বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কেএম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে তার বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশাকে ফের ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে তদন্তকারীরা। তার মৃত্যুতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও প্রকাশের কোনো যোগসূত্র আছে কি না তা-ও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
একই সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় প্রেমের সম্পর্ক কিংবা অন্য কোনো বিরোধ কাজ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার তাহসিফের বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশাকে আরও তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলামের আদালত এ আদেশ দেন। এদিন প্রথম দফায় চার দিনের রিমান্ড শেষে দিশাকে আদালতে হাজির করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। তবে শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের আগের দিন রাতে দিশার সঙ্গে উত্তরা নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট ও সিপি ফাইভ স্টার রেস্তোরাঁয় যান তিনি। সেখানে তারা একসঙ্গে সময় কাটান। হত্যাকাণ্ডে দীপ ও দিশার সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তাদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
দিশা রিমান্ডে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিচ্ছেন দাবি করে আরও সাত দিনের রিমান্ডের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন পিপি। তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার ভিডিও ধারণ করে সাহসের সঙ্গে পাবলিশড করেন তাহসিফ। তিনি ভিডিও ধারণ না করলে মানুষ জানত না হাসিনা কীভাবে পালিয়ে গেছেন, রহস্য থেকে যেত। ভিডিও প্রকাশের জন্য তার বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র আছে কি না এবং প্রেমের কোনো বিষয়টা আছে কি না, সবকিছু নিয়ে তদন্ত চলছে।’
তদন্ত কর্মকর্তার রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম দফায় চার দিনের রিমান্ডে দিশাকে বিভিন্ন কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ সময় তিনি ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য দিয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে দিশা জানান, ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফের সঙ্গে উত্তরা নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলেন। ওই দিন সন্ধ্যায় একাধিকবার সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকসেও খাবার খান তারা। এ ছাড়া তাহসিফের সঙ্গে মোটরসাইকেল গ্যারেজে যাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে বাইকে ঘোরাঘুরির কথাও জানিয়েছেন দিশা।
আবেদনে আরও বলা হয়, দিশার কাছ থেকে পাওয়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তদন্তের স্বার্থে গোপন রেখে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে তিনি একাধিক প্রশ্নের উত্তর কৌশলে এড়িয়ে গেছেন এবং নীরবতা পালন করেছেন। ফলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তাকে আরও নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
তদন্ত কর্মকর্তার মতে, মামলার আরেক সন্দেহভাজন আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রিমান্ডে রয়েছেন। দিশা ও দীপের দেওয়া বক্তব্যের মধ্যে মিল-অমিল যাচাই করা জরুরি। এ ছাড়া তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনায় দিশার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তে এ ঘটনায় দিশার সম্পৃক্ততার তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে রিমান্ড আবেদনে।
দিশার দ্বিতীয় দফার রিমান্ড আবেদনে মূলত সাতটি বিষয় সামনে এনেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। ঘটনার দিন উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রুআপ কমপ্লেক্সে সিপি ফাইভ স্টার রেস্তোরাঁয় তাহসিফ ও দিশার মধ্যে কোনো আবেগপ্রবণ কথাবার্তা বা বাক্বিতণ্ডা হয়েছিল কি না, তা জানতে চান তারা।
একই দিন নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে তাদের মধ্যে কোনো কথাকাটাকাটি হয়েছিল কি না, সেটিও যাচাই করা হবে। এ ছাড়া ঘটনার দিন বা তার আগে দুজনের সম্পর্কে কোনো টানাপোড়েন চলছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে চান তদন্তকারীরা।
পাশাপাশি মামলার মূল রহস্য উদঘাটন, অজ্ঞাতনামা অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, আলামত উদ্ধার এবং দিশা ও দীপের বক্তব্যের মধ্যে মিল-অমিল যাচাইয়ের জন্য পুনরায় রিমান্ড প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে দিশার পক্ষে আইনজীবী ইমাম হোসেন জাবেদ রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, তাহসিফ ও দিশা আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। ঘটনার দিন তারা একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে যান। রাত ১২টার দিকে তাহসিফ দিশাকে বাসায় পৌঁছে দেন। তাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি বা সম্পর্কের অবনতি হলে তাহসিফ তাকে বাসায় পৌঁছে দিতেন না।
আইনজীবী আরও বলেন, মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেছেন, রাত ১টার দিকে তাহসিফকে ফোন করা হয়েছিল। তিনি তখন জানান, ৩০ মিনিট পর বাসায় ফিরবেন। দিশাকে শুধু ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে এবং রাত ১২টার পর থেকে তাহসিফের সঙ্গে তার আর যোগাযোগ ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি। এসব যুক্তিতে দিশার জামিন চান তার আইনজীবী। তবে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তাকে ফের তিন দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেন।
উল্লেখ্য, শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাত ২টার দিকে রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে দিশাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এর আগে গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সাউরির ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। আগের দিন ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় ‘দীপের ডাকে’ বাসার নিচে নেমে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলেন তাহসিফ।