ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। সিটি করপোরেশন ও ইউপি নির্বাচনে এককভাবে প্রার্থী দেয়ার প্রস্তুতি, প্রার্থী সমঝোতা না হওয়া ও জোটের কর্মসূচিতে এনসিপি’র সীমিত অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে ১১ দলীয় ঐক্যে দেখা দিয়েছে ফাটল। বাড়ছে টানাপড়েন। একদিকে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার পক্ষে নয় এনসিপি’র একটি অংশ, অন্যদিকে দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এমন পরিস্থিতিতে জামায়াতের সঙ্গে জোটে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে এনসিপি’র ভেতরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। উভয় দলের শীর্ষ নেতারা জোটে দূরত্ব নেই বলে জানালেও ভেতরে চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ঢাকার দুই সিটিতে এনসিপি’র প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই জোটের ভেতরে তৈরি হয় নানা আলোচনা। এরই মধ্যে জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার বিরোধিতা করে দীর্ঘ এক পোস্টে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে বৃহস্পতিবার পদত্যাগ করেছেন এনসিপি’র প্রতিষ্ঠাকালীন নেত্রী ও যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনই এখন ১১ দলীয় ঐক্যের সংহতি ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্পর্কের বড় পরীক্ষা হয়ে উঠছে।
এনসিপি সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় নির্বাচনে জোটগত সমঝোতার ভিত্তিতে অংশ নিতে আগ্রহী দলটি। তবে জামায়াত তাতে রাজি নয়। এ অবস্থায় স্থানীয় নির্বাচনে পৃথকভাবে অংশ নিলে দুই দলের মধ্যে বিরোধ আরও বাড়তে পারে। তাই আগেভাগেই জামায়াতের জোট থেকে বেরিয়ে এককভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার পক্ষে মত দিচ্ছেন দলের বেশির ভাগ নেতা। জোটের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ সীমিত করার পাশাপাশি নিজেদের কর্মসূচি বাড়ানো এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের পরিকল্পনা করছে এনসিপি। বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতাদেরও দলে ভেড়াতে চেষ্টা করা হচ্ছে।
এনসিপি’র একাধিক নেতা বলেছেন, জামায়াত ও এনসিপি’র আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শন ভিন্ন। মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে জামায়াতের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও জোটের কারণে তা প্রকাশ্যে আনা যাচ্ছে না। এতে এনসিপি’র নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার পথে বাধা তৈরি হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও দলটিকে জামায়াতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এই পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসতে চান এনসিপি’র নেতাকর্মীরা।
জোটের কর্মসূচিতে এনসিপি’র অংশগ্রহণ নিয়েও তৈরি হয়েছে আলোচনা। চট্টগ্রাম ও রংপুর অভিমুখে আগের দু’টি লংমার্চে দলের আহ্বায়ক-সদস্য সচিবসহ শীর্ষ নেতারা অংশ নিলেও খুলনা অভিমুখের বিভাগীয় লংমার্চে তাদের দেখা যায়নি। যদিও যশোর ও কুষ্টিয়ার সমাবেশে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ও আব্দুল হান্নান মাসউদ এবং যুগ্ম সদস্য সচিব ফরিদুল হক অংশ নিয়েছিলেন।
এর আগে লংমার্চের আগের দিন রাজধানীর শাহবাগে গণবিক্ষোভের আয়োজন করে এনসিপি। সেখানে নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরেন দলের নেতারা।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করছে এনসিপি। দলের সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ও সাংগঠনিক উপ-কমিটির প্রধান সারজিস আলম স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় আগামী ৩০শে নভেম্বরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে আহ্বায়ক কমিটি গঠন এবং সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীদের তালিকা পাঠাতে বলা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, ইউনিয়ন আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়কের ন্যূনতম বয়স ৩৫ বছর এবং সদস্য সচিবের বয়স ৩০ বছর হতে হবে। ৩০ বছরের কম বয়সী কাউকে জেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যায়ের কোনো কমিটিতে রাখা যাবে না। প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে চেয়ারম্যান প্রার্থীর তালিকা ১০, ২০ ও ৩০শে নভেম্বরের মধ্যে তিন ধাপে পাঠানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেও পৃথক প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াত ও এনসিপি। ঢাকা উত্তরে জামায়াতের মহানগর উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে ডাকসু’র ভিপি আবু সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করেছে দলটি। অন্যদিকে এনসিপি উত্তরে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদের নাম ঘোষণার প্রস্তুতি রয়েছে এনসিপি’র। এই সিটিতে জামায়াতের প্রার্থী মহানগর জামায়াতের আমীর ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল জব্বার।
জোটে দূরত্ব নেই- বলছে দুই দল: জামায়াত ও এনসিপি’র নেতারা জোটের মধ্যে দূরত্বের বিষয়টি অস্বীকার করছেন। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মানবজমিনকে বলেন, ১১ দলীয় জোটের মধ্যে কোনো ধরনের সমস্যা, ভুল বোঝাবুঝি বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। জোটের সব দলকে সঙ্গে নিয়েই আমরা আন্দোলন ও কর্মসূচি পালন করছি। সবার দাবি এক ও অভিন্ন। সাত দফা দাবিতে চলমান কর্মসূচির মূল বিষয় সংস্কার। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে জোটের সব দল ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে জুবায়ের বলেন, স্থানীয় নির্বাচন কোনো দলের প্রতীকে হয় না। এটি প্রতীক ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রাথমিক ধারণার ভিত্তিতেই সব দল নিজ নিজ প্রস্তুতি নিচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে ঘোষণা দিচ্ছে এবং কাজ করছে। নির্বাচন ঘোষণা হলে মাঠের পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় আলোচনা করতে শীর্ষ নেতারা আবার বসবেন।
এনসিপি’র নীতিনির্ধারণী ফোরামের সদস্য ও যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার মানবজমিনকে বলেন, যারা এমন কথা বলছে, তারা আসলে সরকারি প্রোপাগান্ডার ফাঁদে পড়েছে। সরকার এটা দেখাতে চাচ্ছে যে, তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কিন্তু কোনো দূরত্ব তৈরি হয়নি। তারা জোটের কৌশলের অংশ হিসেবেই এতে অংশ নিয়েছেন।
তিনি বলেন, আমরা সব সময়ই নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি, এখনো চাইছি। এর সঙ্গে জোটের কোনো সম্পর্ক নেই। জোটের মধ্যে দূরত্ব বা ভুল বোঝাবুঝির যে কথা বলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভুয়া।
নির্বাচন প্রসঙ্গে সারোয়ার তুষার বলেন, নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুই পক্ষেরই স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনোভাবেই স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করাটা তাদের কাছে বেশি জরুরি। তারা জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচন করতে চান না। তবে এটিকে কেন্দ্র করে জোটের মধ্যে কোনো দূরত্ব তৈরি হয়নি।