শ্রমিক অসন্তোষের আগুনে পুড়ছে পোশাকখাত। আন্দোলনের নামে একটি মহল ও নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের (আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট) নেতাকর্মীরা দেশে অস্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করেেছ। এতে দেশের পোশাক খাতের রফতানি বা উৎপাদনকেই বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং এর ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ ও সহযোগী সেবা খাতের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যখন গার্মেন্টস কারখানার উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়ে বা মহাসড়কগুলোতে দীর্ঘ অবরোধ সৃষ্টি হয়, তখন সুতা-কাপড় সরবরাহকারী থেকে শুরু করে পরিবহন চালক এবং স্থানীয় ছোট-বড় রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীÑ সবাই মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। বোতাম, জিপার, হ্যাঙ্গার, কার্টন এবং লেবেল তৈরির মতো হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যাকওয়ার্ড শিল্প সরাসরি পোশাক খাতের অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল। কারখানা বন্ধ থাকলে এই এক্সেসরিজ সাপ্লাই চেইন পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে।
পোশাকখাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, শ্রমিক আন্দোলনে একদিনে ক্ষতি ৪৫ মিলিয়ন ডলার (৫০০ কোটি টাকার বেশি) বলা হলেও বাস্তবে দেশের ক্ষতি আরো কয়েক গুণ। এদিকে সরকারের গঠন করা মজুরি বোর্ড কাজ শুরু করার পরও আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন-এফবিসিসিআই। এই আন্দোলন শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত নয় এমন দাবি তাদের। অথচ এর জেরে পোশাক খাতের ক্ষতি ছাড়িয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকায়। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতায় নতুন ক্রয়াদেশ হারানোর পাশাপাশি রফতানিতে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এমন আশঙ্কা অর্থনীতিবিদের। তাদের মতে, শ্রমিক অসন্তোষ, কারখানায় হামলা-ভাঙচুর ও সড়ক অবরোধে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে পোশাকশিল্প। বারবার এমন পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ইমেজ ক্রমাগত ক্ষুণœ হচ্ছে। বাড়ছে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকি। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে নতুন ক্রয়াদেশ, রফতানি আয়, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে।
এদিকে তৈরী পোশাকের শীর্ষ রফতানিকারক এবং বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশ ক্রমে পিছিয়ে পড়ছে। এদের মধ্যে চীন তার বৈশ্বিক বাজার ধরে রাখতে মূল্যছাড়ের কৌশল নিয়েছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তান উচ্চমূল্যে পোশাক রফতানির পাশাপাশি মোট রফতানিও বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরো শক্ত করেছে। সেখানে বাংলাদেশ রক্ষণশীল অবস্থান নিয়ে সামান্য প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে আগের অবস্থান কোনোমতে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম চলতি বছরের প্রথম আট মাসে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই রফতানি ৪২ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। এর মাধ্যমে দেশটি চীন ও মেক্সিকোকে পেছনে ফেলে নিজেদের বৃহত্তম পণ্য উদ্বৃত্তসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য অংশীদার করে তুলেছে।
মজুরি বাড়ানোর দাবিকে ঘিরে রাজপথসহ শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন ঘিরে উত্তপ্ত রফতানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরী পোশাক খাত। নতুন বেতন-ভাতা নির্ধারণে মজুরি বোর্ড কাজ শুরু করার পরও শ্রমিক অন্তোষের যৌক্তিক কারণ দেখছে না এফবিসিসিআই। এই আন্দোলনের ধরন ও সহিংসতা দেখে প্রশাসক জানিয়েছেন, এটা শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার স্বাভাবিক প্রতিফলন নয়। পোশাক শিল্প মালিকদের দাবি, কয়েক দিনের টানা আন্দোলনে পাঁচ শতাধিক কারখানার উৎপাদন বন্ধের ফলে ক্ষতি ছাড়িয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকা। সহসাই অসন্তোষ না থামলে নতুন ক্রয়াদেশ বাতিলের পাশাপাশি রফতানি কমার শঙ্কা বিশ্লেষকদের। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পোশাক শিল্পে সংকট মানে শুধু কারখানা মালিকের লোকসান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের জীবিকা। তাই অসন্তোষ নিরসনে দ্রুত মজুরি নির্ধারণের তাগিদ বিশ্লেষকদের।
বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শ্রমিক অসন্তোষের জেরে কারখানা বন্ধ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রতিদিন পোশাক খাতে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বেশি উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। তিনি বলেন, মজুরি কাঠামো নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন, শিল্পাঞ্চলগুলোতে (যেমনÑআশুলিয়া, গাজীপুর, সাভার, নারায়াণগঞ্জ) কিছু কারখানায় হামলা ও ভাঙচুরের ফলে উৎপাদন স্থগিত ছিল। এর ফলে সময়মতো শিপমেন্ট (শিপমেন্ট) বা পণ্য সরবরাহ বিঘিœত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমর্যাদা ও ক্রেতাদের আস্থার সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সময়মতো পণ্য না পাওয়ার অজুহাতে মূল্যের ওপর ছাড় বা ডিসকাউন্ট দাবি করছেন এবং নতুন অর্ডার দেয়ার ক্ষেত্রে ধীরনীতি অবলম্বন করছেন, যা পোশাক খাতের জন্য একটি দ্বিমুখী সংকট সৃষ্টি করবে।
এদিকে মজুরি বোর্ড চলতি মাসেই মজুরি নির্ধারণ করবে এবং শ্রমিকরা নতুন মজুরি পাবে। কিন্তু নানা অজুহাত ও ষড়যন্ত্রে এখনই আন্দোলন থামছে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, মজুরি বোর্ডের ঘোষণার পরও শ্রমিকরা বলবে তাদের চাহিদা অনুযায়ী হয়নি, এভাবে আন্দোলনে নামবে। একই সঙ্গে কিছুদিন পরপর এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্প বন্ধ হতে বাধ্য। মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে বিদেশি ক্রেতারা তাদের উদ্বেগ জানিয়েছেন। অর্ডার স্থানান্তরের আলোচনাও চলছে।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, একটা কথা শ্রমিকদের মনে রাখতে হবেÑ শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প না বাঁচলে শ্রমিক বাঁচবে না। আন্দোলনে উৎপাদন ক্ষতি হয়তো পুষিয়ে নেয়া যাবে। কিন্তু দেশের ইমেজ সংকটের দায় কে নেবে জানতে চান তিনি।
সূত্র মতে, তৈরী পোশাকের রফতানিকারক তালিকার পেছনে থাকা দেশগুলো দিনে দিনে বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ শ্রমিক আন্দোলন, পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের ষড়যন্ত্র, ভারতে পলায়নকারী স্বৈরাচার হাসিনার ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরা নিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শ্রমিক আন্দোলনের নামে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র দেশের রফতানি তথা অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে ফেলছে। শিল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তৈরী পোশাক খাতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলো যখন আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে, তখন দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। চলমান অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে শুধু তাৎক্ষণিক উৎপাদন ক্ষতিই নয়, দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের বাজার অন্য দেশের দখলে চলে যেতে পারে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অস্থিরতার প্রভাব এখন কারখানার সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সিদ্ধান্তেও পড়তে শুরু করেছে। বিদেশি ক্রেতারা উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের সময়সূচি জানতে চাইছেন। কোনো কোনো ক্রেতা আগামী ২ মাসের ক্রয়াদেশ কমানোর চিন্তা করছেন। এমনকি বাংলাদেশের কিছু ক্রয়াদেশ ভারত, পাকিস্তানসহ প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যাওয়ার তথ্যও জানিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, রফতানিমুখী পোশাক খাতে একদিনের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অর্থ শুধু ওই দিনের পণ্য উৎপাদন না হওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কাঁচামাল, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ-গ্যাস, ব্যাংক ঋণের সুদ, জাহাজীকরণ এবং ক্রেতার নির্ধারিত সময়সীমা। উৎপাদন পিছিয়ে গেলে পরবর্তী ক্রয়াদেশের কাজও বাধাগ্রস্ত হয়। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে বাড়তি খরচে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হয়। অন্যথায় ক্রেতার কাছ থেকে মূল্যছাড় বা ক্রয়াদেশ বাতিলের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। একবার কোনো ক্রেতা অন্য দেশে উৎপাদন সরিয়ে নিলে তা আবার বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। বিশ্বের তৈরী পোশাকের বাজারে বাংলাদেশ এককভাবে ব্যবসা করছে না।
ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও ক্রেতা আকর্ষণে প্রতিযোগিতা করছে। বিশেষ করে উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহের সক্ষমতা এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা রয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে বারবার উৎপাদন বন্ধ, সড়ক অবরোধ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যায়। ক্রেতারা শুধু পণ্যের দাম বিবেচনা করেন না, নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাওয়া যাবে কি না, কারখানার উৎপাদন অব্যাহত থাকবে কি না এবং শ্রমিক অসন্তোষের কারণে সরবরাহব্যবস্থা বিঘিœত হবে কি না, তাও বিবেচনায় নেন।
তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক তৈরী পোশাকের বাজার ২০২৫ সালে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ সম্প্রসারিত হলেও সেই বাড়তি বাজারের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে বৈশ্বিক তৈরী পোশাকের বাজার ছিল ৫৪৫ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার। সে সময় বিশ্বের পোশাক রফতানির ৩১ দশমিক ৭১ শতাংশ ছিল চীনের দখলে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের বাজার অংশীদারিত্ব ছিল ৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা ভিয়েতনামের ছিল ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। এছাড়া ভারতের অংশ ছিল ২ দশমিক ৯৬ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
