Image description

ভারতের সেভেন সিস্টার্স বলে খ্যাত উত্তর-পূর্বাঞ্চল নানা কারণে আলোচনায় আসে। এ অঞ্চল নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে উত্তেজনাও ছড়িয়েছে বিভিন্ন সময়।

ভারতের সেভেন সিস্টার্স বলে খ্যাত উত্তর-পূর্বাঞ্চল নানা কারণে আলোচনায় আসে। এ অঞ্চল নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে উত্তেজনাও ছড়িয়েছে বিভিন্ন সময়। নিজেদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়ে ভারতের রয়েছে নিজস্ব নীতি ও কৌশল। আবার চট্টগ্রাম অঞ্চলকে ধরে বাংলাদেশের রয়েছে নিজস্ব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ভাবনা। এসব ভৌগোলিক, রাষ্ট্রীয়, নীতিগত ভিন্নতা থাকলেও জাপান এ দুই অঞ্চলকে একটি অভিন্ন সমন্বিত উন্নয়ন অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করেছে। এ কৌশল বাস্তবায়নে গত এক দশকে এ দুই অঞ্চল ঘিরে জাপান বিপুল বিনিয়োগ করেছে। এসব বিনিয়োগ প্রকল্প পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের মধ্যে কানেক্টিভিটি বৃদ্ধি করে অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করাই এসব প্রকল্পের লক্ষ্য।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম-বঙ্গোপসাগর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের কানেক্টিভিটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব জাপান অনেক আগেই অনুধাবন করতে পেরেছিল। ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশ এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মাথায় রেখে জাপান এ অঞ্চলে একটা অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্ভাবনা দেখেছে। এক্ষেত্রে ভারতের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে ভিন্নতা ছিল। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে জাপানের পরিকল্পনাগুলো ভারত ভালোভাবে দেখেনি। ফলে ভারত বাংলাদেশকে এড়িয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতকে আসিয়ানের সঙ্গে সংযুক্ত করে উন্নয়নের পরিকল্পনা করেছে। বাংলাদেশকে এড়িয়ে সরাসরি উত্তর-পূর্ব ভারতে বিনিয়োগের বিষয়ে জাপানকে প্রভাবিত করেছিল ভারত। কিন্তু বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চল ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে একটি সমন্বিত উন্নয়ন করিডোর বিবেচনা করে জাপান এক দশক ধরে বিনিয়োগ পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়েছে। তাদের প্রক্ষেপণে এ বিনিয়োগ পরিকল্পনা অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় বিবেচনায় নিয়ে মাতারবাড়ীর মতো প্রকল্পগুলোয় জাপান সম্পৃক্ত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের বিষয়টি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা এখন বোঝা যাচ্ছে না। ভারতও এটা জানে না বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশ ভারতকে আইসোলেট করে উন্নয়ন কৌশল বা পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করবে, নাকি ভারতের সঙ্গে এনগেজমেন্ট কমিয়ে একটা ওয়ার্কিং রিলেশন বজায় রেখে অগ্রসর হবে—তা সামনের দিনে আমরা দেখতে পাব। তবে জাপানের যে ত্রিপক্ষীয় ভাবনা বা দৃষ্টিভঙ্গি তা এখনো প্রাসঙ্গিক। বঙ্গোপসাগরের কারণে আমরা খুবই সুবিধাজনক অবস্থানে আছি। এ বিষয়টিকে ব্যবহার করার জন্য জাপানের আগে চীনও চেষ্টা করেছিল। এ সুবিধাজনক অবস্থানকে আমরা যদি কাজে লাগাতে পারি, তাহলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়ই উত্তর-পূর্ব ভারত বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল হবে। আর জাপানের বিনিয়োগ পরিকল্পনাগুলোর ক্ষেত্রে ভারত আগে থেকে বাংলাদেশকে বাইপাস করতে চেয়েছিল, এখন সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আবারো বাংলাদেশকে বাইপাস করতে চাইতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে আগে সম্মত না হলেও এখন বা আগামী দিনগুলোয় বিনিয়োগ পরিকল্পনাগুলো নিয়ে জাপান কিছুটা ওয়েট অ্যান্ড সি কৌশল অনুসরণ করতে পারে। সবগুলো অ্যাক্টরকে মিউচুয়াল বেনিফিশিয়াল পন্থায় ডিল করাটা বাংলাদেশের জন্য বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। গত এক দশকে জাপানের সঙ্গে সম্পর্কটা যে পর্যায়ে এসেছে তা আরো সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।’

