Image description

রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে চলছে অস্ত্রের দাপট। এই তিন পার্বত্য জেলায় শক্তির মহড়া দিচ্ছেন পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। আধিপত্য বিস্তার করে চাঁদাবাজি আর অপহরণই তাদের মূল লক্ষ্য।  এতে বাড়ছে খুনাখুনি, পড়ছে একের পর এক লাশ। এসবে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পাহাড়। সশস্ত্র গ্রুপগুলোর রক্তের নেশায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সেখানকার সাধারণ অধিবাসীদের মধ্যে।

সরেজমিনে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির প্রত্যন্ত কয়েকটি এলাকায় গেলে স্থানীয়রা জানান, আতঙ্কের মধ্যে দিনযাপন করতে হচ্ছে তাদের। সন্তানরা বেড়ে উঠছে গোলাগুলি আর রক্তপাতের মধ্য দিয়ে। এর বাইরে রয়েছে টোকেনের মাধ্যমে চাঁদা। যা আয় হয় তার একটি অংশ দিতে হয় সশস্ত্র গ্রুপের সদস্যদের। তারা সেই টাকা দিয়ে অস্ত্র কেনে আর তা তাক করা হয় তাঁদের দিকেই। জীবনের          নিরাপত্তার জন্য দুই গ্রুপকে চাঁদা দেওয়ার নজিরও রয়েছে। তারা জানান, কে কোন এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখে চাঁদা তুলবেন তা নিয়েই মূলত বিরোধ দুই সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে। গোয়েন্দাদের তথ্যমতে-তিন পার্বত্য জেলা থেকে বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।

বর্তমানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের দুটি সশস্ত্র সংগঠন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) উত্তপ্ত করে রেখেছে পাহাড়কে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, এসব আঞ্চলিক সংগঠনের কাছে ছোট অস্ত্রের পাশাপাশি অনেক ভারী অস্ত্র মজুত রয়েছে। স্নাইপার রাইফেলের মতো অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র এখন তাদের হাতে। এ ছাড়াও যুক্ত হয়েছে নাইট ভিশন ক্যামেরা। এর বাইরে সক্রিয় উপজাতি সন্ত্রাসীদের হাতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মরণঘাতী অস্ত্র, বিমান বিধ্বংসী অস্ত্র এবং রকেট লঞ্চার, গ্রেনেড, একে-৪৭, ম্যাগাজিন, এম-৪ কার্বাইন, ৪০ এমএম গ্রেনেড লঞ্চার, চায়না রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তল, এসএলআর, এসএমজি, এলজি, বিমান বিধ্বংসী রিমোট কন্ট্রোল বোমা, গ্রেনেড, হেভি মেশিনগান, জি-৩ রাইফেল।

সম্প্রতি রাঙামাটির সাজেকে দুই গ্রুপ নতুন করে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ শুরু করায় ফুঁসে উঠেছে তিন পার্বত্য জেলার সশস্ত্র সংগঠনগুলো। সাজেকের চলমান অস্থিরতায় একদিকে জনজীবনে চরম ভোগান্তি নেমে এসেছে, অন্যদিকে সংকটে পড়েছে পর্যটনকেন্দ্রিক কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান। থমকে গেছে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক পর্যটন ভ্যালি। স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইউপিডিএফ ও জেএসএস এর মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। চাঁদা আদায়সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুই সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা ও শতাধিকবার গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও পর্যটন খাতে। মাহিন্দ্র, সিএনজি, চান্দের গাড়ি, রেস্তোরাঁ, আবাসিক হোটেলসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই খাতের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অবরোধ ও অস্থিরতার কারণে তাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। তারা বলেন, অবরোধকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে পার্বত্য জনসংহতি সমিতিকে (পিজেএসএস) উৎখাতের দাবি থাকলেও একই ধরনের সশস্ত্র সংগঠন হিসেবে পরিচিত ইউপিডিএফকে উৎখাতের দাবি নেই। বর্তমানে পুরো পার্বত্য এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

উত্তপ্ত পার্বত্য এলাকার পরিস্থিতি প্রসঙ্গে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পাহাড়ে  সশস্ত্র গ্রুপগুলো নতুন করে সাজেকে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। তাদের দমনে সেখানে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন। আমরা সেখানে শান্তির পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করছি। বিগত কয়েক বছরে পাহাড়ে সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে এক হাজারের বেশি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী।

উত্তপ্ত পাহাড়ের পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান। বর্তমানে তিনি মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) এবং আর্মি ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (আইবা) প্রফেসর অ্যাডজাঙ্কট বা চুক্তিভিত্তিক অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো বিভিন্ন সশস্ত্র আঞ্চলিক গোষ্ঠীর অব্যাহত কার্যক্রম এবং তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতার পুনরুত্থান। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র সংঘাতের অবসান। তবে দীর্ঘ সময় পরও অস্ত্র ধারণ, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে। তবে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের চেষ্টা থাকলেও কার্যকরী কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো শক্তি, সমর্থন বা অবস্থান তাদের নেই। রাজনৈতিকভাবে এই বিষয়গুলো সমাধান জরুরি। তবে পাশাপাশি জানমালের নিরাপত্তায় শক্ত সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা প্রয়োজন বলে মনে করি।

আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাহাড়ে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফেরাতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং এ সশস্ত্র গ্রুপগুলোর চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি বন্ধ করা জরুরি। তা না হলে সাধারণ পাহাড়বাসী ও বাঙালিদের জীবনের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে।