Image description

এবার বদলে যাচ্ছে সম্পত্তির বাজারমূল্য নির্ধারণ কমিটি। জেলা রেজিস্ট্রারের পরিবর্তে এবার মৌজাভিত্তিক সম্পত্তির বাজারমূল্য নির্ধারণ করবে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বাধীন কমিটি। প্রস্তাবিত সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী বাজারমূল্য নির্ধারণে এবার তিনস্তরভিত্তিক এ কমিটি শিগ্গির কাজ শুরু করবে। বিধিমালায় বর্ণিত কিছু গাইডলাইন অনুসরণ করে এই কমিটি সম্পত্তির বাজারদর পুনর্নির্ধারণ করবে। এতে মৌজাভিত্তিক সম্পত্তির নির্ধারিত মূল্য দুই বছরের পরিবর্তে তিন বছর বলবৎ থাকবে। তবে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে সরকার কোনো এলাকার সম্পত্তির মূল্য পুনর্নির্ধারণ করতে চাইলে তা পারবে।

সূত্র বলছে, সম্পত্তির বিদ্যমান বাজারমূল্যের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৩১ ডিসেম্বর। ফলে এর আগেই নতুন কমিটিকে সব কাজ শেষ করতে হবে। এজন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা মোতাবেক আইন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত বিধিমালার খসড়া ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করে নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক শামীমা আফরোজার কাছে পাঠিয়েছে। এখন শেষ মুহূর্তের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে শিগ্গির এ সংক্রান্ত সংশোধিত বিধিমালা জারি হতে পারে।

এদিকে এ বিধিমালা নিয়ে সাবরেজিস্ট্রারদের অনেকে যুগান্তরের কাছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। নাম প্রকাশ না করে তারা বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের উদ্দেশ্য হয়তো ভালো। কিন্তু এতে জনগণের ভোগান্তি অনেক বাড়বে। কেউ কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করার সুযোগ পাবেন। অনেক ক্ষেত্রে সরকারকে শত শত রিট মামলা ফেস করতে হবে। এছাড়া সরকার কোনো জমি অধিগ্রহণ করতে চাইলে সুযোগসন্ধানীরা এই বিধির অপব্যবহার করে যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে আগেভাগে ওই মৌজা বা এলাকার জমির দাম বাড়িয়ে দেবেন। এতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে। এমনিতে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে সারা বছর বেসুমার দুর্নীতিসহ জনহয়রানি লেগেই থাকে। তারা প্রশ্ন রেখে বলেন, তিনস্তরের কমিটিতে এমন সব কর্মকর্তাকে সদস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে-যাদের কাজের প্রকৃতির সঙ্গে সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণের কোনো সম্পর্ক নেই।

বরং এখানে রাজস্ব বিভাগ তথা এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সদস্য করা হলে বেশি প্রাসঙ্গিক হতো। তারা বলেন, এখন এসব করতে গিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি ও হয়রানি বাড়বে। এতে রাজস্ব বাড়ার পরিবর্তে কমতে পারে। এছাড়া বাজারমূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিসংক্রান্ত বিধি (৫)-এর (ঙ) উপবিধি কার্যকর করা হলে সেবাপ্রার্থীদের দুর্ভোগ ও দুর্নীতি বাড়বে। এখানে বলা হয়েছে, ‘স্থাবর সম্পত্তির স্থানীয় বাজারমূল্য অনুসন্ধান ও গণশুনানিসহ অন্যান্য যৌক্তিক প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত। তবে শর্ত থাকে যে, কোনো একক বিবেচ্য বিষয়ের ওপর নির্ভর না করে সংগৃহীত সব তথ্য-উপাত্ত যাচাই ও বিশ্লেষণ করে স্থাবর সম্পত্তির বাজারমূল্য নির্ধারণ করতে হবে। আরও শর্ত থাকে যে, কোনো মৌজায় স্থাবর সম্পত্তির অবস্থান ও বৈশিষ্ট্যের কারণে বাজারমূল্যের তারতম্য ঘটলে একাধিক ক্লাস্টার করে বাজারমূল্য নির্ধারণ করতে হবে।’

সংক্ষুব্ধ সাবরেজিস্ট্রাররা বলেন, এর ফলে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হবে। বিশেষ করে ক্লাস্টার করা নিয়ে বড় ঝামেলা হবে। এজন্য পদে পদে সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি করা ও ঘুস লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে নানামুখী তদবির ও ক্ষমতা অপব্যবহারের চাপ বাড়বে। ফলে অনেকে সময়মতো সম্পত্তি কেনাবেচা করতে পারবেন না।

তারা প্রশ্ন রেখে বলেন, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সাবরেজিস্ট্রাররা তো মাত্র ১ মিনিটে একটি জমি দলিল রেজিস্ট্রি সম্পাদন করেন। কিন্তু এসি ল্যান্ড অফিসগুলোতে নামজারি নিয়ে মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। অথচ জমি রেজিস্ট্রি হওয়ার পর সাবরেজিস্ট্রারের দপ্তর থেকে এলটি নোটিশ বা ল্যান্ড ট্রান্সফার নোটিশ অফিশিয়ালি পাঠানো হয়। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৮৯ ধারা অনুযায়ী এসি ল্যান্ড অফিসে এই নোটিশ পাঠানোর বিধান রয়েছে। এটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে আসছেন সাবরেজিস্ট্রাররা। কিন্তু এই নোটিশের ফলে দ্রুত নামজারি করে দেওয়ার কথা। সেটি কিন্তু করা হয় না। কমপক্ষে ২৮ দিন পার করা হয়। ক্ষেত্রবিশেষ মাসের পর মাস ঘুরতে হয় সেবাপ্রার্থীদের। এ কারণে অনেকে সময়মতো জমি কেনাবেচা করতে পারেন না। প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৩ সি (২) ও (৩) অনুযায়ী নামজারিসহ রেকর্ড সংশোধনের সব ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। সবশেষ ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত এ সংক্রান্ত পরিপত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা তো ভিন্ন। কেউ তা মানছেন? সাধারণ মানুষ আইন জানে না বলে পদে পদে হয়রানির শিকার হন।

প্রস্তাবিত বিধিমালার উল্লেখযোগ্য দিক : স্থাবর সম্পত্তির সর্বনিম্ন বাজারমূল্য নির্ধারণ বিধিমালা-২০১০-এ বেশকিছু সংশোধনী আনা হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য সংশোধনীর মধ্যে রয়েছে-বিধি ১-এর উপবিধি(১)-এর ‘সম্পত্তির’ শব্দের পর ‘সর্বনিম্ন’ শব্দটি বিলুপ্ত হবে। বিধি ২-এর (গ)-এর পরিবর্তে প্রতিস্থাপিত হবে ‘বাজারমূল্য’ অর্থ এই বিধিমালার উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সম্পত্তির প্রকৃত বাজারমূল্য। এছাড়া বিধি-০৪ এর পরিবর্তে প্রতিস্থাপিত হবে বাজারমূল্য নির্ধারণ কমিটি। যেখানে সাবরেজিস্ট্রারদের অফিসের স্থানীয় অধিক্ষেত্রের আওতাভুক্ত ব্যক্তিমালিকানাধীন স্থাবর সম্পত্তির বাজারমূল্য নির্ধারণের জন্য বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি। বিভাগে ৮ সদস্য, জেলায় ১১ সদস্য এবং উপজেলায় ৯ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠিত হবে।

যে বছরে বাজারমূল্যের মেয়াদ শেষ হবে সে বছরে কমিটি ১ অক্টোবর থেকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে এলাকার প্রতিটি মৌজার শ্রেণিভিত্তিক বাজারমূল্য প্রস্তুত করে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে মহাপরিদর্শক, নিবন্ধনের কাছে পাঠাবে। বাজারমূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কমিটি ভূমির শ্রেণি, ব্যবহার ও অবস্থান; যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত সুবিধা; সরকারের মালিকানাধীন সম্পত্তির নির্ধারিত বাজারমূল্য এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত বাজারমূল্য বিবেচনা করবে।

এদিকে এই বিধিমালার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী হলো-সরকার চাইলে বাজারমূল্য নির্ধারণের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে। এজন্য বিধি ৫-এর (৩) উপবিধি সংশোধন করা হচ্ছে। সেখানে বলা হয়েছে, গঠিত কমিটি যৌক্তিক কারণে পুনর্নির্ধারণ করে নতুন তালিকা নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠিয়ে দেবে। এরপর যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তা কার্যকর করবে নিবন্ধন অধিদপ্তর।

এছাড়া বিধি (৭)-এ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনার প্রস্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-ক) চুক্তি প্রবলের মামলার ডিক্রিজারি কার্যক্রমের আওতায় আদালত কর্তৃক সম্পাদিত দলিলে প্রদর্শিত মূল্যের ভিত্তিতেই উক্ত দলিল রেজিস্ট্রি করতে হবে। খ) কোনো বায়না দলিলে সম্পত্তির মূল্য যা থাকুক না কেন, উক্ত মূল্য বাজারমূল্য হতে কম হলে বিক্রি দলিল সম্পাদনের সময় বিদ্যমান বাজারমূল্যের ভিত্তিতে করতে হবে। অন্যদিকে বাজারমূল্য হতে বেশি হলে বিক্রি দলিল সম্পাদনের সময় বায়না দলিলে প্রদর্শিত মূল্যের ভিত্তিতেই রেজিস্ট্রি করতে হবে।

প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের এ সংক্রান্ত বিধিমালার ৪(১) বিধি অনুযায়ী বর্তমানে সংশ্লিষ্ট জেলা রেজিস্ট্রারের সভাপতিত্বে গঠিত কমিটি একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দুই বছরের জন্য বাজারমূল্য নির্ধারণ করে থাকে। সেখানে সদস্য হিসাবে থাকেন জেলা রেজিস্ট্রার কর্তৃক মনোনীত একজন সাবরেজিস্ট্রার ও সদস্য সচিব হিসাবে ভূমিকা রাখেন সংশ্লিষ্ট সাবরেজিস্ট্রার। নতুন বিধি কার্যকর হলে আগের কমিটির কোনো কার্যকারিতা থাকবে না।