
অন্তর্বর্তী সরকার সব স্তরে সংস্কারের পদক্ষেপ নিলেও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে (বিপিডিবি) দুর্নীতিবাজরা এখনো সক্রিয়। সংস্থার কেনাকাটায় এখনো ঘুষখোর, লুটেরাচক্র সরকারকে ঠকিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ রকম এক দুর্নীতির খবর পাওয়া গেছে প্রি-পেইড মিটার কেনায়; যেখানে বাজারদরের চেয়ে কম দামে মিটার কেনার সুযোগ পাশ কাটিয়ে বেশি দরে কেনার প্রক্রিয়া করা হয়। পরে ধরা পড়ার পর তা আটকে যায়।
পিডিবি সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২৫ জুন দুই লাখ ১০ হাজার স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার ক্রয়ের উদ্দেশ্যে পাঁচটি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে আটটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে কারিগরি মূল্যায়নে পাঁচটি কম্পানিকে নির্বাচন করা হয়।
সেগুলোর মধ্যে নিংগবো সানজিং কম্পানি প্রতিটি স্মার্ট মিটারের দাম ২৫.৯৭ ডলার দর প্রস্তাব করে, যা সর্বনিম্ন। কিন্তু সর্বনিম্ন দরদাতাকে পাশ কাটিয়ে পিডিবির অসাধু কর্মকর্তাদের একটি চক্র যোগসাজশ করে অধিক দরদাতা একটি চীনা কম্পানিকে ৩২.৯০ ডলারে কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। পরে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে প্রক্রিয়াটি আটকে যায়।
জানা গেছে, সর্বনিম্ন দরদাতাকে পাশ কাটিয়ে যে কম্পানিকে কাজ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল সেই কম্পানি বড় অঙ্কের অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) এর প্রমাণও পায়। ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে এলসি করে চীনা ওই কম্পানি ৩৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা পাচার করেছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি তদন্ত চলমান। পিডিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, চীনা দুটি কম্পানি দীর্ঘদিন ধরে পিডিবিতে সিন্ডিকেট করে একচেটিয়া ব্যবসা করে আসছে। তারা আগে একটি মিটারের বিপরীতে ৪২ ডলার দাম নিয়েছে। এখন প্রতিযোগিতায় আরো কয়েকটি কম্পানি চলে আসায় তারা নানা রকম কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দেওয়ার পাঁয়তারা করছে।
আরো জানা গেছে, প্রি-পেইড মিটার ক্রয়ে পাঁচটি দরপত্রে নিংগবো সানজিং কম্পানি সর্বনিম্ন দরদাতা বিবেচিত হলেও এর মধ্যে মাত্র একটি দরপত্রের বিপরীতে তাদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। আর বাকি চারটি দরপত্রের কার্যাদেশ ওই চীনা কম্পানিকে দিতে পিডিবির কর্মকর্তারা তৎপরতা চালাচ্ছেন। এমনকি সর্বনিম্ন দরদাতাকে কারিগরিভাবে অযোগ্য প্রমাণ করতে চাইছেন তাঁরা। শুধু তা-ই নয়, আগে যেসব কম্পানি কারিগরি ত্রুটিযুক্ত ও উচ্চমূল্যে মিটার সরবরাহ করত, সেগুলো নিংগবোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলে পিডিবির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান।
নিংগবোর বিরুদ্ধে যেসব কম্পানি অভিযোগ করেছে, এর মধ্যে চীনা একটি কম্পানি কারিগরি নমুনা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি। ওই কম্পানির জমা করা নমুনা মিটারে পিএফসি ফিচার এবং ক্রেডিট ডিডাক্ট ফিচার কাজ করার কথা থাকলেও পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়, তাদের মিটারে রিচার্জ না করেই গ্রাহক আজীবন বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারবে। এ ছাড়া মিটারে যদি নেগেটিভ ব্যালান্স থাকে তাহলে রিচার্জ না করেও বিদ্যুৎ ব্যবহার করা সম্ভব। এভাবে গ্রাহক পর্যায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রামের একটি বিদ্যুৎ অফিসে এমন চুরির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে বিশাল অঙ্কের বিদ্যুৎ ব্যবহারের টাকা সিস্টেম থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে, যা এখনো তদন্তাধীন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, পিডিবি ফ্যাক্টরি পরিদর্শন করে এবং মিটার টেস্টে পাস করলেই শুধু মিটার সরবরাহের অনুমতি দেয়। বাংলাদেশে মিটার পৌঁছার পর পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশন করে মিটার গ্রহণ করা হয়। তাই কোনো সরবরাহকারীর নিম্নমানের মিটার সরবরাহের কোনো সুযোগ নেই। যদিও সূত্র জানায়, পাঁচটির মধ্যে চারটি দরপত্রের কার্যাদেশ প্রদান না করে সম্প্রতি দরপত্র বাতিল করা হয়েছে।
