
দীর্ঘ সাত বছর পর আজ বর্ধিত সভা করবে বিএনপি। এই সভা থেকে নেতাদের নির্বাচনের বার্তা দেবেন দলের হাইকমান্ড। শোনা হবে তৃণমূলের নেতাদের বক্তব্য। তাদের বক্তব্যের বিচার-বিশ্লেষণ করে দলের পরবর্তী রাজনৈতিক কর্ম-পরিকল্পনা নির্ধারণ হবে। তবে বর্ধিত সভা থেকে মূলত একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি’র এবং জনগণের মধ্যে সুদৃঢ় ঐক্য গড়ে তোলার বার্তা দেয়া হবে। এজন্য এই সভায় স্লোগান রাখা হয়েছে সুদৃঢ় ঐক্যই রুখে দিতে পারে সকল ষড়যন্ত্র। এই সভার মাধ্যমেই মূলত দলকে নির্বাচনমুখী করা হচ্ছে বলে নেতারা জানিয়েছেন। সভা থেকে ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় দেয়া হবে ঐক্যের বার্তা। ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন আদায়ের পক্ষে নেতারা আলোচনা করবেন। আলোচনা হবে দলীয় কর্মসূচি নিয়েও। এই বর্ধিত সভায় একদিকে যেমন তৃণমূলের কথা শোনা হবে তেমনি সর্বোচ্চ হাইকমান্ড থেকেও দেয়া হবে নির্দেশনা। দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখে আগামীর পরিবর্তনের জন্য নেতাকর্মীদের দেয়া হবে দলীয় নির্দেশনা। এ ছাড়া সভায় গত ১৭ বছরে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট শাসনামলের নির্যাতন-নিপীড়নের অভিজ্ঞতা, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ, অভিযোগ, অনুযোগ ও সাংগঠনিক বিষয়ে বক্তব্য দেবেন তৃণমূল নেতারা। সর্বশেষ তাদের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখবেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সিনিয়র নেতারা।
নির্বাচন নিয়ে দলের মধ্যে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশীর দ্বন্দ্ব, সুবিধাভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়েও তৃণমূল নেতারা কথা বলতে চান সভায়। সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হল সংলগ্ন মাঠে এই বর্ধিত সভা শুরু হবে। এতে লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করবেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। উদ্বোধনী ও সমাপনী পর্বে নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখবেন তিনি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘প্রথম বাংলাদেশ আমাদের শেষ বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হবে। এই প্রমাণ্যচিত্রে তৈরি করেছে ‘বর্ধিত সভা বাস্তবায়ন মিডিয়া উপ-কমিটি’। এ ছাড়া বর্ধিত সভা উপলক্ষে আমরা বিএনপি পরিবার ‘আস্থা’ নামে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছে। এরপরে রুদ্ধদ্বার কর্ম অধিবেশন হবে, যেখানে তৃণমূলের নেতৃবৃন্দের বক্তব্য দেবেন। পরে সমাপনীতে তারেক রহমান নীতিনির্ধারণী বক্তব্য দেবেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপি’র দু’জন শীর্ষ নেতা মানবজমিনকে বলেন, আন্দোলনের পূর্বে ও শেষে এবং নির্বাচনের আগে বর্ধিত সভার আয়োজন করা হয়। এবারো আন্দোলনের শেষে এবং নির্বাচনের পূর্বে বর্ধিত সভায় ডাকা হয়েছে। সুতরাং আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এবং নির্বাচনের বিষয়ে নেতারা তাদের বক্তব্যে রাখবেন এবং তাদের পরামর্শ দেবেন। সেসব পরমার্শ অনুযায়ী দলের পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
বর্ধিত সভা বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক ও বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মানবজমিনকে বলেন, সভায় সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা হবে। যে সমস্ত নেতৃবৃন্দ বর্ধিত সভায় আসবেন, যাদের ডাকা হয়েছে তাদের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করেই, কি চান তারা? এত বড় আন্দোলন গেল, আরও নানা বিষয় আছে, কি ধরনের প্রস্তাব গ্রহণ করা যায়, তাদের বক্তব্যের মধ্যদিয়ে সেটা আসবে।
বর্ধিত সভায় তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ছয় স্তরের সাড়ে ৩ হাজার নেতা অংশ নিচ্ছেন বলে জানিয়েছে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় দপ্তর সূত্র। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সকল কর্মকর্তা ও সদস্যরা, সকল মহানগর, জেলা, থানা-উপজেলা-পৌর কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক অথবা আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবরা রয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপি’র ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক অথবা আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবরা থাকবেন সভায়। এর বাইরে ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থী এবং মনোনয়ন পেতে ইচ্ছুক যেসব প্রার্থী প্রাথমিক পত্র পেয়েছিলেন তারাও এই সভায় থাকবেন। আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য সকালের নাস্তা, দুপুরে খাবার, বিকালে নাস্তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত থাকবে চা-কফির ব্যবস্থা।
বর্ধিত সভা বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য ও বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স মানবজমিনকে বলেন, বর্ধিত সভার মূল মেসেজ হবে ঐক্য। কারণ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি অবশ্যই রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাবে। এজন্য বিএনপিকে রুখে দিতে ও প্রতিরোধ করতে চাচ্ছে। আর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে বিভিন্ন ইস্যু তৈরি করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে। যাতে নির্বাচন প্রলম্বিত হয়। তাই এই সভায় বিএনপি এবং জনগণের ঐক্য গড়ে তোলার বার্তা দেয়া হবে।
বর্ধিত সভা বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য ও বিএনপি’র প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু মানবজমিনকে বলেন, বর্ধিত সভায় মূলত তৃণমূলের নেতাদের বক্তব্য শোনা হবে। তারা বর্তমান দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন পরামর্শ দেবেন। তাদের উদ্দেশ্যেও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখবেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ডাক দেয়া হবে ঐক্যের। বিএনপি এবং জনগণের ঐক্য গড়ে তুলের ষড়যন্ত্র রুখে দেয়া হবে।
সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ‘লা মেরিডিয়ানে’ বিএনপি’র বর্ধিত সভা হয়। যেখানে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বক্তব্য দেন। এর ৪ দিন পর জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় ৮ই ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠায় আওয়ামী লীগ সরকার।