
যে ডাক্তার রোগী দেখবেন তিনি বা তারা শিক্ষকতার পেশায় থাকতে পারবেন না। আবার যারা শিক্ষকতায় থাকবেন তারা রোগী দেখতে পারবেন না, তারা নিজেদের গবেষণায় নিয়োজিত করবেন। এ ধরনের আরো অনেক সুপারিশ সম্বলিত একটি চূড়ান্ত রিপোর্ট শিগগিরই জমা দিতে যাচ্ছে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এই পেশায় যারা শিক্ষতায় থাকবেন তাদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দেয়া হবে। আবার গবেষণা প্রকল্পে বরাদ্দ করা অর্থ থেকেও নিজেদের পারিশ্রমিক পেয়ে যাবেন। ফলে রোগী দেখা এবং অপারেশন করে যে অর্থ আসতে পারত শিক্ষকতা ও গবেষণা থেকে প্রায় সে রকম অথবা এর কাছাকাছি অর্থ উপার্জন করতে পারবেন, তাদের অর্থকষ্ট হবে না। আবার যারা রোগী দেখবেন তাদের পদবি হবে কনসালট্যান্ট বা পরামর্শক। তারা গবেষণা করতে পারবেন না, শিক্ষকতাও নয়।
স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ করে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন শিগগিরই জমা দিতে যাচ্ছেন তাদের রিপোর্ট। কমিশনের কয়েকজন সদস্যের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জাতিকে একটি কার্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উপহার দেয়ার জন্য তারা রিপোর্টে একাধিক সুপারিশ করে শিগগিরই প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেবেন। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, তারা একটি কার্যকর রেফারাল সিস্টেম বাস্তবায়নের ওপরও জোর দিয়েছেন। রেফারাল সিস্টেম চালু হলে দেশের মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, ইনস্টিটিউটগুলোতে (টার্শিয়ারি হাসপাতাল) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা রোগীদের জন্য আরো সময় ব্যয় করতে পারবেন। রেফারাল সিস্টেম চালু হলে সাধারণ অসুখের জন্য জেনারেল প্র্যাকটিশনারের (জিপি) কাছে যেতে পারবেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্র এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে পারবেন। তারা প্রথমেই টার্শিয়ারি হাসপাতালে যেতে পারবেন না, কারণ হাসপাতালগুলোতে নিচের স্তরের চিকিৎসকদের রেফারেন্স ছাড়া কোনো রোগীই দেখতে পারবেন না।
টার্শিয়ারি হাসপাতালগুলোতে সাধারণ রোগী না আসতে পারলে সেই হাসপাতালের চিকিৎসকরা অপেক্ষাকৃত জটিল রোগী দেখার সুযোগ পাবেন এবং প্রয়োজনীয় গবেষণাও করতে পারবেন শিক্ষকরা। এতে করে জটিল রোগীদের প্রতি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা আরো বেশি সময় দিতে পারবেন, শিক্ষক ও গবেষকদের পরামর্শও পাবেন রোগীরা। ফলে এই রোগীদের মধ্যে যারা বিদেশ চলে যেত তারা এখানে উন্নতমানের চিকিৎসা পাবেন এবং বিদেশে গিয়ে তাদের বহুমূল্যে চিকিৎসা নিতে হবে না। একই সাথে চিকিৎসা খাতে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যাবে না।
স্বাস্থ্য কমিশন সূত্রে জানা গেছে, একই সাথে উপজেলা ও জেলা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের ঘাটতি পূরণের সুপারিশ করতে যাচ্ছেন তারা। সেই সাথে জটিল ডায়াগনস্টিকগুলো উপজেলা ও জেলা পর্যায়েই যেন রোগীরা করাতে পারেন সেই ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও কমিশন তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করবে।
সূত্র আরো জানিয়েছে, তারা মেডিক্যাল কলেজগুলোর শিক্ষার মান নিয়েও কিছু সুপারিশ ও পর্যবেক্ষণ প্রস্তুত করেছেন। যেসব বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ মানহীন, সেগুলোকে সময় ও সুযোগ দেয়ার সুপারিশ করা হবে। যাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) স্ট্যান্ডার্ডে পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু যেগুলো বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে নিজেদের মানোন্নয়ন করতে পারবে না সেগুলোকে বন্ধ করে দেয়ার সুপারিশ করা হবে।
সংস্কার কমিশন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কিছু ক্ষমতা দেয়ার পক্ষে মতামত দেবে যেন জরুরি প্রয়োজনে কিছু কেনাকাটা ও মেরামত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই করতে পারে। এই অনুমতি দেয়া হলে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নষ্ট অ্যাম্বুলেন্স মেরামত করে রোগীদের সেবা দিতে পারবে, নষ্ট মেশিনগুলো ঠিক করে ডায়াগনস্টিক করতে পারবে। এটা করা হলে বছরের পর বছর অ্যাম্বুলেন্স নষ্ট, মেশিন নষ্ট বলে এক্সরে হবে না অথবা ডায়াগনস্টিকের অন্যান্য যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকবে না। এতে করে রোগীদের চিকিৎসা হবে সময় মতো, অন্য দিকে রোগীদের বেশি টাকায় বেসরকারি ডায়াগনস্টিক থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আনার ঝামেলাও থাকবে না।