‘শনিবার দিন আইয়া ওই যে ৫-৬ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে প্রেসক্রিপশন লেইখা আনছি সেই অবস্থায় চলতিছে। এ ছাড়া আর কোনো ডাক্তার পাইলাম না। মাঝেমধ্যে নার্স আইসা ওষুধপানি দিয়া যায় কিন্তু ডাক্তার নাই। ডাক্তার পাইলে আমি ঠিক হইয়া যাইতাম।’
খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের বারান্দায় বিছানা পেতে শুয়ে এসব কথা বলছিলেন লিভার আক্রান্ত রোগী মোশাররফ হোসেন। প্রায় এক সপ্তাহ তিনি এখানে চিকিৎসাধীন। একইভাবে ভর্তি অন্য রোগীর স্বজনরা বলছেন, চারপাশে নোংরা পরিবেশ। হাসপাতালের মধ্যে হকাররা যেভাবে ঘোরে মাঝেমধ্যে মনে হয় হাসপাতালে আছি নাকি ফুটপাতে আছি। হাসপাতালে করিডর, মেঝেতে এত বাজে দুর্গন্ধ সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে যাবে।জানা যায়, ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপে খুমেক হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। ৫০০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার রোগী ভর্তি থাকে।
হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, ২৩ আগস্ট রোগী ভর্তি ছিল ২ হাজার ১২৯ জন। ২৮ সেপ্টেম্বর ২ হাজার ২৮ জন, ৬ অক্টোবর ২ হাজার ৭৩ জন, ১১ অক্টোবর ১ হাজার ৯৫৬ জন, ২৬ অক্টোবর ১ হাজার ৮৮৩ জন রোগী ভর্তি হয়। শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের বারান্দায় থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফনার্স হোসনেয়ারা খাতুন বলেন, ‘৫১৬ নার্সিং পদের মধ্যে ৩১ জন প্রেষণে অন্য হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন। শূন্য আছে আরও ১৭ পদ। তিন শিফটে হাসপাতালের ৪০ ওয়ার্ডে নার্স ভাগাভাগি করলে বড় একটি ওয়ার্ডে তিন-চার জন করে হয়। মেডিসিন ওয়ার্ডে চার শর বেশি রোগী প্রতিদিন ভর্তি থাকে। সে হিসাবে গড়ে এক শ রোগীকে সামলাতে হয় মাত্র একজন নার্সকে দিয়ে; যা এক প্রকার অসম্ভব। সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়।’
খুলনা নাগরিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক এস এম ইকবাল হোসেন তুহিন বলেন, ‘দীর্ঘদিন সরকারি নিয়োগ না হওয়ায় খুমেক হাসপাতালে চরম জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত রোগীর চাপে শয্যা না পেয়ে অনেককে হাসপাতালের ফ্লোর, বারান্দা, সিঁড়িতে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। আউটসোর্সিং দিয়ে জোড়াতালিতে চলছে পরিচ্ছন্নতার কাজ। হাসপাতালে অনুুমোদিত ২৭৮ চিকিৎসক পদের মধ্যে কিছু পদ শূন্য রয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ওয়ার্ডবয়, ক্লিনার ও অন্যান্য সহায়ক স্টাফের ২১২ পদের অধিকাংশই শূন্য।’
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ফাঁকা থাকা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর ঘাটতির কারণে সীমিত জনবল দিয়ে অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হয়। এ ছাড়া রোগীর ভিজিটর কন্ট্রোল একটা বড় হেডেক। শুধু প্যাশেন্ট এখানে টয়লেট ইউজ করছে না, তাদের যে অ্যাটেনডেন্স আছে সেটাও কিন্তু একটা হিউজ লোড। মাত্র ৩০-৪০ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মী দিয়ে পুরো হাসপাতাল ২৪ ঘণ্টা ক্লিন রাখা নট দ্যাট ইজি।’
খুমেক হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলাম বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণেই চিকিৎসক-নার্সদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়। স্টাফের লেভেলটা তো আরও কম।’ তিনি বলেন, ‘এটা তো আড়াই শ বেডের সেটআপ। প্রতি মাসে লোকবল ঘাটতির চিত্র ঢাকায় পাঠানো হয়। তবে এখানে নিয়োগের একটা ব্যাপার আছে। পাশাপাশি এ হাসপাতালটাকে ১৫০০ বেডের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। যদিও সেটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ১৫০০ বেডের অনুমোদন মিললে জনবল সংকট থাকবে না।’