বর্তমানে ইউএস ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তহীনতা এবং অস্থিতিশীলতার কারণে ব্যবসার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, কিছু ব্যবসায়ীর দুর্নীতি ও সর্বগ্রাসী মনোভাবের জন্য এই অবস্থা বেড়ে গেছে এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আগের সরকারের আমলে ভালো অবস্থানে থাকা এবং অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে প্রচুর কাজ পাওয়া কিছু কম্পানি সিস্টেমেটিকভাবে অন্য কম্পানির ব্যবসা নষ্ট করার জন্য হয়রানিমূলক কাজ করছে।
এর মধ্যে আইডিয়াল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের নামে অভিযোগ উঠেছে। এই কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান সাবস্টেশন, ট্রান্সফর্মার, মিটারের সব টেন্ডারের কাজ পেয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিআইপি হন।
জানা যায়, গত বছরের ৮ অক্টোবর ও ১৭ নভেম্বরে দুটি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে পিডিবি। ওই দুটি দরপত্রের কারিগরি প্রস্তাব ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর এবং চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি খোলা হয়। স্যাম্পল পরীক্ষা শেষে একটি দরপত্রে আগের বিপু সিন্ডিকেটের সদস্য দুই প্রতিষ্ঠানের স্যাম্পল পাস করানো হয়। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য দরদাতা প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করলে দুটি দরপত্র বাতিল করা হয়। এর পর আরো দুটি দরপত্রে সব দরদাতা প্রতিষ্ঠান উত্তীর্ণ হলে পুনরায় ওই চক্রটি এই দুটি দরপত্র বাতিল করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে বলে অভিযোগ ওঠে।
আরো জানা যায়, বিতর্কিত কম্পানি আইডিয়াল এন্টারপ্রাইজ বেশি লাভ করার জন্য প্রি-পেইড মিটার ও সাবস্টেশন ব্যবসা টার্গেট করে আসছে বহু বছর ধরে। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড ও ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি তাদের মূল ঘাঁটি। ওই দুটি প্রতিষ্ঠান ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে এককভাবে দরপত্র পাস করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে এই চক্রটি। আইডিয়াল ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানিতে আওয়ামী লীগ আমলে ৪০ থেকে ৪২টি সাবস্টেশন টেন্ডারে একচেটিয়া কাজ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। এনার্জিপ্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানকেও তারা ব্ল্যাকলিস্ট করায় বিভিন্ন সংস্থায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আইডিয়ালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আগে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে কাজ করতেন। আইডিয়াল সেই ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংকিং করত। একবার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরকার বাবু তাঁকে কাজের প্রস্তাব দেন। এভাবে সরকার বাবুর কোনো উত্তরসূরি না থাকায় একসময় টেন্ডারের কাজের অভিজ্ঞতা থাকা কম্পানির মালিক হয়ে যান মুজিবুর রহমান।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রি-পেইড মিটারের বাজারে সরকারি দুটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্মার্ট ইলেকট্রিক্যাল কম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ পাওয়ার ইকুইপমেন্ট কম্পানিসহ প্রায় ১৫টি কম্পানি রয়েছে। বেশির ভাগ কম্পানি মিটার আমদানি করে সরবরাহ করে। টেলিকম শিল্প সংস্থা (টিএসএস), বাংলাদেশ ডিজেল প্লান্ট, সেনাকল্যাণ সংস্থা দেশীয় প্রতিষ্ঠান; যারা চীনা সরবরাহকারীর কাছ থেকে মিটার নিয়ে মিটারের প্রকল্পে কাজ করছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়, যাতে দেশের মানুষের কর্মসংস্থান হয়। এখন খোলাবাজারেও মিটার সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানগুলো, যেখানে গ্রাহক নিজে কিনে দিচ্ছে মিটার। ব্যবসার সুস্থ পরিবেশ এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্যে এ ধরনের পরিকল্পিত আক্রমণ বন্ধ করে ব্যবসায় ছোট-বড় সব প্রতিযোগীকে কাজ করার এবং টিকে থাকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।