
দিপু রায়। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন ৪৩তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারে। তবে প্রথম গেজেটে নাম থাকলেও বাদ পড়েছেন দ্বিতীয় গেজেট থেকে। ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার এক নিম্নবিত্ত পরিবারের মেজো সন্তান দীপু রায়। কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবার (ভর্তির সুযোগ পেয়েও দারিদ্র্যের কষাঘাতে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারেননি। পরের বছর আবার ভর্তি পরীক্ষা দেন তিনি। এবারও সুযোগ মেলে ঢাবিতে পড়ার। শুরু হয় এক নতুন লড়াই।
প্রান্তিক পর্যায়ের এক নিম্নবিত্ত পরিবার সন্তান আমি। দাদুর মৃত্যুর পর বাবার খামখেয়ালিপনায় সংসারের অবস্থা আরো বেগতিক হয়ে পড়ে। তখন ক্লাস ফাইভে পড়া আমার বড় ভাই বাধ্য হয়ে সংসারের হাল ধরেন। এতটুকুন বয়সে সংসারের চাপে পিষ্ট হয়ে যাওয়া এক নাবালক সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যখন কুলিয়ে উঠতে পারছিল না, তখন একদিন আলোচনা হল বাড়তি আয় রোজগার ছাড়া টিকে থাকা সম্ভব না। মধ্যবিত্তের দেয়াল ডিঙিয়ে দিনমজুর শ্রেণীর খাতায় প্রথম যে নামটা প্রস্তাবে উঠে এলো সেই নামটা আমার ছিল। ক্লাস ফোরে পড়ি তখন। শোনার পর সারারাত কান্না করলাম। এই একদিনের কান্নার দাম আমার পুরো পরিবার দিয়ে গেছে পরবর্তী সময়ে।'
জীবন সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরে দিপু আরও বলেন, ‘এক সময় অভাব আর কোলাহলের মধ্যে থেকে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ২০০৭ সালে ক্লাস নাইনে থাকতে বাড়ি ছেড়ে এক মামার বাসায় আশ্রয় নিলাম। সেখানেও অস্বচ্ছলতার ছাপ স্পষ্ট। সেখান থেকে মামার শ্বশুর বাড়িতে আশ্রয় নিই। অভাব থাকলেও কোলাহল ছিল না।মিলেমিশে টিকে থাকার সংগ্রামে নেমে পড়লাম। তাদের সাথে তাদের কাজে হাত বাড়ালাম। কাজ আর পড়ার আনন্দ দুটোই এগিয়ে যাচ্ছিল। আমার কোন ক্লান্তি আসছিল না। তারপর কলেজে ভর্তি হয়ে পড়ালেখায় সময় দিতে মেসে উঠে আরেকবার যেন অন্ধকার দেখলাম। খরচ পাবো কোথায়? বাড়িতে তখন মা অন্যের জমিতে দিনমজুরি দেওয়া শুরু করেছে। এ নিয়েও পরিবারে অশান্তি। জাতি কূলে অন্যদের মুখ দেখানো দায় হয়ে গেছে।’
‘সকাল ৬টা থেকে ৭.৩০ পর্যন্ত একটা টিউশনি পড়িয়ে ৮-১০টা পর্যন্ত নিজে দুইটা প্রাইভেট পড়তাম। এরপর খেয়ে-না খেয়ে কলেজের ক্লাস করতাম। মেসে গিয়ে খেয়ে সন্ধ্যা ৬ থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত আরো তিনটা টিউশনি পড়িয়ে যখন ফিরতাম। দুই মাস অন্তর অন্তর লো প্রেসারে পড়ে থাকতাম। এই অবস্থা দেখে এক টিউশনি থেকে অফার দিল লজিং থাকার। সেই সুযোগ কাজে লাগালাম। ঘর মোছা থেকে হাড়ি পাতিল পরিষ্কার করা, বাজার করা কোন কাজই বাদ রাখিনি সেখানে। ওরা জোর করত এমন না। আমি জেনে গিয়েছিলাম, আমাকে এভাবেই টিকে থাকতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সকাল ৬ টা থেকে ৭.৩০ পর্যন্ত একটা টিউশনি পড়িয়ে ৮-১০ টা পর্যন্ত নিজে দুইটা প্রাইভেট পড়তাম। এরপর কখনো খেয়ে কখনো না খেয়ে কলেজের ক্লাস করতাম। মেসে গিয়ে খেয়ে সন্ধ্যা ৬ থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত আরো তিনটা টিউশনি পড়িয়ে যখন ফিরতাম, তখন মাঝে মাঝে মনে হতো আমি হয়তো আর পারবো না। আমি সে রাতের কান্নার স্মৃতি মনে করতাম আর ভাবতাম আমাকে পড়তে হবে। দুই মাস অন্তর অন্তর লো প্রেসারে পড়ে থাকতাম। আমার এই অবস্থা দেখে এক টিউশনি থেকে অফার দিল লজিং থাকার। এই সুযোগ না পেলে হয়তো হাল ছেড়েই দিতাম তখন। সেই সুযোগ কাজে লাগালাম। এমনও দিন গেছে একটানা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পড়ার টেবিলে বসে আছি। ঘর মোছা থেকে হাড়ি পাতিল পরিষ্কার করা, বাজার করা কোন কাজই বাদ রাখি নি সেখানে। ওরা জোর করত এমন না। আমি জেনে গেছি আমাকে এভাবেই টিকে থাকতে হবে।’
ঢাবিতে পড়ার অভিজ্ঞতা জানিয়ে দীপু বলেন, ‘২০১১ সালের অক্টোবরে প্রথম ঢাকায় আসলাম ভর্তি পরীক্ষা দিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটাতেই ভর্তির সুযোগ পাই। ঢাকায় কেউ নেই, কোথায় উঠবো জানি না। হলে কীভাবে উঠতে হয় সেটাও জানা ছিল না। ভেবেছিলাম টিউশনির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এখানেও টিকে থাকার চেষ্টা করব। পরিচিত কেউ না থাকায় প্রথম দফায় টিকতে পারলাম না। সব ছেড়ে বাড়ি চলে গেলাম। আমার পড়ার স্বপ্ন পূরণের এত কাছে এসেও দূরে সরে গেলাম অভাবের কারনে। পরের বার আবার ভর্তি পরিক্ষা দিয়ে অন্য ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হলাম। এবার হলে উঠার চেষ্টা করলাম। প্রথমেই জানলাম ফার্স্ট ইয়ারে লিগ্যালি হলে উঠার নিয়ম নেই। আগের ডিপার্টমেন্টের এক ফ্রেন্ড হলে থাকার সুবাধে জানলাম বড় ভাইয়েরা একটা সিটের ব্যবস্থা করে দিতে পারবে। সেই ব্যবস্থার সাথে আমি পরিচিত ছিলাম না আগে। কোথাও থাকার জায়গা না পেয়ে উঠে গেলাম। তার বিনিময়ে ক্লাস বাদ দিয়েও প্রোগ্রামে যাওয়া লাগত প্রায়ই। কখনো না গেলে কৈফিয়ত দিতে হত। কখনো ফাঁকি দিয়ে ক্লাসে চলে যেতাম। শাস্তি হিসেবে মাঝে মাঝে বাইরেই রাত কাটাতে হতো। হলে থাকার তাগিদে মেনেও নিতাম।’
রাজনীতিতে জড়িত থাকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘শুধু হলে থাকার বিনিময়ে কিছু প্রোগ্রামে যেতাম। কখনো কোন আন্দোলনের পক্ষে বিপক্ষে গিয়ে হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়াইনি। নির্বাচনের আগে সব হলের কমিটিগুলো বড় হয়। এর কারণ হয়তো আছে, কিন্তু জানার ইচ্ছা ছিল না। ২০১৮ নির্বাচনের আগের বছর ২০১৭ সালের কমিটিতে একটা পদে আমার নামও দিয়ে দেয়। সেই নাম কখনো কোন কাজে লাগেনি আমার। কখনো কোন কাজে লাগবে তাও জানা ছিল না। এখনো বাড়িতে কেউ জানে না যে যাদের আর কোথাও থাকার জায়গা নেই তাদের হলে থাকতে গেলে পলিটিক্স করতে হয়। আমি কখনো এই পরিচয় দিতেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করিনি।’
