বরিশালে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে প্রয়োজনের বাইরে সিজার করানোর অভিযোগ উঠেছে। যথাযথ তদারকির অভাবে কোনো কোনো ক্লিনিকে একজন গাইনি সার্জন দিয়ে দিনে ৮ থেকে ১০টি পর্যন্ত অস্ত্রোপচার করানোর তথ্যও পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একই চিকিৎসক একসঙ্গে একাধিক রোগীর অস্ত্রোপচার করায় প্রতিটি রোগীর প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দিতে পারেন না। এতে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী জটিলতা বাড়ার পাশাপাশি প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অস্ত্রোপচারের পর রোগীর পেটে গজ রেখে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। সম্প্রতি বরিশাল নগরীর চাঁদমারী এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর নাজিয়া রহমান মাইশা নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়। এ ঘটনা ঘিরে চিকিৎসাসেবা ও বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নগরীর বেসরকারি ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের এক মুখপাত্র জানান, সেখানে প্রতিদিন গড়ে ১০ জন প্রসূতির অস্ত্রোপচার হয়। একজন চিকিৎসককে দুপুরের পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একের পর এক অস্ত্রোপচার করতে হয়। নগরীর বেসরকারি রাহাত আনোয়ার হাসপাতাল, বেলভিউ হাসপাতাল, আরিফ মেমোরিয়াল হাসপাতাল, রয়াল সিটি হাসপাতাল, ফেয়ার হেলথ ক্লিনিকসহ নগরীর আরও কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও একই চিত্র বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
তাদের ভাষ্য, বড় হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি বি ও সি গ্রেডের কিছু ক্লিনিকে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এসব প্রতিষ্ঠানে অস্ত্রোপচারে দক্ষ সার্জন, পর্যাপ্ত নার্স, টেকনোলজিস্ট এবং জরুরি চিকিৎসা-ব্যবস্থাপনা নেই। চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন সার্জনকে দিনে ৮ থেকে ১০টি বড় অস্ত্রোপচার করতে হলে শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি তৈরি হতে পারে। এতে মনোযোগ কমে চিকিৎসাজনিত ভুলের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা থাকে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক বেসরকারি ক্লিনিকে পর্যাপ্ত জরুরি ব্যাকআপ বা নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা নেই।
একজন চিকিৎসক এক ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার শেষ করে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়ায় অস্ত্রোপচার-পরবর্তী সময়ে রোগীর পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে। এ নিয়ে তেমন কোনো তদারকি নেই। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের তথ্য উদ্ধৃত করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারা দেশে মোট সিজারিয়ানের ৮৪ শতাংশেরই উৎস বেসরকারি ক্লিনিক। আর বরিশাল বিভাগের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এই হার আরও আশঙ্কাজনক, যা প্রায় ৮৬ শতাংশে পৌঁছেছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী এ হার সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ রাখা উচিত।
এই লাগামহীন বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তবে চিকিৎসকদের দাবি, সিজারিয়ান সবসময় অপ্রয়োজনীয় নয়। মা বা শিশুর জীবন রক্ষায় চিকিৎসাগত প্রয়োজন অনুযায়ী সিজার করা জরুরি হতে পারে। মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ইমরান ইমু বলেন, সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় অনেকে ব্যাথা সহ্য করতে চায় না। স্বাভাবিক প্রসবে প্রসূতি ও সন্তানের ঝুঁকি থাকে। এ জন্য এখন সিজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন প্রসূতি ও স্বজনরা। তিনি যোগ করেন, সমস্যা দেখা দিলে করা যাবে, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত অস্ত্রোপচার করা যেন না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখবে হবে।
বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, প্রশিক্ষিত ও দক্ষ চিকিৎসকরাই অস্ত্রোপচার করবেন। প্রসবকালীন সিজারের জন্য গাইনোকলজিস্ট, অ্যানেসথেটিস্ট, নার্স ও টেকনোলজিস্টের সমন্বয়ে একটি টিম থাকা প্রয়োজন। অস্ত্রোপচার-পরবর্তী জটিলতা মোকাবিলার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে এসব সুবিধা রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। একজন চিকিৎসক প্রতিদিন কতটি অস্ত্রোপচার করতে পারবেন-এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো বাধ্যবাধকতা বর্তমানে নেই বলেও জানান তিনি।
এদিকে বরিশাল জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত মাসে জেলার ১১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে সাতটিতে কোনো সিজারিয়ান হয়নি। বাকি চারটি প্রতিষ্ঠানে মোট ৪৭ জন প্রসূতির সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসবও প্রচুর হয়েছে। গত এক মাসে জেলার ১১ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ৩৬১ জন প্রসূতি স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। এখানে উল্লেখ্য, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অধিকাংশতেই সিজারিয়ান অপারেশনের ব্যবস্থা নেই। সরকারি চিকিৎসক ইমরান ইমু বলেন, তার উপজেলায় সিজার করানোর মতো চিকিৎসক নেই। গত সেপ্টেম্বরে উপজেলায় ৯০ জন প্রসূতি স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন, অস্ত্রোপচারের তথ্য যাচাই, দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা এবং অস্ত্রোপচার-পরবর্তী পর্যবেক্ষণ জোরদার করা গেলে অপ্রয়োজনীয় সিজার ও চিকিৎসাজনিত ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. রেফায়েতুল হায়দার বলেন, কয়েকদিন আগে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালকদের নিয়ে সভা হয়েছে। সেখানে সেবাব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয় তাদের জানানো হয়েছে। অস্ত্রোপচারে দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্ট রয়েছে কি না এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা পদ্ধতি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা মনিটরিং করা হবে।