Image description
প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশের খসড়া চূড়ান্ত

ভোটার কর্তৃক জনপ্রতিনিধিকে অপসারণে ‘রি-কল’ এর বিধান চালুর প্রস্তাব করেছে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন। বিদ্যমান আইনে জনপ্রতিনিধিকে যেভাবে অপসারণ করা হয় তার অতিরিক্ত হিসেবে এই বিধান প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ) অধ্যাদেশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন এই অধ্যাদেশের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।

খসড়ায় বলা হয়েছে, ভোটার কর্তৃক জনপ্রতিনিধি ‘রি-কল’ হলো একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে ভোটাররা তাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে নির্ধারিত মেয়াদের আগে অপসারণ করতে পারেন। এটি মূলত জনতার হাতে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি মাধ্যম। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচনি ব্যবস্থাকে একটি সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ ধারায় আনার জন্য আগামী তিন মেয়াদের জন্য স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় এই ব্যবস্থা চালু করা অত্যাবশ্যক। এ প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্টসংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে হয়। প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর পাওয়ার পর একটি রি-কল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

দেশে স্থানীয় সরকারের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের জন্যই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আইন। এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে দুটি একক আইনের অধীনে আনতে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সুপারিশ করেছিল স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন। সেই সুপারিশ মোতাবেক গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের তিনটি প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদকে তিনটি পৃথক আইনের বদলে একটি একক আইনে আনতে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ) অধ্যাদেশের খসড়া প্রণয়ন করেছে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন। এ খসড়ার ৪৪ ধারায় ভোটার কর্তৃক জনপ্রতিনিধিকে ‘রি-কল’ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি ভোটারের দৃষ্টিতে পরিষদ ও জনগণের জন্য কল্যাণকর মনে না হলে এবং তেপ্রক্ষিতে ৪৩ ধারার বিধানমতে কোনো কার্যক্রম গৃহীত না হলে সংশ্লিষ্ট সদস্যের নির্বাচিত ওয়ার্ডের ভোটারগণ তার সদস্যপদ রি-কল করার প্রস্তাব পরিষদে পেশ করবেন। তবে শর্ত থাকে যে, রি-কলের জন্য সংশ্লিষ্ট সদস্যের প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে এক শতাংশের অধিক ভোটারের স্বাক্ষরিত/টিপসহি সংবলিত ভোটারের দরখাস্ত লাগবে। উক্ত দরখাস্ত নির্বাচন কমিশন অনধিক এক মাসের মধ্যে কমিশনের সঙ্গে পরামর্শক্রমে বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করবে।’

প্রসঙ্গত: বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতি অনুসারে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাশ হলে যে কোনো পদের যে কোনো সদস্য, সভাধ্যক্ষ, চেয়ারম্যান, মেয়র ও কাউন্সিলর পদ শূন্য হয়ে থাকে। বিদ্যমান এই বিধানের অতিরিক্ত হিসেবে রি-কল-এর বিধান আইনে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করা হলো।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের অন্যতম সদস্য ও সাবেক অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুর রহমান (জীবল) ইত্তেফাককে বলেন, জনগণের ক্ষমতাকে অধিকতর মূল্যায়ন করতে, জনগণের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের সৌহার্দ ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদকে প্রাধান্য দিতেই এই বিধান সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরীক্ষামূলক পদ্ধতি হিসেবে এটিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রয়োগ করে সফলতা পেলে পরবর্তীকালে জাতীয় নির্বাচনেও একই বিধান অন্তর্ভুক্তির পথ উন্মুক্ত হবে। এতে দেশ একটি জবাবদিহিতামূলক গণতন্ত্রে প্রবেশ করবে।

 যেসব দেশে রয়েছে রি-কলের বিধান

যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কিছু অঙ্গরাজ্যে গভর্নর ও অন্যান্য জনপ্রতিনিধিদের রি-কলের বিধান রয়েছে। সুইজারল্যান্ডের কয়েকটি ক্যান্টনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের রি-কল করা যায়। ভেনিজুয়েলায় ২০০৪ সালে প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের বিরুদ্ধে রি-কলের চেষ্টা হয়েছিল। ভারতের মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড় এবং কিছু রাজ্যে পঞ্চায়েত স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রি-কলের বিধান রয়েছে। এই রি-কল বিধানের পক্ষে যুক্তি থাকলেও অনেকে মনে করেন, এতে কোনো জনপ্রতিনিধি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হতে পারে। অবমূল্যায়ন হতে পারে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার।