবাহিনীর। পুলিশকে ঠিক করার বদলে, এই অবসরপ্রাপ্ত লোক দিয়ে অকার্যকর বানিয়ে রেখেছে আবার এদের পদোন্নতিও দেয়া হচ্ছে যা অবিশ্বাস্য। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ, যাদের সাথে আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করি, তারা পুলিশ এর লিডারশিপ নিয়ে অত্যন্ত হতাশ, কারা নিজ স্বার্থে এসব করছে তাও তদন্তের দাবি রাখে। এহেন নানা কারণে, পুলিশ সদস্যদের মনোবল শূণ্যের কোঠায়। তাই পুলিশের তদন্ত করা, মামলার কাগজ তৈরি করার কথা থাকলেও বেশিরভাগ সময় শুধু অজুহাত দেখায়। দোষ মাঠের পুলিশদের না। তারা জানে তাদের লিডারশিপ তাদের শোল্ডার করবে না।
তারপর আদালত। আমরা দুষ্কৃতীদের ধরে আনি, কিন্তু কী হয়? পুলিশের কাগজপত্র এত খারাপ—প্রমাণ নেই, বিস্তারিত নেই—বিচারকরা তাদের ছেড়ে দেন। আমি বুঝি, তাদের হাত বাঁধা, কিন্তু এটা কষ্ট দেয়। আদালত আরও কড়া হতে পারে—পুলিশের কাছে ভালো কাজ চাইতে পারে, জরুরি মামলাগুলো তাড়াতাড়ি সারতে পারে, জামিন কঠিন করতে পারে যাতে এই অপরাধীরা আবার না ছাড়া পায়। আমরা পুলিশ না, বিচারক না—আমরা সৈনিক, আর আমরা টানা কাজে হয়রান না হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার বয়ানে হয়রান হয়ে গেছি। সেনাবাহিনীর ফেসবুক পেজে গত ১ মাসের এরেস্ট এর মধ্যে কত জন এখনও ভেতরে আছে সেটা খুঁজে দেখার জন্য সাংবাদিক ভাইদের অনুরোধ করছি।
পুলিশকে সাহস দিতে হবে, তাদের লিডারশিপকে নিজের স্বার্থ ছেড়ে অধীনস্তের কাছে নামতে হবে। আদালতকে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে সত্যিকারের ন্যায়বিচার দিতে হবে। আমরা সব দিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু তাদের ছাড়া এই আইন শৃংখলা রক্ষা সম্ভব নয়। একচোখা রাক্ষসের মতো সেনাবাহিনীকে দোষ দিয়ে লাভ হবে না।
আমি দেশের জন্য গর্ব করে কাজ করি, কিন্তু আমার সঙ্গীদের ও উর্ধ্বতনের উপরে দোষ চাপানো দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। আমার সেনাপ্রধানের উপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে। আমরা উনাকে সজ্জন হিসাবে জানি ও মানি। আমার মতো চাকুরীরত আমার বন্ধু ও কাছাকাছি সিনিয়র/ জুনিয়রদের ও একই অভিমত। সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত ও বিভিন্ন কারণে চাকুরিচ্যুত কিছু সদস্য ও ফেসবুকে ঝড় দেখে বিভ্রান্ত হবেন না।"