⇒ আরও বেশি দুর্বল করতে এসব করা হচ্ছে - অপরাধ বিশেষজ্ঞ
⇒ মনোবল ভাঙাই লক্ষ্য প্রস্তুতি রাখতে হবে - সাবেক আইজিপি
⇒ আক্রান্তের চেষ্টা হলেই কঠোর ব্যবস্থা - ডিবি প্রধান
রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ও সংঘর্ষের সময় দলছুট হয়ে পড়েন কনস্টেবল মো. সাইমন। এ সময় আন্দোলনের মধ্যে থাকা নাশকতাকারীরা ওই পুলিশ সদস্যকে ঘিরে ধরে বেধড়ক মারধর করেন এবং তার কাছ থেকে সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নেন। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত মঙ্গলবারের ওই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ সদস্যকে মারধর করা কেউ শ্রমিক নন বলে জানায় পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার সকালে কুর্মিটোলায় মোটরসাইকেল নিয়ে শোডাউন ও মিছিল করার সময় পুলিশের একটি টহল গাড়িতে ককটেল নিক্ষেপ করেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। এতে এক পুলিশ সদস্য আহত হন। একই দিন রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের ৩ নম্বর গেটের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
পুলিশকে টার্গেট করে শুধু এ ঘটনাগুলোই নয়, পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বারবার হামলার শিকার হচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। কোথাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ, কোথাও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আহত করা হচ্ছে। আবার কোথাও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া হচ্ছে। ভাঙচুর করা হচ্ছে পুলিশ বক্স। রাজধানীর মিরপুর, সাভারের হেমায়েতপুর, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও নাশকতার ঘটনায় পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন। সাভারে ওসির গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই পুলিশকে টার্গেট করে এসব হামলা চালানো হচ্ছে। কারণ পুলিশ আবার দুর্বল হয়ে গেলে নিষিদ্ধদের আসল টার্গেট বাস্তবায়ন সহজ হবে।
এর আগে চলতি বছরের আগস্টে নাশকতা আশঙ্কায় সারা দেশে পুলিশকে সতর্ক থাকতে বলা হয়। এমনকি দু-একটি রেঞ্জ ও মেট্রোপলিটন পুলিশও অধীনস্ত সদস্যদের উদ্দেশে বিশেষ সতর্কবার্তা দেয়। যা তখন ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। আগস্টে কিছু ঝটিকা মিছিল ও ককটেল হামলা করা হলেও সেপ্টেম্বরে সেটি চরম আকার নেয়। রাজধানীজুড়ে ককটেল হামলা ও বাসে অগ্নিসংযোগ শুরু হয়। যাত্রাবাড়ী থানার সামনে পরপর ৫টি ককটেল বিস্ফোরণ ও কাফরুল থানার সামনে বাসে আগুন দিয়ে পুলিশের মধ্যে ভীতি ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়। যে চেষ্টা আর থামেনি। যতই সময় গেছে নানাভাবে পুলিশকে আক্রমণ করা হচ্ছে। সবশেষ পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে ঢাল বানিয়ে পুলিশকে ও বাহিনীর স্থাপনাকে টার্গেট করা হচ্ছে।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শিল্পাঞ্চলে পুলিশ আক্রান্ত শুরু হওয়ার পর আবারও নতুন করে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর। সেই সঙ্গে নাশকতায় অর্থদাতা, ইন্ধনদাতা ও উসকানিদাতাদের তালিকা করা হয়েছে। আরও নতুন কোনো ইস্যুকে সামনে রেখে নাশকতাকারীরা যাতে তৎপর হতে না পারে সেজন্য প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনতে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে পুলিশ, ডিবি, এসআরবিসহ বিভিন্ন ইউনিট নাশকতায় সংশ্লিষ্ট নিষিদ্ধ দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করেছে। শিল্পাঞ্চল ছাড়া অন্য কোথাও নতুন করে কেউ তৎপর হচ্ছে কি না তা গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে সারা দেশে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে ৪৪০টি। এর মধ্যে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ৪২টি করে ঘটনা ঘটেছে। মার্চে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩টিতে। এপ্রিলে তা আরও বেড়ে ৬৬টিতে পৌঁছায়, যা ৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। মে মাসে ৫৫, জুনে ৪৯, জুলাইয়ে ৪২, আগস্টে ৪১ ও সেপ্টেম্বরে ৪০টি ঘটনা ঘটেছে।
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, গত ১ নভেম্বর রাজধানীর মিরপুরে শ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের ওপর হামলা ও নাশকতার ঘটনা ঘটে। এ সময় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয় এবং পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। ঘটনাস্থল থেকে বিস্ফোরিত ককটেলের অংশ ও পেট্রোলভর্তি দুটি প্লাস্টিকের বোতল উদ্ধার করা হয়। একই দিন মিরপুর-১০ গোলচত্বরে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীদের ইটপাটকেল নিক্ষেপে সামিয়া নামের এক নারী পুলিশ সদস্য আহত হন। ভাঙচুর করা হয় ট্রাফিক পুলিশ বক্স। একই দিন গাজীপুরের কোনাবাড়ী ও মৌচাক এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
গত ৩ নভেম্বরর মিরপুর-১১ এলাকায় ফের পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। গত ৩১ অক্টোবর সাভারের আশুলিয়ার কাঠগড়া বাজার, নয়াপাড়া, জিরাবো ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। সংঘর্ষে শিল্পপুলিশের অন্তত ছয় সদস্য আহত হন। একই দিন বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়ক থেকে তিনটি বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করে শিল্পপুলিশ। গত ৪ নভেম্বর সাভারের হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড় ও উলাইল এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলমের ব্যবহৃত গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। সংঘর্ষে ওসি সাইফুল আলম গুরুতর আহত হন। সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৫০ জন আহত হন। গত ৩ নভেম্বর গাজীপুরের ভোগড়া, নাওজোড়, মৌচাক ও পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় পুলিশ ও শ্রমিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। গত ৩ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় শ্রমিকদের সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়।
অপরাধ বিশ্লেষক মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমোনলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যখন কোনো আন্দোলন, অবরোধ বা বিক্ষোভ করা হয়, তখন পুলিশই থাকে আন্দোলনকারীদের প্রধান প্রতিপক্ষ। যেহেতু বর্তমান পুলিশকে অনেকেই ভঙ্গুর মনোবলের বলে মনে করে, সেজন্য পুলিশকে আরও বেশি দুর্বল করতে টার্গেট করা হচ্ছে। কারণ পুলিশকে প্রতিহত করতে পারলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা আসল টার্গেটের পথ সুগম হয়।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ এখনো কাক্সিক্ষতভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। পোশাকশ্রমিক আন্দোলনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েনের পরেও পুলিশকে বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও দোকানে আশ্রয় নিতে দেখা গেছে। যারা এরকভাবে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের ভাষ্য জীবনের চেয়ে চাকরি বড় নয়। অর্থাৎ দাঙ্গা মোকাবিলায় পুলিশকে আরও প্রশিক্ষিত করতে হবে। অ্যাকশন নয়, ডায়ালগের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া শিখতে হবে। অন্যথায় সামনের দিনগুলো আরও চ্যালেঞ্জিং হবে।
সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়ায় অনেকেই ভাবছে পুলিশ এখনো দুর্বল। তাদের আরও দুর্বল করতে পারলে দেশকে আরও অস্থিতিশীল করা সহজ হবে। মূলত এই একটি কারণেই নিষিদ্ধ একটি দলের নেতা-কর্মীরা পুলিশকে টার্গেট করছে। তিনি আরও বলেন, সরকারের ক্ষমতার বড় একটি পিলার হচ্ছে পুলিশ। সুতরাং পুলিশ দুর্বল থাকা মানে সরকারকে চাপে রাখা সহজ হবে। এজন্য আক্রমণ করতেই হবে বলে ভাবছে ওই নিষিদ্ধ দলের লোকজন। এসব হামলা প্রতিরোধে পুলিশকে আরও পূর্ব প্রস্তুতি রাখতে হবে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মাঠ পর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে আইনের মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। ঊর্ধ্বতন মহল থেকে কঠোর নির্দেশনাও আছে কোনো অবস্থাতেই পেশাদারির বাইরে যাওয়া যাবে না। পুলিশ পেশাদারি বজায় রাখলেও আন্দোলনের মাঝে মিশে থাকা একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে পুলিশকে আক্রমণের চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, যদি কেউ অন্যায়ভাবে পুলিশের ওপর আক্রমণ করে ভীতি সঞ্চারের চেষ্টা করে থাকে, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।