হাম উপসর্গে ১১ মাসের রায়ানকে নিয়ে বাবা-মা কুমিল্লা থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছিলেন রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সরকারি হাসপাতালের নিয়ম মেনে টিকেট কেটে, চিকিত্সক দেখাতেও কাটে বেশ কিছু সময়। চিকিত্সক জানিয়ে দেন, শিশুটির জন্য জরুরি ভিত্তিতে পিআইসিইউ (শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) প্রয়োজন, যা ঐ হাসপাতালে নেই। শিশুর অভিভাবকদের জানা ছিল না, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে শিশুদের উপযোগী আইসিইউ নেই। এদিকে বেসরকারি হাসপাতালে উচ্চমূল্যের পিআইসিইউ সেবা নেওয়ার সামর্থ্যও ছিল না ঐ পরিবারের। ফলে শিশুকে নিয়ে অভিভাকদের ছুটতে হয় ঢাকা মেডিক্যালে কলেজ হাসপাতালে। রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি ঢাকা মেডিক্যালে পৌঁছোনোর আগেই শিশু রায়ান ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। ঘটনাটি ঘটে গত ৫ নভেম্বর বেলা আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে।
রায়ানের মতো শেষ মুহূর্তে নিবিড় পরিচর্যার জন্য রাজধানীতে আসা শিশুর ভাগ্যে এমন করুণ মৃত্যু প্রতিদিনই ঘটছে। রাজধানীতে মাত্র তিনটি সরকারি হাসপাতালে পিআইসিইউ রয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং মাতুয়াইল শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। তবে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও মাতুয়াইল ইনস্টিটিউটটি পুরোপুরি সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান।
পিআইসিইউ সেবা থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও শয্যাসংখ্যা রয়েছে অতি সামান্য। তথ্য বলছে, ঢামেক হাসপাতালে ১৭টি, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ১৬টি এবং মাতুয়াইল শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে পিআইসিইউ শয্যা রয়েছে ১০টি। এ নিয়ে ঢাকা শহরের তিনটি সরকারি-আধা সরকারি হাসপাতালে পিআইসিইউর শয্যাসংখ্যা মাত্র ৪৩টি। অথচ রাজধানী ঢাকায় ২৫টি বড় জেনারেল ও বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। যার মধ্যে চারটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও একটি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।
জানা যায়, পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে অননুমোদিত পাঁচটি পিআইসিইউ শয্যা সচল থাকলেও সেখানে নেই পর্যাপ্ত জনবল। এই পিআইসিইউ সংখ্যা হিসেবে নিলে রাজধানীতে শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের শয্যাসংখ্যা দাঁড়ায় ৪৮টি।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হেলথে প্রকাশিত ‘বিয়ন্ড ইমিউনিটি গ্যাপস :হেলথ-সিস্টেম কনস্ট্রেইন্টস অ্যান্ড মিজলস মর্টালিটি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, হামে প্রাণ হারানো ৭১ শতাংশ শিশুরই শেষ মুহূর্তে জীবন রক্ষাকারী আইসিইউ সুবিধা মেলেনি। তাদের হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটতে হয়েছে।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশু জন্মের পর ২৮ দিন বয়সি শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রকে বলা হয় নিওনেটাল ইনসেনটিভ কেয়ার বা এনআইসিইউ। আর এক মাস থেকে সাধারণত ১২ বছর বয়সি বা ৫০ কেজির কম ওজনের শিশুদের জন্য প্রয়োজন হয় পেডিয়াট্রিক আইসিইউ বা পিআইসিইউ। তারা বলছেন, সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি আইসিইউ শয্যার সংখ্যা বর্তমানে বেড়ে ৩ হাজারের কাছাকাছি হতে পারে। আর এসব শয্যার প্রায় ২৫ শতাংশ এনআইসিইউ হলেও পিআইসিউ শয্যা মাত্র ৩ শতাংশ। বাকি শয্যা পূর্ণবয়স্কদের জন্য।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. মো. নূরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, কোভিড থেকে শুরু করে হাম-ডেঙ্গু এ সময়ে আমাদের পিআইসিইউ এবং আইসিইউ এর চাহিদা অনেক বেড়েছে। সরকার বিভাগীয় শহরে আইসিইউ বাড়াতে কাজ করছে। আমাদের পাঁচ বিভাগে পাঁচটি শিশু হাসপাতাল উদ্বেধনের অপেক্ষায় রয়েছে। সেখানে পিআইসিইউ, এনআইসিইউ থাকবে। ইতিমধ্যেই লোকবল নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়েছে। বিভাগীয় পাঁচ শহরে এই হাসপাতালগুলো চালু হলে, রাজধানীতে চাপ কমে আসবে।