বন অধিদপ্তরে বদলি ও পদায়নে ঘুষের হার এলাকাভেদে ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত। গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান ও এনফোর্সমেন্ট অভিযানে এমন ঘুষবাণিজ্যের তথ্য উঠে আসে। কিন্তু দেড় বছর দুদকের সেই অনুসন্ধান রহস্যজনকভাবে আটকে আছে। এখনো তদন্তই শুরু হয়নি।
বন অধিদপ্তরে বদলি ও পদায়ন ক্ষেত্রে কোন পদে কত টাকা দিতে হবে, তা নির্ধারিত। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হিসেবে প্রথম শ্রেণির এলাকায় দুই বছরের জন্য পদায়ন পেতে দিতে হয় ৫০ লাখ টাকা। দ্বিতীয় শ্রেণির এলাকায় ৩০ লাখ এবং তৃতীয় শ্রেণির এলাকায় ২০ লাখ টাকা। রেঞ্জ কর্মকর্তা ও চেকপোস্টের স্টেশন কর্মকর্তাদের পদায়নেও রয়েছে নির্দিষ্ট ঘুষের দর। শুধু তাই নয়, নির্ধারিত মেয়াদ শেষে নতুন পদায়ন না পাওয়া পর্যন্ত দিতে হয় মাসোহারা। গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বন ভবনে অভিযান চালিয়ে এসব তথ্য ও নথি সংগ্রহ করে দুদক। অভিযানের পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সুপারিশ করা হয়।
ঘটনার দেড় বছরের বেশি সময় পর সেই অনুসন্ধানের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, সম্প্রতি কয়েকজন বন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তবে অনুসন্ধানসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিন্তু ঘুষের হার নির্ধারণসংক্রান্ত বিষয়টিতে মামলা হয়নি। মামলা হয়েছে বন অধিদপ্তরের ‘সাসটেইনেবল ফরেস্ট অ্যান্ড লাইভলিহুড’ বা সুফল প্রকল্পের দুর্নীতিসংক্রান্ত ঘটনায়। এদিকে পাখি আমদানির আড়ালে শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও নতুন অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক।
প্রধান বন সংরক্ষকের কার্যালয় থেকে শুরু করে বন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখবে সংস্থাটি। পাশাপাশি দেড় হাজার কোটি টাকার সুফল প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগেও দুদকের অনুসন্ধান চলছে।দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, বন অধিদপ্তরের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নথি যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের তথ্যানুযায়ী, বন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ এবং বদলি-পদায়ন ও পদোন্নতিতে দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি বন ভবনে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের আগে ২৩ ফেব্রুয়ারি এ-সংক্রান্ত নথি প্রস্তুত করা হয়েছিল। অভিযানে বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক আমির হোসাইন চৌধুরী, উপপ্রধান বন সংরক্ষক ও সুফল প্রকল্পের পরিচালক গোবিন্দ রায়সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদকের দল। সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন নথি ও তথ্য। দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৪ সালের বদলি নীতিমালা অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয় না। বনাঞ্চলের বিভিন্ন রেঞ্জ, স্টেশন ও বিভাগীয় বন বিভাগকে বনভূমির পরিমাণ অনুযায়ী প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এসব এলাকায় পদায়নের ক্ষেত্রে নির্ধারিত অঙ্কের টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে দুদক।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ঘুষের হার অনুযায়ী, দুই বছরের জন্য প্রথম শ্রেণির এলাকায় বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন পেতে দিতে হয় ৫০ লাখ টাকা। দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৩০ লাখ ও তৃতীয় শ্রেণিতে ২০ লাখ টাকা। একইভাবে দুই বছরের জন্য রেঞ্জ কর্মকর্তা পদে পদায়নে প্রথম শ্রেণিতে ১৫ লাখ, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ লাখ ও তৃতীয় শ্রেণিতে ৫ লাখ টাকা দিতে হয়।
চেকপোস্টের স্টেশন কর্মকর্তা হিসেবে এক বছরের পদায়নের ক্ষেত্রেও রয়েছে আলাদা দর। প্রথম শ্রেণির এলাকায় ২০ লাখ, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ লাখ ও তৃতীয় শ্রেণিতে ৫ লাখ টাকা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। দুদক সূত্র জানায়, রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদের দুই বছর এবং স্টেশন কর্মকর্তাদের এক বছরের পদায়নের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন পদায়ন না পাওয়া পর্যন্ত তাদের মাসোহারা দিতে হয়। বন অধিদপ্তরের দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে যুক্ত হয়েছে পাখি আমদানির আড়ালে শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ।
দুদক সূত্র জানায়, এ ঘটনায় বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষকের কার্যালয় থেকে শুরু করে উপবন সংরক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে। আমদানি প্রক্রিয়ায় কোনো কর্মকর্তা যোগসাজশ করেছেন কি না, কিংবা সরকারি দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিয়ে কেউ অর্থ পাচারে সহায়তা করেছেন কি না, তা অনুসন্ধানের আওতায় থাকবে।
এদিকে বন অধিদপ্তরের দুর্নীতির আরেকটি বড় অভিযোগ দেড় হাজার কোটি টাকার ‘সাসটেইনেবল ফরেস্ট অ্যান্ড লাইভলিহুড’ বা সুফল প্রকল্প ঘিরে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এ প্রকল্পের আওতায় বনায়ন, নার্সারি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা। কিন্তু প্রকল্পের আওতায় কাগজে কলমে বাগান সৃজন দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক জায়গায় গাছের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে দুদকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা যায়, কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা রেঞ্জের জোয়ারিয়ানালা বিটে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ৮৭২ হেক্টর এলাকায় নার্সারি ও বাগান সৃজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দুদকের প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, তৎকালীন রেঞ্জ কর্মকর্তা কে এম কবির উদ্দিন নিজের ক্ষমতাবলে নির্ধারিত এলাকায় বাগান সৃজন না করে বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। একই ধরনের অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৩৬২ হেক্টর বনায়ন কর্মসূচিতেও। টিয়াটিল্লার ঘাট থেকে ধলিরছড়া বিটের সীমানা হয়ে গুদাকাটার ঝিরি পর্যন্ত বাগান সৃজনের পরিকল্পনা থাকলেও অধিকাংশ এলাকায় চারা রোপণ করা হয়নি।