পাঁচ বছর পর ২০২৫ সালে বৈশ্বিক পোশাক বাজারের আকার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারে। তবে এই সময়ে চীনের বাজার অংশীদারিত্ব কমে ২৭ দশমিক ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশের অংশও কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশে। বিপরীতে ভিয়েতনামের বাজার অংশীদারিত্ব বেড়ে ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশে পৌঁছেছে এবং দেশটি বাংলাদেশের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। ভারতের অংশ বেড়ে ৩ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ২ দশমিক ১ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ১ দশমিক ৭৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজার ধরে রাখতে দেশটি মূল্যছাড়ের নীতি অনুসরণ করেছে। বিপরীতে ভিয়েতনামের মূল্য বেড়েছে ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ভারতের ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ মূল্য বেড়েছে। বাংলাদেশের রফতানি বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ, যা প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম।
খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক পোশাক বাজারে শুধু কম দামে বেশি পণ্য রফতানির প্রতিযোগিতা নয়; বরং উচ্চমূল্যের ও মূল্য সংযোজনভিত্তিক পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এ বাস্তবতায় পণ্যে বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, নকশা উন্নয়ন এবং উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে দ্রুত অগ্রসর হতে না পারলে বাংলাদেশের জন্য বৈশ্বিক বাজারে অবস্থান ধরে রাখা আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের শেয়ার কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিট তৈরী পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক। তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে তৈরী পোশাকের সার্বিক পরিস্থিতি কিছুটা খারাপ হলেও বাংলাদেশের বাজার হারানোর হার অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। পরবর্তী মাসগুলোর চিত্রে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে। এর পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের মন্দাভাবের পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নীতিগত ও কৌশলগত দুর্বলতাই বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে বর্তমান শ্রমিক আন্দোলন পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করছে।
এ বিষয়ে তৈরী পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের কাক্সিক্ষত মাত্রায় কোনো অগ্রগতিও হয়নি। আমরা মূলত আগের অবস্থানেই স্থির রয়েছি। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে বিভিন্ন দেশের যে মার্কেট শেয়ার (বাজার অংশীদারত্ব) বেড়েছে, তার একটি বড় অংশ এসেছে চীন থেকে সরে যাওয়া ব্যবসা থেকে।
পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং শুল্কের প্রভাবে মার্কিন ক্রেতারা এখন ব্যাপকভাবে চীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এর ফলে নতুন উৎস খোঁজার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা। চীনের এ বাজার হারানোর সরাসরি সুফল পাচ্ছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। কিন্তু চীন থেকে স্থানান্তরিত হওয়া এই বিপুল বাণিজ্যের সুবিধা অন্য দেশগুলো যেভাবে লুফে নিতে পেরেছে, বাংলাদেশ তা পারেনি।
এর প্রধান কারণ হিসেবে মহিউদ্দিন রুবেল প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের সক্ষমতার ঘাটতিকেই দায়ী করেন। একটি দেশের বাজার ধরতে বা বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য যে ধরনের কার্যকর বিপণন, উন্নত অবকাঠামো, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার প্রয়োজন হয়, আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো তা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। আর এ কারণেই আমরা প্রতিযোগিতায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছি।
আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের তৈরী পোশাকের অবস্থান ধরে রাখতে এবং অভ্যন্তরীণ সংকট কাটিয়ে উঠতে দ্রুত নীতিগত ও কৌশলগত পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক। একই সঙ্গে বর্তমান শ্রমিক অসন্তোষ দ্রুত কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে বেশ কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন এই ব্যবসায়ী নেতা। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে দ্রুত সময়ের মধ্যে আমাদের আগ্রাসী বিপণন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে হবে। বাংলাদেশ এখনো হাতেগোনা কয়েকটি প্রচলিত পোশাক তৈরি ও রফতানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কৃত্রিম তন্তু বা ‘ম্যান-মেড ফাইবার’ভিত্তিক পোশাক উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, এই খাতে আমাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, কাজগুলো অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে একবার যে অংশ আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, তা সহজে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।