 

২০২৩ সালের মার্চে ভারত সফর করেন জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা। ১৯ থেকে ২১ মার্চের সফরের আলোচনায় উঠে আসে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল ও উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়ন পরিকল্পনা। জানানো হয় এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশে নির্মাণ হবে নতুন শিল্প কেন্দ্র। এরপর ২৯ মার্চ মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দ্বিতীয় পর্যায়ের ঋণ চুক্তিসহ মোট তিনটি প্রকল্পের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর ও নোট বিনিময় করেন বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের প্রতিনিধিরা। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে স্বাক্ষর হওয়া অন্য প্রকল্পগুলো ছিল চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক উন্নয়ন এবং জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী অংশে ডুয়াল গেজ ডাবল রেললাইন নির্মাণ। ঋণের আকার ছিল ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার।

 

২০২৩ সালের ১১-১২ এপ্রিল ভারতের ত্রিপুরার আগরতলা শহরে বাংলাদেশ, জাপান ও ভারতের ত্রিপক্ষীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল অত্র অঞ্চলের বাণিজ্য সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য কানেক্টিভিটি বা সংযোগ উদ্যোগ গ্রহণ করা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় শিলংভিত্তিক থিংকট্যাংক এশিয়ান কনফ্লুয়েন্স সম্মেলনটি আয়োজন করে। এতে অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশ ও ভারতের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী, ভারতে নিযুক্ত জাপানি রাষ্ট্রদূত এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা।

সম্মেলনে নতুন শিল্প কেন্দ্র স্থাপন প্রসঙ্গে ভারতে তৎকালীন জাপানের রাষ্ট্রদূত হিরোশি সুজুকি বলেন, ‘এটি ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ের বিজয়ী হওয়ার মতো একটি পরিকল্পনা হতে পারে।”গভীর সমুদ্রবন্দরটি (মাতারবাড়ী বন্দর) সম্ভবত ২০২৭ সালের মধ্যে চালু হবে এবং এটি ঢাকা থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত সংযুক্ত একটি শিল্প কেন্দ্র গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হবে।’

এশিয়ান কনফ্লুয়েন্সের পূর্ববর্তী এক গবেষণায় বলা হয়েছিল যে উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশকে তাদের বহুমুখী সংযোগ অবকাঠামো আরো উন্নত করতে হবে। এটি শুধু এ অঞ্চলের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে না, বরং দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যবধান কমাতেও সাহায্য করবে। গবেষণায় আরো বলা হয়, দুই দেশকে একসঙ্গে কাজ করে বাণিজ্য সহজীকরণে সমন্বয় সাধন করতে হবে এবং উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ট্রান্সশিপমেন্ট ও ট্রানজিটের জন্য দ্রুত পরিবহন করিডোর গড়ে তুলতে হবে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এ অঞ্চলে শিল্প মূল্য শৃঙ্খলা গড়ে তোলার মাধ্যমে ভারতীয়, বাংলাদেশী ও জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য লাভজনক পরিস্থিতি তৈরি করা যেতে পারে।

এক দশক ধরেই অবাধ ও মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসেবে বিনিয়োগ করছে জাপান। এক্ষেত্রে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে এ অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে নিষ্ক্রিয় করার ভাবনাও রয়েছে দেশটির। চীনা উদ্যোগের বিপরীতে জাপানের রয়েছে বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট বা বিগ-বি। সব মিলিয়ে অবাধ ও মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসেবে জাপানি অর্থায়ন ও বিনিয়োগ আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশ।

জাপানের বিগ-বি উদ্যোগটি বাংলাদেশে প্রথম আলোচনায় আসে ২০১৪ সালের মে মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশটি সফরের সময়ে। ওই সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন প্রয়াত শিনজো আবে। সে সময় বাংলাদেশে উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে চার-পাঁচ বছরের মধ্যে ৬০ হাজার কোটি ইয়েন (তৎকালীন বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৬০০ কোটি ডলার) বিনিয়োগের ঘোষণা দেন শিনজো আবে। এর বেশির ভাগই ওডিএ ঋণ হিসেবে বিনিয়োগ করার কথা। বিগ-বি উদ্যোগের আওতায় এ বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের ঘোষণা সে সময় ভূরাজনীতির দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষকদেরও মনোযোগ আকর্ষণ করে।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সফর করেন শিনজো আবে। ওই সফর চলাকালে তিনি অর্থনৈতিক অবকাঠামো, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নে জাপানের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে জাপান নিয়মিতভাবে এ সহযোগিতা বাস্তবায়ন করে যাবে বলেও ঘোষণা দেন তিনি।

প্যান-এশিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিএআরআই) নির্বাহী পরিচালক ও জাপানিজ স্টাডিজ অ্যাসোসিয়েশন ইন সাউথ এশিয়ার মহাসচিব ড. আবদুল্লাহ-আল-মামুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাপানের বিনিয়োগ ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলেরই অংশ। এটা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে কানেক্ট করার জন্য। ভারত ও বাংলাদেশের আর্থিক সক্ষমতার ঘাটতি বিবেচনায় এখানে জাপান বিনিয়োগ করছে। তবে পরিবর্তিত অবস্থায় এ প্রকল্পগুলোকে এগিয়ে নিতে জাপান, ভারত ও বাংলাদেশ—এ তিন রাষ্ট্রকেই আরো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আমার ধারণা, জাপান এরই মধ্যে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছে যে বাংলাদেশের রাজনীতি কোনদিকে যায় এবং নতুন সরকারের নীতি কেমন হয়।’ জাপানের সতর্ক পর্যবেক্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে কোনো ইস্যু তৈরি হবে না বলেই মনে করছি। কিন্তু অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলকে ঘিরে যে পরিকল্পনা তা নির্ভর করবে পরবর্তী সরকার কীভাবে ভারত ও জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক বিনির্মাণ করে তার ওপর। সেটাই জাপান মূলত পর্যবেক্ষণ করছে।’

বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট বা বিগ বি, যেটির বাংলাদেশের চ্যাপ্টার মিরসরাই ও মাতারবাড়ী অঞ্চলে বাস্তবায়ন করছে জাপান। এটা প্রকৃতপক্ষে জাপানের অবাধ ও মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলেরই অংশ—এমনটা উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা ভূকৌশল বিবেচনায় এটাকে বলা হচ্ছে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের কাউন্টার নীতি। সামগ্রিকভাবে অবকাঠামো উন্নয়নে এটা জাপানের অবাধ ও মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলেরই একটা অংশ। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, মিরসরাইয়ের অর্থনৈতিক অঞ্চল, আড়াইহাজারে জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে—এ উদ্যোগের অন্তর্ভুক্ত।

বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিকের মূল উদ্দেশ্য ছিল মাতারবাড়ীর গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের সংযোগ ঘটানো। ত্রিপুরার সাবরুম ও খাগড়াছড়ির রামগড়—এ দুটো স্থানের সংযোগ ঘটলে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের দূরত্ব ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটারের মধ্যে চলে আসে—এটাই ছিল পরিকল্পনা—উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভ্যালু চেইনকে আড়াইহাজারের জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাধ্যমে সম্প্রসারণ করা। অর্থনৈতিক অঞ্চলে পণ্য উৎপাদন করে আসিয়ান ও আসিয়ানের বাইরে অর্থাৎ ইন্দো-প্যাসিফিকের পুরো অঞ্চলে একটা ইকোনমিক করিডোর উন্নয়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে জাপানের।

২০২৩ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার দুইদিনের ভারত সফরে দেয়া বক্তব্যে এ অঞ্চলে জাপানি কৌশলগত বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্র হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কানেক্টিভিটিকে চিহ্নিত করা হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গত এক দশকে শুধু কানেক্টিভিটি গড়ে তুলতে গিয়েই হাজার কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছে টোকিও। এর মধ্যে উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়নে দেশটির ব্যয় ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে জাপানের আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি কার্যক্রমের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চল। এর প্রধানতম অনুষঙ্গ হলো কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ও উন্নয়ন। গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক উন্নয়ন কার্যক্রমে মোট ব্যয় হচ্ছে ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপান দিচ্ছে ১২ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা (১২০ কোটি ডলার প্রায়)। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে জাপানের বিনিয়োগ প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা (প্রায় ৪১১ কোটি ডলার)। এছাড়া পরিবহন ও যোগাযোগ খাতেও বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে দেশটি।