‘শুধু হলে থাকার বিনিময়ে কিছু প্রোগ্রামে যেতাম। কখনো কোন আন্দোলনের পক্ষে-বিপক্ষে গিয়ে হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়াইনি। ২০১৮ নির্বাচনের আগের বছর ২০১৭ সালের কমিটিতে একটা পদে আমার নামও দিয়ে দেয়। সেই নাম কখনো কোন কাজে লাগেনি আমার। কখনো কোন কাজে লাগবে তাও জানা ছিল না। আমি কখনো এই পরিচয় দিতেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করিনি।’
বিসিএসের সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরে দীপু বলেন, ‘২০১৮ সালের শেষের দিকে হল ছেড়ে দিয়ে ঢাকার অলিতেগলিতে ঘুরতে থাকলাম। খরচের সংকুলান করতে গিয়ে কখনো একবেলা কখনো দুইবেলা খাবার খেতে হয়েছে। হেঁটে-হেঁটে কলাবাগান থেকে নিকেতনে টিউশনি গেছি। আসার পথে কখনো ক্ষুধায় ক্লান্তি নিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে খুজতাম কোথাও দুইটা বিস্কুট কিনে খাওয়ার মতো দশ টাকা পরে আছে কিনা। কলাবাগান থেকে ভোরে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স লাইব্রেরিতে হেঁটে যেতাম একটা সিট ধরে সারাদিন পড়ার জন্য। বান্ধবীর টাকায় কোচিংয়ে ভর্তি হলাম। বন্ধুর টাকায় বই কিনলাম। দুপুরের খাবার ওরাই দিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর মাঝেই করোনা এলো। একটা বছর বাড়িতে চাকরির পড়াশোনার এনালাইসিস করে পড়ে কাটিয়ে দিলাম। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে একটা ব্যাংক ভাইভার জন্য ঢাকায় গেলাম। একটা মেসে উঠলাম। এবার ঢাকায় থাকার টাকার যোগান দিল কলেজের এক বান্ধবী। ডিপার্টমেন্টের স্যারদের ধরে একটা প্রজেক্টে যোগ দিলাম। বাবার চোখে ছানি বাড়ছিল। জীবনে বাবার অনেক আবদারই অপূর্ণ থেকে গেছে। প্রজেক্টের প্রথম মাসের বেতন পেয়ে সাহস করে বাবার চোখের ছানির অপারেশন করালাম। বাড়িতে তখন সবাই দিনমজুরি দিয়ে যাচ্ছে। ছোট ভাইটা ঢাকায় রাজমিস্ত্রীর কাজ নিল। আমাকে সাহস দিয়ে বলল বাড়িতে এখন সে দেখাশোনা করবে। ছয় মাসের প্রজেক্ট শেষে আমি সব ছেড়ে এবার শুধু পড়াশোনায় মনযোগ দিলাম। ৪৩তম বিসিএসের প্রিলি, রিটেন উভয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলাম।’
