Image description

কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসের কুশীলবরা সবাই খোয়াব (স্বপ্ন) দেখেন। শরাফত খোয়াব দেখেন আরো বেশি ভূ-সম্পত্তির মালিক হওয়ার; আবদুল কাদের স্বপ্ন দেখেন স্বাধীন পাকিস্তানের; তমিজ স্বপ্ন দেখেন এক টুকরো ধানী জমির। বগুড়া জেলার কিছু মানুষের জীবনচিত্র নিয়ে রচিত উপন্যাসটি যেন হয়ে উঠেছে বাঙালি জাতির খোয়াবনামা।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পালায়ন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর কিছু ছাত্র সমন্বয়ক, রাজনৈতিক দল, সুশীল, বুদ্ধিজীবী সবাই ক্ষমতায় যাওয়ার খোয়াব দেখতে শুরু করেছেন।

ক্ষমতায় যাওয়ার খোয়াব চূড়ান্ত করতে কেউ ‘আগে সংস্কার পরে নির্বাচন’ কেউ ‘সংখ্যানুপাতিক হারে নির্বাচন’ কেউ ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন’ দাবি করে দেশের সার্বিক পরিবেশ ঘোলাটে করার চেষ্টা করছেন। সেনাপ্রধানের সতর্কবার্তায় তাদের খোয়াবনামায় বিঘœ ঘটার উপক্রম হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাড়ে ৬ মাসের মাথায় সেনাপ্রধানের দেয়া বক্তব্য টক অব দ্য কান্ট্রি। প্রধান উপদেষ্টা দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের সম্ভাব্য ট্রাইমফ্রেম জানান দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন ডিসেম্বরে নির্বাচন করতে পারবেন এবং তার আগে স্থানীয় নির্বাচন করা সম্ভব নয় বার্তা দিয়েছেন। তারপরও অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ দীর্ঘাদিত করতে এবং সম্ভাব্য নতুন দলের প্রস্তুতি ও পতিত আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনে সময় দেয়ার লক্ষ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় না থাকায় বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না, শিল্প-অর্থনীতির দুরবস্থা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মানুষের মধ্যে ভীতি-আতঙ্ক; এর মধ্যেই বিভিন্ন দল, গোষ্ঠী নিজেদের সুবিধামতো পরিবেশ সৃষ্টি করতে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি করে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার খোয়াব দেখছেন। দেশের চালচিত্রের এই অবস্থা; তখন ২৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর রাওয়া কনভেনশন হলে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বক্তৃতায় সতর্কবার্তা দেন। সব পক্ষকে তিনি কাদা ছোড়াছুড়ি না করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘নিজেরা কাদা ছোড়াছুড়ি, হানাহানিতে লিপ্ত থাকলে দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হবে। আমরা দেশে একটা ফ্রি, ফেয়ার অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ইলেকশনের দিকে ধাবিত হচ্ছি। আমি যতবারই প্রধান উপদেষ্টা ড. মহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেছি, তিনি নির্বাচন ইস্যুতে সম্পূর্ণভাবে একমত হয়েছেন। দেয়ার শুড বি ফ্রি, ফেয়ার অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ইলেকশন অ্যান্ড দ্যাট ইলেকশন শুড বি উইদিন ডিসেম্বর, অর ক্লোজ টু দ্যাট’। বক্তৃতার বডি লেঙ্গুয়েজ বলে দেয় তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সেনাপ্রধানের এই বক্তব্য কার্যত টক অব দ্য কান্ট্রি। গণমাধ্যম তার বক্তব্য ফলাও করে প্রচার করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক হচ্ছে, তোলপাড় চলছে। সেনাপ্রধানের বক্তব্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন অনেকেই। নেটিজেনদের বেশির ভাগ সেনাপ্রধানের বক্তব্য সাহসী এবং সময়োপযোগী হিসেবে অভিহিত করলেও কেউ কেউ কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। ডিসেম্বরে দেশে একটা ফ্রি, ফেয়ার নির্বাচনের সাধুবাদ জানালেও ‘ইনক্লুসিভ ইলেকশন’ বলতে কি বুঝিয়েছেন সেটা জানতে চাচ্ছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় নেটিজেনদের কেউ বলছেন, ইনক্লুসিভ ইলেকশন বলতে সব দলের অংশগ্রহণে (২০১৪-২০১৮-২০২৪ সালের মতো নয়) বুঝিয়েছেন। তবে অনেকেই বলছেন, সেনাপ্রধান কী ‘ইনক্লুসিভ ইলেকশন’ শব্দে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন?

শেখ হাসিনা ভারতে পালানোর পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। ড. ইউনূস জানিয়েছেন, ক্ষমতা গ্রহণের ‘প্রথম অধ্যায়’ শেষ করে ‘দ্বিতীয় অধ্যায়’ শুরু করেছেন। এই অধ্যায়ে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে সংবিধান, নির্বাচন, জনপ্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, পুলিশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কার এবং নির্বাচন প্রশ্নে ঐকমত্য চাচ্ছেন। অথচ দিল্লির ইন্ধনে পর্দার আড়াল থেকে নানা ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা চলছে।

জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে এখন বিভক্তি, তিক্ততা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে। এ পরিস্থিতি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা করে সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমি আপনাদের সতর্ক করছি, আপনারা যদি নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে কাজ না করতে পারেন, নিজেরা যদি কাদা ছোড়াছুড়ি করেন, মারামারি-কাটাকাটি করেন; এ দেশ এবং জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে। আমি আজকে বলে দিলাম, নইলে আপনারা বলবেন আমি আপনাদের সতর্ক করিনি। আমি সতর্ক করে দিচ্ছি আপনাদের।’ এ সময় তিনি সেনাবাহিনী যে অনন্তকাল ব্যারাকের বাইরে থাকবে না জানিয়ে বলেন, ‘আজকে একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই। আমার অন্য কোনো আকাক্সক্ষা নেই। আমার একটাই আকাক্সক্ষাÑ জাতিটাকে একটা সুন্দর জায়গায় রেখে ছুটি নেওয়া। ড. মুহাম্মদ ইউনূস যতটুকু পারছেন সাহায্য করছেন দেশকে ইউনাইটেড রাখার।’ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে সহযোগিতার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমার মনে হয় আমরা নির্বাচনের দিকেই ধাবিত হচ্ছি, ১৮ মাসের কথা বলেছিলাম। ডিসেম্বরের মধ্যে একটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রত্যাশা করছি।’

নির্বাচনের সময়সীমা ইস্যুতে বিরাজমান পরিস্থিতিতে এই বক্তব্যের মাধ্যমে সেনাপ্রধান যেমনিভাবে সবাইকে উপদেশ দিয়েছেন, তেমনি যারা বিতর্কিত কর্মকা-ে জড়িয়েছেন, তাদের সমালোচনা করে সতর্কও করেন। তার এই বক্তব্য সচেতন মহলে ঘটিয়েছে ভাবনার উদ্রেক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন পরিসরে বিশ্লেষণ হচ্ছে। সেনাপ্রধানের বক্তব্য রাজনীতিবিদদের জন্য যেমন বার্তা, তেমনি অন্যদের জন্যও সতর্কতা। ‘চুন খেয়ে মুখ পুড়ে দই দেখলেই ডরায়’ প্রবাদের মতো অনেকের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে আলোচিত ‘ওয়ান-ইলেভেন’-এর মতো সেনা শাসিত সরকার আসার আশঙ্কা আছে। সে ক্ষেত্র তৈরি লক্ষ্যে হঠাৎ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। কিন্তু সেনাপ্রধান তার ‘অন্য কোনো আকাক্সক্ষা নেই’ বক্তব্যে সেটা পরিষ্কার করেছেন।

সেনাপ্রধানের বক্তব্য পরিষ্কার এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় এটাকে ‘সাহসী উচ্চারণ’ বলছে। তবে নেটিজেনরা এ নিয়ে নানান মন্তব্য করছেন, বক্তব্য দিচ্ছেন। বেশির ভাগ নেটিজেন আশঙ্কা করেছেন সেনাপ্রধান ‘ইনক্লুসিভ ইলেকশন’ বলতে নির্বাচনে পতিত আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের ইঙ্গিত করেছেন কি না? তবে কেউ কেউ লিখেছেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের মতো হাসিনার পাতানো এক্সক্লুসিভ নির্বাচনের মতো এবারের নির্বাচন যাতে না হয় সেটার ব্যাপারে অংশগ্রহণকে ‘ইনক্লুসিভ ইলেকশন’ শব্দের ব্যবহার করেছেন। অনেকেই যেহেতু ‘ইনক্লুসিভ ইলেকশন’ শব্দটির মাধ্যমে সেনাপ্রধান আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার আশঙ্কা করছেন সে কারণে সেনাপ্রধানের উচিত বিষয়টি পরিষ্কার করা। সোশ্যাল মিডিয়ায় তৌহিদ হোসেন নামের একজন লিখেছেন, ‘সেনাপ্রধানের বক্তব্য সময়ের সাহসী উচ্চারণ। নির্বাচন ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে; তখন তিনি পরিষ্কার করে সকলকে ঐক্যবদ্ধতা ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন’। সোহেল হায়দার নামের ্একজন লিখেছেন, ‘অনেকের আশঙ্কা দেশে বিশৃঙ্খলা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটিয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতায় বসবে। সেনাপ্রধান সেটাও স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আমার অন্য কোনো আকাক্সক্ষা নেই। সেনাবাহিনী যে অনন্তকাল ব্যারাকের বাইরে থাকতে পারবে না’। এতে বোঝা যায় সেনাশাসন আসছে না।

সেনাপ্রধানের বক্তব্যের পর এক অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আমাদের শক্তি। সবসময় দেখেছি, জাতির দুঃসময়ে তারা এগিয়ে আসে। সবাই ধৈর্য ধরবেন, ঐক্যবদ্ধ থাকবেন। দেশের সব মানুষকে আহ্বান জানাই, কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে, তর্ক-বিতর্ক বন্ধ করে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকুন। জাতির ঐক্যবদ্ধ থাকার মধ্য দিয়ে আমরা একটি কাক্সিক্ষত জায়গায় পৌঁছতে পারি’। ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে প্রবাসী অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খান সামি লিখেছেন, ‘দেশের সেনাপ্রধান তো আর বিড়াল না যে মিঁউ মিঁউ কইরা কথা বলবেন। তিনি সৈনিক, সৈনিকের মতোই কথা বলবেন’। সোশ্যাল মিডিয়ায় নেটিজেনদের অনেকেই বলছেন, সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের ৫ আগস্টের ভূমিকা জাতি মনে রাখবে। ৫ আগস্টের আগে হাসিনা নির্দেশনা দেয়ার পর পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবি গুলি করে ছাত্র-জনতা হত্যা করলেও সেনাবাহিনী মানুষের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করেছিল। এ জন্য মানুষ সেনাপ্রধানকে মনে রাখবে। তবে সেনাপ্রধানের উচিত ‘ইনক্লুসিভ ইলেকশন’ বলতে তিনি কি বুঝিয়েছেন তা পরিষ্কার করা।