
বাংলাদেশি রোগী ধরতে বিশেষ চিকিৎসা ছাড় দিচ্ছে এশিয়ার অন্যতম বড় দেশ চীন। দেশটির ইউনান প্রদেশের চারটি শীর্ষ পর্যায়ের হাসপাতালকে বিশেষভাবে বাংলাদেশি রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য মনোনীত করা হয়েছে। চীনের এই সুবিধা নিতে খোদ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নিয়েছে। তবে চিকিৎসক সমাজ বলছেন, উন্নত ও বিশেষায়িত রোগের চিকিৎসায় দেশে পাঁচটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, একটি সুপার স্পেশালাইজড ও ২০টির মতো বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। এরপরও বছরে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য ভারতসহ বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন।
প্রতিবছর তিন থেকে চার বিলিয়ন ডলার চিকিৎসার জন্য চলে যাচ্ছে বিদেশে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বাইরের দেশকে মেডিকেল সুবিধা না দিয়ে নিজেদের চিকিৎসা খাতের উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি হয়ে পড়ছে। রোগীদের আস্থা ফেরাতে হাসপাতালগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ, নির্ভুল রোগ নির্ণয়ে অত্যাধুনিক পরীক্ষা সরঞ্জাম স্থাপন করে কমমূল্যে সেবা দিতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা যুগান্তরকে বলছেন, বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের উষ্ণ সম্পর্কের জেরে দেশটি মেডিকেল ট্যুরিজমের টার্গেট পূরণ করত বাংলাদেশি রোগীদের মাধ্যমে। বিত্তশালী রোগীদের বড় একটি অংশ ভারতের পাশাপাশি থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যসহ কিছু দেশে যাচ্ছেন। ৫ আগস্টের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে দেশটির ভিসার সুযোগ ব্যাপকভাবে সীমিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটক ভিসা বন্ধ করে দিয়েছে। মেডিকেল ভিসা সীমিতভাবে দেওয়া হচ্ছে। ভারতের ভিসা জটিলতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহতদের যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, ফ্রান্স, চীন ও ভুটান থেকে চিকিৎসক এনে সেবা দিয়েছে। ৩৮ জনকে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশে পাঠিয়েছে।
এদিকে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরের মতো দেশে চিকিৎসা খরচ ভারতের তুলনায় বেশি হওয়ায় সাধারণ রোগীদের জন্য আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে বিকল্প হিসাবে চীনকে বেছে নিচ্ছেন। চীন অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাজার ধরতে মরিয়া হয়ে কাজ করছে। ভারতে বাংলাদেশিদের চিকিৎসার দরজা সীমিত হওয়ায় চায়না মেডিকেল ট্যুরিজম সুযোগ নিচ্ছে। ইতোমধ্যে চীন সরকার দেশটির কুনমিং মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ফার্স্ট অ্যাফিলিয়েটেড হাসপাতাল এবং ইউনান ফার্স্ট পিপলস হাসপাতাল বাংলাদেশিদের সব ধরনের চিকিৎসা দেবে বলে জানিয়েছে। বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসাবে ফু-ওয়াই কার্ডিওভাসকুলার হাসপাতাল এবং ইউনান ক্যানসার হাসপাতাল ডেডিকেটেড ঘোষণা করেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, চীনের ওই চার হাসপাতালে স্থানীয় লোকজন যে ফি পরিশোধ করেন বাংলাদেশি রোগীরা একই ফি পরিশোধ করবেন। গত মাসে কয়েক ডজন বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য কুনমিং ভ্রমণ করেছেন। যাত্রীদের বিমান টিকিটের উচ্চমূল্যের সমস্যা সমাধানে চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স চট্টগ্রাম থেকে কুনমিং রুটে ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা করছে। ঢাকার সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষও ঢাকা-কুনমিং রুটে ফ্লাইটের টিকিটের ভাড়া কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এপ্রিলে বাংলাদেশ থেকে সাংবাদিকদের বড় একটি দলকে কুনমিংয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থা দেখতে পাঠানো হবে।
সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীন সফরে যান। সফর শেষে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেনটেটিভ ড. খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিকমানের বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের ব্যাপারে চীন সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছে। চীন রাজি হয়েছে। খুব শিগগির এ হাসপাতাল নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের সেবা দিতে বাংলাদেশে চিকিৎসক টিম পাঠিয়েছিল চীন। এবার আহতদের উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে রিহ্যাবিলিটেশন ও রোবটিক ফিজিওথেরাপি সেন্টার স্থাপন করতে সহায়তা করবে দেশটি। রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সেন্টার স্থাপন করা হবে। এরই মধ্যে চীনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল এ বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করে গেছে। দগ্ধ মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসায়ও চীনের অনুদানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট স্থাপন করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বার্ন ইউনিট নির্মাণে ব্যয় হবে ২৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীন সরকার অনুদান হিসাবে দেবে ১৮০ কোটি টাকা। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা রয়েছে।
ভারতের পর বাংলাদেশ থেকে বেশি রোগী যায় থাইল্যান্ডে। ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সপ্তাহে ১৪টি ফ্লাইট পরিচালনা করছে থাই এয়ারওয়েজ। যাত্রীদের চাপ এড়াতে থাইল্যান্ড ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশিদের ই-ভিসা দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরান, মালয়েশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের রোগীদের নিয়ে মেডিকেল ট্যুরিজম শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা যুগান্তরকে বলছেন, এই মুহূর্তে বিশ্বে মেডিকেল ট্যুরিজমের পরিমাণ ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের। মেডিকেল ট্যুরিজমের ৪০ শতাংশ হয় এশিয়ার দেশগুলোতে। যার এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করে ভারত। দেশটির ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাজার বাংলাদেশের রোগী নিয়ে। ভারতের দুয়ার বন্ধ হওয়ায় চীন সুযোগ নিচ্ছে। সরকারও তা দিচ্ছে। দিনশেষে এটি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি রোগীদের অনাস্থা আরও বাড়তে পারে। রোগীদের বিদেশমুখিতা ঠেকাতে পরিকল্পনা করে এগোতে হবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাবেক বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য ও চিকিৎসা অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই মাহবুব যুগান্তরকে বলেন, দেশে সাধারণ রোগের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু বড় অসংক্রামক রোগ যেমন ক্যানসার, নিউরোলজি ও ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন কঠিন হচ্ছে। আধুনিক ডায়াগনোসিস কঠিন হচ্ছে। সরকার এটিতে গুরুত্ব না দিয়ে বাইরের দেশে সুযোগ সৃষ্টি করলে সাধারণ মানুষের লাভ হবে না। বাইরে চিকিৎসা করাতে গেলে ৩০ শতাংশ শুল্ক গুনতে হয়। তিনি আরও বলেন, দেশে প্রায় ১৮ কোটি মানুষ রয়েছে। যাদের চিকিৎসায় স্বাস্থ্য খাতকে আধুনিকায়ন করার সুযোগ রয়েছে। এজন্য স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ ও মানবসম্পদ জরুরি। সরকারের উচিত আজই কাজ শুরু করা। কোনো দেশ যদি জনহিতকর উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসে সেটা নেওয়া যেতে পারে। তবে নিজেকে কিভাবে প্রস্তুত করা যায় সেদিকে নজর দিতে হবে।