এরপরই দিপুর জীবনে নেমে আসে এক কঠিন বিপর্যয়। সেই চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘২০২৩ সালে আগস্টের দিকে হঠাৎ করে টের পেলাম আমার চোখ কালো কালির চাঁদরে ঢেকে যাচ্ছে। ডাক্তার জানাল চোখের পর্দা ছিড়ে গেছে। কিছুদিন পরেই ৪৩তম বিসিএসের ভাইভা। বাড়িতে বাবা তখন খুব অসুস্থ। বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার টাকা নেই। এদিকে আমার চোখের পর্দা ছিড়ে গেল। ডাক্তার বলল অতিরিক্ত মানসিক চাপ, চোখের উপরে চাপ, ঘুমের ঘাটতি আর আগে থেকে চোখের সমস্যার কারণে পর্দা ছিড়ে গেছে। দিশেহারা হয়ে গেলাম। বাড়িতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও উপায় না পেয়ে বলতে হল। অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে সবাই। বিনা টাকায় দুই রোগীর চিকিৎসা সম্ভব এমনিতেও ছিল না। সব চাষের জমি বন্ধকি দেওয়া। সেখান থেকে এক খন্ড জমি বিক্রি করে আমার চোখের চিকিৎসা করানো হলো। বাবার অবস্থা বেগতিক হতে হতে এক সময় অভাবের লেশ ঢাকতে বাবা নিজের চিকিৎসা বন্ধ করে দিল। জোর করার মত সামর্থ্য আমাদের ছিল না। আবেদন করে ভাইবা পিছিয়ে নিলাম। অপারেশন করা চোখ নিয়ে কিছুই পড়তে পারলাম না। শুধু দিনরাত ইউটিউবে বিষয় ভিত্তিক পড়াশোনা-আলোচনা শুনতে থাকলাম। দেশে-বিশ্বে কী হচ্ছে সব কানের মধ্যে দিয়ে মনে মনে গেথে যাচ্ছি আর বাড়িতে বাবার বিনা চিকিৎসায় ভুগতে থাকার ব্যথা নিয়ে কেঁদে যাচ্ছি।’
‘এত কিছু ছাপিয়ে একটা ট্যাগ সব কিছুই কেড়ে নিল আমার। অথচ যে গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক রিপোর্টের কারণে বাদ গেলাম তাদের কাছে কিছু লুকানো উচিত মনে করিনি বলে নিজে থেকে সব বলে দিয়েছি। তথ্য গোপন করে এই চাকরিতে যোগদান করার মত কোন অপরাধ আমার নেই এই সৎ সাহস আমার ছিল বলেই বলেছি। আর এই সত্য বলার অপরাধে আজ আমি বঞ্চিত। একটা ট্যাগের কারণে আমার এবং আমার পরিবারের এত ত্যাগ, এত সংগ্রাম বিফলে গেল। আমি মরে গেলেও আমার আত্মা এর জন্য কখনোই ক্ষমা করবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০২৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর ৪৩তম বিসিএসের রেজাল্ট হলো। আমি আমার এবং আমার পরিবারের এত কষ্টের প্রতিদান পেলাম। প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হলাম। কিন্তু আমার এই খুশির খবর বাবাকে না জানাতে পারার আফসোস জেঁকে বসল কারণ আমার বাবা যে রেজাল্টের কিছুদিন আগে মারা গেছেন। তবুও এতদিনের জার্নির একটা মূল্যায়ন পাবো বলে আশায় বুক বাধলাম। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এত কিছু ছাপিয়ে একটা ট্যাগ সব কিছুই কেড়ে নিল আমার। অথচ যে গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক রিপোর্টের কারণে বাদ গেলাম তাদের কাছে কিছু লুকানো উচিত মনে করিনি বলে নিজে থেকে সব বলে দিয়েছি। তথ্য গোপন করে এই চাকরিতে যোগদান করার মত কোন অপরাধ আমার নেই এই সৎ সাহস আমার ছিল বলেই বলেছি। আর এই সত্য বলার অপরাধে আজ আমি বঞ্চিত। একটা ট্যাগের কারণে আমার এবং আমার পরিবারের এত ত্যাগ, এত সংগ্রাম বিফলে গেল। আমি মরে গেলেও আমার আত্মা এর জন্য কখনোই ক্ষমা করবে না। এই অভিশাপ একজন মজলুমের অভিশাপ।’