
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার অন্যতম দোসর মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) থেকেই কয়েক শ কোটি টাকার মালিক হয়েও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। দুদক চেয়ারম্যান থাকাবস্থায় মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ সব অভিযোগ ও মামলার তদন্ত শুরু করতেন শেখ হাসিনার নির্দেশে। সেই নির্দেশে বড় বড় ব্যবসায়ী ও ব্যাংক মালিকদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেন।
দুদক সূত্র জানায়, তিনি যেসব বড় ব্যবসায়ী ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান এবং মামলার তদন্ত শুরু করেছিলেন, সেসবের অনেকটিরই ভিত্তি নেই। এর বেশির ভাগই রাজনৈতিক উদ্দেশে করা হয়েছে। যে কারণে এসব ভুয়া মামলা শেষ করতে এখন হিমশিম খাচ্ছে দুদক। ফলে পট পরিবর্তনের পর প্রকৃত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারছে না সংস্থাটি। সততার মুখোশধারী ভয়াবহ দুর্নীতিবাজ ও শেখ হাসিনার অন্যতম দোসর মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ এখনো নিরাপদেই আছেন। শুধু নিরাপদেই নয়, দেশের ভিতরে থেকে শেখ হাসিনার পক্ষ নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন বলেও জানা গেছে। কক্সবাজারের ভূমি অধিগ্রহণের সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকার দুর্নীতির অনুসন্ধানে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপি, নেতাসহ সরকার ঘনিষ্ঠ আমলাদের জড়িত থাকার দালিলিক প্রমাণ পায় দুদক। এরপর সেই দুর্নীতিবাজদের তথ্য ধামাচাপা দেন দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ। দুদক সূত্র জানায়, ভূমি অধিগ্রহণে সুবিধাভোগী সিন্ডিকেটের হোতা সাবেক সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। কক্সবাজার দুদকের সাবেক কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিনের অভিযানে দালাল ও সরকারি কর্মকর্তারা একের পর এক ধরা পড়েন। এতে ওই সিন্ডিকেটের অনিয়মে বাধা পড়ে। এরপরই তারা শরীফ উদ্দিনকে দমানোর ষড়যন্ত্র করে। এক পর্যায়ে দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ, কমিশনার (তদন্ত) জহুরুল হককে হেলালুদ্দীনের মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের টাকা দেন। এর বিনিময়ে শরীফ উদ্দিনকে কোনো কারণ দর্শানো নোটিস ছাড়াই চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, শরীফকে অপসারণ করতে ৫০ কোটিরও বেশি টাকা দেওয়া হয় সেই কমিশনকে।
জানা যায়, এরপরই দুদক কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিনের অপসারণের আদেশে ৩ ও ৫ নম্বর অনুলিপিতে জেলা প্রশাসক চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে দেওয়া হয়। শরীফকে অপসারণের পর ভূমি অধিগ্রহণের সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকার দুর্নীতির অনুসন্ধানটি ধামাচাপা পড়ে আছে গত ৫ বছর ধরে।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, শরীফ উদ্দিন রোহিঙ্গাদের এনআইডি ও পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলায় কক্সবাজারের চারজন জনপ্রতিনিধিকে গ্রেপ্তার করেন। এরপর তাদের ভাগবাঁটোয়ারায় বড় ধরনের আঘাত লাগে। তখন থেকেই কক্সবাজারের স্থানীয় সিন্ডিকেটের লোকজন হেলালের মাধ্যমে দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। তবে দুদক থেকে শরীফকে অপসারণের পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা চার্জশিট দেওয়া হয়নি। সবই করা হয়েছিল তৎকালীন কমিশনের নির্দেশে।
কক্সবাজারের দুদক কার্যালয় সূত্র জানায়, দুদকের তৎকালীন কমিশন কক্সবাজারের বিভিন্ন মেগা প্রকল্প থেকে মাসোহারা পেতেন। চট্টগ্রামের কেজিডিসিএলের গ্যাস কানেকশন জালিয়াতির মামলায় সাবেক প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির ছেলেকে গ্রেপ্তার করতে দুদক থেকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। দুদক কর্মকর্তা শরীফ মামলাটি করলেও কমিশন পরে তার মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। কিন্তু আদালত সেই প্রতিবেদন গ্রহণ না করে শরীফের এফআইআরকে কগনিজেন্স হিসেবে আমলে নেন। তখনই প্রমাণিত হয়- শরীফের তদন্ত সঠিক ছিল। মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন তৎকালীন কমিশন ৫ কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে এফআইআরটি দিয়েছিল। পরে তারাই নিম্ন আদালতের কগনিজেন্সের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে আপিল করেন, যা এখনো স্থগিত হয়ে আছে। ২০১৯ সালে ক্যাসিনোসম্রাটসহ ১০০ জনের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে নামে দুদক। সেই সময় সংস্থাটির সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত সাংবাদিকদের অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়ে কর্মকর্তা নিয়োগের তথ্য জানান। ওই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু করে র্যাব। অভিযানের প্রথম দিনেই অবৈধ জুয়া ও ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হন খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। এরপর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্যাসিনো ও জুয়াবিরোধী অভিযানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
২০২১ সালের ৩ মার্চ কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহকে দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এরপরই তিনি ক্যাসিনো সংক্রান্ত অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান থামিয়ে দেন। ওই অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ, কমিশনার মোজাম্মেল হক খান এবং জহুরুল হককে বিপুল পরিমাণ টাকা দেন ক্যাসিনো থেকে সুবিধা পাওয়া আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও মন্ত্রীরা। এর বিনিময়ে তৎকালীন কমিশন সেই অনুসন্ধান থামিয়ে দেয়।