
প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকট সারা দেশেই। দিন দিন এটি আরও প্রকট হচ্ছে। এ অবস্থায় দেশজুড়ে ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। দিন দিন এলপি গ্যাস বা সিলিন্ডার গ্যাসের বাজার বড় হচ্ছে। তবে সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার বাড়তে থাকলেও এর নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিতের উদ্যোগে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। সেই ঘাটতি পূরণে যে ধরনের তদারকি দরকার তাও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
এক্ষেত্রে তদারকির দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান বিস্ফোরক পরিদপ্তর বলছে, জনবল সংকটের কারণে তারা নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। এমন প্রেক্ষাপটে যথাযথ তদারকির অভাবে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। প্রায়ই দেশের বিভিন্ন স্থানে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিস্ফোরণের ফলে আগুনে দগ্ধ হয়ে প্রাণহানিও ঘটছে। তবে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীরা বলছেন, কখনো সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয় না। বরং বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটছে গ্যাস লিকেজ থেকে। মূলত সিলিন্ডার থেকে কানেক্টিং পাইপ, চুলার রাবার কিংবা রেগুলেটরের ত্রুটি থেকে গ্যাস লিকেজ হচ্ছে। সেখান থেকে এক পর্যায়ে বিস্ফোরণ হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে, গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৭০৪টি। এর মধ্যে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের ঘটনা ৪৪টি। এই সময়ে গ্যাস লিকেজ থেকে আগুনে আহত হন ৮ জন। সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আহত হন ৫৩ জন আর প্রাণ হারান ৮ জন। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়েছে; কিন্তু আগুন ধরেনি—এমন ঘটনা আছে ৯টি। এসব বিস্ফোরণে আহত হন দুজন ও প্রাণ হারান তিনজন।
সর্বশেষ গত ১৪ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সাভারের আশুলিয়ায় একটি আবাসিক ভবনে গ্যাস বিস্ফোরণে শিশুসহ অন্তত ১১ জন দগ্ধ হন। এর আগে ৯ ফেব্রুয়ারি মাদারীপুরে গ্যাস সিলিন্ডারের পাইপ ফেটে (লিকেজ) বিস্ফোরণে দগ্ধ হন একই পরিবারের তিনজন। তার আগে ১১ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর-রামগতি রুটে চলাচলকারী আল-মদিনা পরিবহন গ্রিনলিফ ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার সময় হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই একজনের মৃত্যু হয়। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক এস এম আনছারুজ্জামান দেশের বাইরে থাকায় এ বিষয়ে কথা বলা যায়নি।
তবে বিস্ফোরক পরিদর্শক ড. মো. আসাদুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে এটা না যে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হচ্ছে। বরং ব্যবহারের অজ্ঞতার কারণে গ্যাস লিকেজের কারণেই বেশি বিস্ফোরণ ঘটে। তদারকি নিয়ে অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সত্য বলতে, শুধু ঢাকা নয়, পুরো ঢাকা বিভাগের জন্য আমরা ৭ জন পরিদর্শক রয়েছি। শুধু ঢাকা সিটি করপোরেশেন এলাকাতেই তদারকি করা এই জনবলের পক্ষে অনেক কঠিন। সেখানে বিভাগজুড়ে পরিদর্শন করা অসম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকাতে ঠিকমতো তদারকি হয় না। আমরা জনবল বাড়াতে তিন বছর আগে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব জমা দিয়েছি। ওই প্রস্তাবে ঢাকা বিভাগকে তিনটি জোনে ভাগ করে তদারকির কথা বলা হয়েছে; কিন্তু প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন এলপি গ্যাসের বাজার অনেক বড় হয়েছে। তাই বিস্ফোরক অধিদপ্তরকেও আরও সমৃদ্ধ করতে হবে।’ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সাবেক সভাপতি ও ইস্ট-কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী এ প্রসঙ্গে কালবেলাকে বলেন, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হওয়ার সুযোগ নেই। একটা সিলিন্ডারের মেয়াদ থাকে ১০ বছর। ১০ বছর পর পুনরায় ওই সিলিন্ডার সব ধরনের মেজারমেন্ট ঠিক করে আরও ১০ বছর ব্যবহার করা যায়। এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পুরোনো হচ্ছে বিপিসির এলপিজি প্লান্ট। ২০-২৫ বছর হয়েছে। আর বেসরকারি খাতে এলপি কোম্পানিগুলোর বয়স ৭-৮ বছর। ফলে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয় না। ব্যবহারবিধি সম্পর্কে সচেতন না হওয়ায় দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনা কমাতে কী করা উচিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্যাপকভাবে সচেতনতা প্রোগ্রাম করতে হবে। টেলিভিশন, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচারণা চালাতে হবে। এ ছাড়া যারা নিয়ম ভাঙবে তাদের জরিমানা করতে হবে। তাহলেই দুর্ঘটনা কমে আসবে। এজন্য বিইআরসিকে পদক্ষেপ নিতে হবে। একই কথা বললেন ফ্রেশ এলপি গ্যাসের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রেজা।
তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয় না। ব্যবহারে অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। নিম্নমানের সিলিন্ডার, হোস পাইপ লিকেজ, নিরাপত্তাবিধি না মানার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনা কমাতে হলে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিস্ফোরক অধিদপ্তরকে আরও সক্রিয় হতে হবে। সবচেয়ে বেশি দরকার সচেতনতা বিষয়ে কার্যক্রম বাড়ানো। এ খাতে কর্মরত একাধিক কেমিকৌশল প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত এলপি গ্যাস ২ শতাংশ ও লাইনের প্রাকৃতিক গ্যাস ৫ শতাংশ বাতাসের সংস্পর্শে এলেই বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হয়। লাইনের গ্যাসের চেয়ে ১০-১২ গুণ চাপ কম থাকে সিলিন্ডার গ্যাসে। ফলে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হলে ক্ষয়ক্ষতি খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। তারা বলেন, বাসাবাড়িতে বেশিরভাগ ঘটনাই গ্যাস লিকেজ থেকে ঘটছে। মূলত সিলিন্ডার থেকে কানেক্টিং পাইপ, চুলার রাবার কিংবা রেগুলেটরের ত্রুটি থেকে গ্যাস লিকেজ হচ্ছে। তা হয়তো বদ্ধঘরে জমা হচ্ছে। এক পর্যায়ে বৈদ্যুতিক স্পার্ক বা কোনোভাবে আগুন লেগে বিস্ফোরণ ঘটছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার, অব্যবস্থাপনা ও অবৈধ ব্যবহারের ফলে বিপদ বাড়ছে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে অনেক ব্যবসায়ী অনুমোদন ছাড়া নিজেরাই সিলিন্ডার ভরে গ্যাস বিক্রি করছেন। এটাকে বলা হচ্ছে, ‘ক্রস ফিলিং’। এটি অনিরাপদ। কারণ, এলপিজি কোম্পানিগুলোতে আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরা হয়। সিলিন্ডার পরীক্ষা করে বাল্ব ও সেফটি ক্যাপ বসানো হয়। আর ক্রস ফিলিংয়ে বাল্ব বসানো হয় হাতের সাহায্যে। তাই সিলিন্ডার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এ ছাড়া পরিবহনের সময় সিলিন্ডার কাত করে রাখলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। ট্রাকে তোলার সময় অনেক সময় শ্রমিকরা সেটি ছুড়ে দেন। এতে সিলিন্ডারের নিরাপত্তা বেষ্টনী দুর্বল হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি দুর্ঘটনার আরও একটি কারণ হলো এলপিজি সিলিন্ডারের দুর্ঘটনার বড় কারণ মানহীন রেগুলেটর ও পাইপের ব্যবহার। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের তথ্য বলছে, এলপিজি সিলিন্ডারজনিত ১০টি ঘটনার মধ্যে ৭টিই রেগুলেটর-সংক্রান্ত। সাধারণত সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয় না। বিস্ফোরণ ঘটে সিলিন্ডারের অন্য যন্ত্রাংশে। রেগুলেটরি অন্যান্য যেসব যন্ত্রাংশ বাজারে পাওয়া যায়, তার অধিকাংশই নিম্নমানের। এ ছাড়া সিলিন্ডার রাখা হয় চুলার একদম কাছে। ব্যবহারের পর ঠিকমতো বন্ধও করা হয় না অনেক ক্ষেত্রে। ফলে গ্যাস লিকেজ হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। এলপি গ্যাসের ব্যবসায়ীরা জানান, বড় প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর সিলিন্ডারের মেয়াদ থাকে ২০-৩০ বছর। এই মেয়াদকালে তিনবার সিলিন্ডারের নিরাপত্তা পরীক্ষা হয়—প্রথমে ১০ বছর, দ্বিতীবার ২০ বছর, সর্বশেষ পাঁচ বছর পর। এ ছাড়া প্রতিবার গ্যাস ভরার সময় ‘হাইড্রো টেস্ট’ করানো হয়। সমস্যা দেখলে সেই সিলিন্ডার বাতিল ঘোষণা করা হয়। যানবাহনে দুর্ঘটনার জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার দায়ী বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ব্যাপক চাহিদার কারণে অননুমোদিত সিএনজি রূপান্তর প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যেখানে অদক্ষ কারিগর দিয়ে গাড়ির রূপান্তর কার্যক্রম চলে, যা ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তিনি আরও বলেন, নিয়মিত পরীক্ষা না করার কারণেও সিলিন্ডার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে সিলিন্ডারের ভেতরে ক্ষয় হয়। এই ক্ষয় থেকেও ঘটতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা। এ জন্য নিয়মিত সিলিন্ডার পরীক্ষা করা উচিত। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে দেড় থেকে দুই লাখ মানহীন সিলিন্ডারযুক্ত গাড়ি চলছে। গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ে সিলিন্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও বিস্ফোরণ ঘটে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, দুর্ঘটনা ঘটে সিলিন্ডারের মানহীন সংযোগ থেকে। অনেক ক্ষেত্রে নকল সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়, যার বিস্ফোরণ ঘটে সহজেই।
ব্যবহারের অজ্ঞতায় গ্যাস লিকেজের কারণেই বেশি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। সত্য বলতে, শুধু ঢাকা নয়, পুরো ঢাকা বিভাগের জন্য আমরা ৭ জন পরিদর্শক রয়েছি। ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকাতেই তদারকি করা এই জনবলের পক্ষে অনেক কঠিন। সেখানে বিভাগজুড়ে পরিদর্শন করা অসম্ভব ড. মো. আসাদুল ইসলাম, বিস্ফোরক পরিদর্শক