ভারতে আসামের নয়া ধুবড়ি থেকে মেঘালয়ের ফুলবাড়ি পর্যন্ত নির্মাণ হচ্ছে ১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু। এটিই হতে যাচ্ছে ভারতের দীর্ঘতম সেতু। এ সেতু নির্মাণ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে জাপানি উন্নয়ন সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। সেতুটি নির্মাণ হলে বাংলাদেশ থেকে ভারতের মধ্য দিয়ে ভুটানে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। প্রক্ষেপণ রয়েছে, সেতুটির নির্মাণকাজ শেষে সংশ্লিষ্ট সড়কটির ওপর দিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক পণ্য পরিবহনের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ কোটি ১৮ লাখ টনেরও বেশি। এছাড়া ধুবড়ি থেকে ফুলবাড়ি পর্যন্ত যাতায়াতের পথ ৮ ঘণ্টা থেকে মাত্র ২৩ মিনিটে নামিয়ে আনবে সেতুটি। ধুবড়ি-ফুলবাড়ি সেতু নির্মাণ শেষ হলে এর দুই পাশে বাজার ও সেবা খাতের ব্যাপক প্রসার হবে বলে আশাবাদী খাতসংশ্লিষ্টরা।

মেঘালয়ের তুরা থেকে ডালু পর্যন্ত হাইওয়ে নির্মাণের কাজ চলছে। মেঘালয়েই শিলং থেকে ডাউকি পর্যন্ত বিদ্যমান হাইওয়েকে দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। মূলত বাংলাদেশের সঙ্গে মেঘালয়ের কানেক্টিভিটি তৈরিতেই মহাসড়ক দুটির উন্নয়নকাজ চলছে। দুটি প্রকল্পে অর্থায়ন করছে জাইকা। এ প্রকল্পগুলোও মূলত আসাম ও মেঘালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের কানেক্টিভিটি তৈরির উদ্দেশ্যেই বাস্তবায়ন হচ্ছে।

গত এক দশকে বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশেরই বড় উন্নয়ন অংশীদার হয়ে উঠেছে জাপান। বাংলাদেশের মতো ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কানেক্টিভিটি প্রকল্পগুলোয় জাইকার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করছে দেশটি।

জাইকার তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ সালে সংস্থাটি প্রথম ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষায় এখানকার পরিবহন ব্যবস্থায় বিনিয়োগের অর্থনৈতিক ফলাফল ও গুরুত্ব খতিয়ে দেখা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকারের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলোয় বিনিয়োগ নিয়ে জাইকার একটি চুক্তি সই হয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে জাতীয় মহাসড়কের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিভিন্ন অংশে মোট ৬৫৭ কিলোমিটার সড়কপথের উন্নয়ন ও নির্মাণকাজে বিনিয়োগ করছে জাইকা। মোট পাঁচ ধাপে ‘উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কানেক্টিভিটি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোয়’ বিনিয়োগ করছে সংস্থাটি। জাইকা সূত্রে জানা গেছে, এজন্য জাপান সরকারের আনুষ্ঠানিক উন্নয়ন সহযোগিতা কর্মসূচির আওতায় দেয়া ঋণ হিসেবে মোট ১৬ হাজার ১০০ কোটি ইয়েন (১৪০ কোটি ডলারের বেশি) বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পাশাপাশি দায়িত্ব গ্রহণের আগে থেকেই ভারতের সেভেন সিস্টার্স বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন সময় বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন ভারতের নীতিনির্ধারকরা। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি চীন সফরের সময় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যে ব্যবসায়িক সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘ভারতের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত সাতটি রাজ্য সম্পূর্ণরূপে ল্যান্ডলকড (স্থলবেষ্টিত)। সমুদ্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের কোনো উপায় নেই। আমরাই এ অঞ্চলের জন্য সমুদ্রের একমাত্র অভিভাবক।’

প্রধান উপদেষ্টা যথাযথ বলেছেন উল্লেখ করে এক বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘সেভেন সিস্টার্সে ভারতের আশা-ভরসার আশ্রয়স্থল হচ্ছে আমাদের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। আগরতলা থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার। আর মুম্বাই বন্দর বা দিল্লি থেকে কলকাতা এলে অর্থাৎ পুরোটা ঘুরে এলে ৩ হাজার কিলোমিটার। প্রধান উপদেষ্টা ঠিকই বলেছেন। কারণ তাদের ল্যান্ডলকড অবস্থান, আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি বিবেচনায় আমরা অবশ্যই অ্যাকসেস দিতে চাই।’

গতকাল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের ডাকা ব্রিফিংয়ে সেভেন সিস্টার্স নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং ভারতের বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। এ প্রশ্নের জবাবের শুরুতেই ২০২৩ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে দেয়া বক্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘জাপানের প্রধানমন্ত্রী কিশিদা দিল্লিতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন নর্থইস্ট ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশকে একটা ভ্যালু চেইনে আবদ্ধ করার কথা। উনি এ প্রসঙ্গে সিঙ্গেল ইকোনমিক জোনের কথা বলেছিলেন। যেটা বিগ-বি ইনিশিয়েটিভ বলে গণ্য করা হয়। আগেই বলেছি কানেক্টিভিটি এ অঞ্চলের সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে, বিশেষ করে যাদের জন্য সমুদ্রে অ্যাকসেস পাওয়াটা খুব কঠিন। আমরা কিন্তু জোর করে কানেক্টিভিটি চাপিয়ে দেব না। দেয়ার অবস্থাও আমাদের নেই। কেউ যদি নেয় খুব ভালো। আর না নিলে কী করব আমরা? আমাদের কিছু করার নেই। অত্যন্ত সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কথাই তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) বলেছেন। আমরা কানেক্টিভিটি সবার ইকুইটেবল বেনিফিটের জন্য দিতে আগ্রহী আছি। কেউ নেবেন তো ভালো, না নিলে, নেবেন না।’

আঞ্চলিক অর্থনীতিসংশ্লিষ্ট এক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, শিলচর বা সাবরুমে একটি স্থলবন্দর হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর শুধু আমাদের সমুদ্রবন্দর না, বরং এটা ভারতের সেভেন সিস্টার্সের জন্য একটা আর্টারি। যার মূল ভূকৌশলগত বিষয়টি জাপানকেন্দ্রিক। কারণ ভারতের ওই সক্ষমতা নেই যে সেভেন সিস্টার্সে পাহাড়ের মধ্য দিয়ে সড়ক অবকাঠামো তৈরি করবে। যে কারণে জাপান ভারতের উত্তর-পূর্ব এবং আমাদের এ অঞ্চল অর্থাৎ মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে বিনিয়োগ করছে। যাতে গোটা ভ্যালু চেইনটা উন্নয়ন করা যায়। পাশাপাশি বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে ভারত যেন এ সহায়তা পায়, জাপান এ বিষয়কে বিবেচনায় নিয়েছে।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাপানের যে বিগ-বি পরিকল্পনা আছে তারই আওতায় ভারতের উত্তর-পূর্বাংশ এবং বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়ন করা হচ্ছে। কিন্তু এখন বাংলাদেশ-ভারতের যে সম্পর্ক তাতে জাপানের উদ্বিগ্ন হওয়ার যুক্তিসংগত কারণ আছে। বিশেষ করে দুই-তিনদিন ধরে চলা কথার উত্তেজনা জাপানের দৃষ্টিও আকর্ষণ করেছে বলে মনে করি।’

গত ফেব্রুয়ারিতে জাপান দূতাবাসসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার সঙ্গে বণিক বার্তার একান্ত আলাপচারিতায় জানা যায়, দেশটি বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রেখেছে। এরপর গতকাল জাপান উন্নয়ন সংস্থার প্রধানের কাছে জাপান-বাংলাদেশ-ভারত ত্রিপক্ষীয় সম্পর্ক ও অবকাঠামো উন্নয়নকেন্দ্রিক অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।