সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী মাইশা মুশফিরাতের জানাজা সম্পন্ন হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অনুষ্ঠিত এই জানাজায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ হাজারো মানুষ অংশ নেন। প্রিয় শিক্ষার্থীকে শেষ বিদায় জানাতে গিয়ে পুরো এলাকায় এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
জীবনের কী নিষ্ঠুর পরিণতি! যে ক্যাম্পাসে বই হাতে হেঁটে যাওয়ার কথা ছিল, যে শ্রেণিকক্ষে সহপাঠীদের সঙ্গে স্বপ্ন বোনার কথা ছিল, সেখানেই তাকে ফিরতে হলো নিথর দেহে, কাফনে মোড়ানো কফিনে। সকালে যে মহাসড়কে লরির ধাক্কায় উল্টে যাওয়া মিনিবাসের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান এই তরুণী, বিকেলে সেই সড়কেই হাজারো মানুষের অশ্রুসিক্ত বিদায় পান তিনি। সামনে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স, চারপাশে শোকার্ত স্বজন, শিক্ষক ও সহপাঠীদের ভিড়—সব মিলিয়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
জানাজায় অংশ নেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বিপিএম, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক এবং সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলামসহ প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ ছাড়া মাইশার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক লায়ন আসলাম চৌধুরী এফসিএ। জানাজা শেষে মরহুমার রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
এর আগে মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বিপরীতে ডালাস পেট্রোল পাম্পসংলগ্ন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে একটি লরির ধাক্কায় একটি লোকাল মিনিবাস উল্টে শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে। এতে গুরুতর আহত মাইশাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই দুর্ঘটনায় আরও এক শিক্ষার্থী আহত হন।
নিহত মাইশা মুশফিরাত মীরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বটকাটিয়া গ্রামের সাখাওয়াত হোসেন ও সালমা আক্তার দম্পতির মেয়ে। উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই সেই স্বপ্ন নিভিয়ে দেয়।
এদিকে দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও সীতাকুণ্ডজুড়ে শোকের পাশাপাশি তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সহপাঠী হারানোর শোক ও নিরাপদ যাতায়াতের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ, দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, স্পিডব্রেকার স্থাপন এবং নিহত ও আহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণসহ আট দফা দাবি জানান তারা।
অবরোধের কারণে সড়ক ও রেল যোগাযোগে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। পরে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। প্রশাসনের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও শিক্ষার্থী এই মহাসড়ক পারাপার হলেও সেখানে নিরাপদ পারাপারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। মাইশার মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, এটি প্রধান ফটকের সামনে নিরাপদ যাতায়াতের বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কেবল শোক প্রকাশ ও আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীদের আট দফা দাবি বাস্তবায়ন এবং মহাসড়কে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
মাইশা আর কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে ফিরবেন না। তবে যে সড়ক তার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, সেই সড়কেই হাজারো মানুষের অশ্রুসিক্ত বিদায় ও সদ্ধাঞ্জলি সংশ্লিষ্টদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন রেখে গেল—শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে আর কত প্রাণ ঝরতে হবে