Image description

হরমুজ প্রণালিতে চলমান ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) রপ্তানিকারক দেশ কাতার এখন তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই বৃহত্তম এলএনজি আমদানিকারক দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। এশিয়া এবং ইউরোপের দেশগুলো সব সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কাতার থেকেই এলএনজি আমদানিতে আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা ইরানকে যতটা ক্ষতি করেছে তার বেশি কাতারের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে।

জ্বালানিবিষয়ক আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট ওয়েলপ্রাইস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির সংকট কাতারের এলএনজি রপ্তানির বিশাল অংশ বাধাগ্রস্ত করেছে। চলতি বছরের মার্চে কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি ‘কাতার এনার্জি’-এর স্থাপনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রপ্তানি সক্ষমতার ১৭ শতাংশ অকেজো হয়ে পড়ে। এর ফলে বার্ষিক আয়ে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়। এ ঘটনার পর সাত মাস পেরিয়ে গেলেও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি চালান পাঠানোর হার মারাত্মকভাবে কমে গেছে। সীমিত উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখা দেশটির জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ কাতারের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের এলএনজির চুক্তি রয়েছে। সময় মতো এসব দেশে এলএনজি সরবরাহ না করতে পারলে কাতারকে হাজার হাজার কোটি ডলার জরিমানা দিতে হবে।

এ পরিস্থিতি সামাল দিতে কাতার এনার্জি কিছু দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময়ের জন্য ‘ফোর্স মেজার’ বা অনিবার্য পরিস্থিতির ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ এশিয়ার বেশ কিছু দেশে চলতি নভেম্বর পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহ করতে পারছে না কাতার। গত এপ্রিলে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পর থেকেই এ সংকট শুরু হয়। এ ধারাবাহিকতায় নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে কাতারের সুনামও এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

কাতার এনার্জির প্রেসিডেন্ট ও সিইও এবং কাতারের জ্বালানিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সাদ শেরিদা আল-কাবি জানিয়েছেন, তেলের মতো এলএনজি পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিবহন করা সম্ভব নয়। এলএনজি আবদ্ধ পাত্রে পরিবহন করতে হয়। অথবা গ্যাস হিসেবে পরিবহনের পর গ্রহণকারীকে টার্মিনালে নিয়ে তা পুনরায় তরলীকৃত করতে হয়। গত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ‘কাতার ইকোনমিক ফোরাম স্পেশাল এডিশন’-এ তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কাতার স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করতে প্রস্তুত।

তবে বাজারের একমাত্র পথ অবরুদ্ধ থাকায় ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এড়াতে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদকদের কাছ থেকে এলএনজি আমদানির দুটি পৃথক দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে কাতার। এর অংশ হিসেবে মার্কিন কোম্পানি ‘শেনিয়ার’-এর সাবিন পাস ও কর্পাস ক্রিস্টি রপ্তানি কেন্দ্র থেকে প্রতি বছর সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টন এলএনজি কেনা হবে। ২০৩১ থেকে ২০৫৪ সাল পর্যন্ত এ চুক্তি কার্যকর থাকবে। এ ছাড়া উডসাইড এনার্জির লুইজিয়ানা এলএনজি প্রকল্প থেকে প্রতি বছর ৩০ লাখ টন এলএনজি কেনার আরও একটি চুক্তি হয়েছে, যা ২০৩০ সাল থেকে ২০ বছর মেয়াদে কার্যকর হবে।

কাতার এনার্জির আল-কাবি বলেন, এ অতিরিক্ত পরিমাণ এলএনজি সংগ্রহের ফলে কাতার এনার্জি যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানিকারক বৃহত্তম প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। স্বল্পমেয়াদে হরমুজ প্রণালির বিষয়টি বিবেচনায় না থাকলেও এবং দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার অনিশ্চয়তা থাকায়, কাতার তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এলএনজি সংগ্রহের মাধ্যমে নিজেদের সরবরাহব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করছে।