Image description

এস এম সাইফুল আলম। চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। আমদানিকারকের সঙ্গে যোগসাজেশে কী না করতে পারেন তিনি। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে পণ্য চালান খালাস করতে তার সহযোগিতায় সবই পার করতে পারেন আমদানিকারকরা। মিথ্যা ঘোষণা থেকে শুরু করে নিষিদ্ধ পণ্য চালান খালাসের ক্ষেত্রে তার প্রভাব বিস্তারের প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টিলিজেন্স সেল। যদিও সাইফুল আলমের এমএসটি ইন্টারন্যাশনালের সহায়তায় খালাস করা পণ্য চালান আটকে বিপাকে পড়েন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

এই পণ্য চালান কর্মকতাদের সশরীরে পরীক্ষা করতে প্রায় তিন মাসের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। সর্বশেষ এই পণ্য চালানে মিথ্যা ঘোষণা থেকে শুরু করে আমদানি নিষিদ্ধ পাকিস্তানের গৌরী ক্রিমও পেয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। এই পণ্য চালান আটকের কারণে সিআইসির মহাপরিচালককে সরানোর অভিযোগও রয়েছে। তবে এই সিঅ্যান্ডএফ সভাপতিকে প্রকাশ্যে প্রটোকল দেন খোদ চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার, যা হাউসে ওপেন সিক্রেট। যার কারণে দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন এমএসটি ইন্টারন্যাশনালের মালিক এস এম সাইফুল আলম। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, রাজধানীর পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান কাফ করপোরেশন মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি করে খালাসের দায়িত্ব দেয় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সবচেয়ে প্রভাবশালী সিঅ্যান্ডএফ এমএসটি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে। আর প্রতিষ্ঠানের মালিক হলেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম। আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফের যোগসাজেশে মিথ্যা ঘোষণার পাশাপাশি আমদানি নিষিদ্ধ পাকিস্তানের গৌরী ক্রিম খালাসের জন্য বিল অব এন্ট্রি দাখিল করেন, যার বিল অব এন্ট্রি নাম্বার হলো সি-১০৯৮৭৬৬। এই পণ্য চালান লক করে বিপাকে পড়ে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইসি। এই লক দেওয়ার প্রায় তিন মাস পর পণ্য চালানটি পরীক্ষা করতে পেরেছেন গোয়েন্দারা।

এর মধ্যে ঘটেছে নানা নাটকীয়তা। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী এস এম সাইফুলের পণ্য চালান লক দেওয়ার কারণে সিআইসির তৎকালীন মহাপরিচালক আবদুর রকিবকে পদ থেকে সরে যেতে হয়েছে। যদিও এনবিআরের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ মানতে নারাজ। তবে এস এম সাইফুলের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সহায়তায় যেসব পণ্য চালান খালাস হয়, তা দেখার সাহস পান না খোদ কাস্টম হাউসের কর্মকর্তারা। একাধিক কর্মকর্তা কালবেলাকে জানিয়েছেন, যেখানে সিঅ্যান্ডএফ সভাপতি কমিশনারের রুমে ঢুকলে কমিশনার দাঁড়িয়ে প্রটোকল দেন, সেখানে তার অধীন কর্মকর্তা কীভাবে চালান দেখবেন? শুধু এ ঘটনাই নয়, বন্ধের দিনে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ঢুকে প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজস্ব কর্মকর্তার চেয়ারে বসে ফাইল সাইন করেন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সাইফুল। আর বিষয়টি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশও করেন, যা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে এক সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহা. মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি উল্লেখ করে খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সূত্র আরও জানায়, আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ সাইফুলের সহায়তায় টুথপিক-স্টেইনলেস স্টিলের আড়ালে প্রসাধনী ও পার্টস আমদানি করা হচ্ছে। নথিতে আমদানিকৃত পণ্যের বিবরণ ছিল কৃষিকাজে ব্যবহৃত পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন, টুথপিক, প্রিন্টিংয়ের হিট ট্রান্সফার পেপার এবং কারখানার সাধারণ স্টেইনলেস স্টিল সার্কেল। তবে সিআইসির কায়িক পরীক্ষায় বেরিয়ে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য। প্রতিষ্ঠানটি কম শুল্কের পণ্যের আড়ালে চীন ও পাকিস্তান থেকে নিয়ে এসেছে উচ্চ শুল্কের নামি ব্র্যান্ডের প্রসাধনী, ফেস মাস্ক, অ্যান্টি-এজিং জেল, বিএসটিআই নিষিদ্ধ ক্রিম, লেজার লাইট, গাড়ির দামি ইঞ্জিন পার্টস, বিয়ারিং এবং নাট-বোল্ট।

শুধু তাই নয়, কাস্টমসের চোখ ফাঁকি দিতে লক করা কনটেইনারের মূল সিল কেটে নিজেদের মতো সিল লাগিয়েছেন সাইফুলের কর্মীরা। এ ছাড়া কাফ করপোরেশনের পণ্য চালানে চীন থেকে সাড়ে ২২ টন সাধারণ টুথপিকের ঘোষণা থাকলেও পাওয়া গেছে মাত্র দেড় টন। বাকি সাড়ে ১৫ টন পাওয়া গেছে বিএসটিআই নিষিদ্ধ পাকিস্তানের গৌরী বিউটি ক্রিম। এ ছাড়া ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, অ্যান্টি-এজিং জেল, হেয়ার রিমুভার স্প্রে, প্রিমিয়াম সানগ্লাসও পেয়েছেন শুল্ক কর্মকর্তারা। এর বাইরেও ঘোষণাবহির্ভূত যৌন উত্তেজক ডিলে স্প্রেও পেয়েছেন কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, কাফ করপোরেশনের মালিককে আমি চিনি না। যে সময় এ পণ্য চালানের কাজ আমার প্রতিষ্ঠান থেকে করা হয়েছে, এই সময় আমি দেশের বাইরে ছিলাম। আর কনটেইনারের লক ভাঙার বিষয়ে সাইফুল আলম বলেন, মূলত এক্সামিন করার জন্য কনটেইনারটি খোলা হয়। পরবর্তী কাস্টম হাউসের কর্মকর্তারা জানান, এ পণ্য চালানে লক রয়েছে। পরবর্তী সময়ে কাস্টম হাউসের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তার জ্ঞাতসারে নতুন লক লাগানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। যদিও সিআইসি বলছে, জালিয়াতির মাধ্যমে কনটেইনারের লক পরিবর্তন করা হয়েছে। আর বন্ধের দিনে কাস্টম কর্মকর্তার অফিসে বসে ফাইল সাইন করার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। যদিও স্যোশাল মিডিয়ায় কাস্টম কর্মকর্তার চেয়ারে বসে নিজের ফাইল সাইনের পুরো তথ্য কালবেলার হাতে রয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্রে জানা গেছে, আমদানিকারকদের সঙ্গে যোগসাজশে শুধু নিষিদ্ধ গৌরী বিউটি ক্রিম কিংবা যৌন উত্তেজক ডিলে স্প্রে-এর পণ্যচালান খালাসের চেষ্টা করেই ক্ষান্ত হননি সাইফুল। তার সহযোগিতায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘এইচ আর এন্টারপ্রাইজ’ ইঞ্জিন রাবার বুশের ঘোষণা দিয়ে প্রায় ১৩ টন ওজনের আসল ইঞ্জিন মাউন্টিং, সাসপেনশন বুশ, আর্ম বুশ, সেন্টার বিয়ারিং, স্প্রিং শ্যাকল ও স্টিয়ারিংয়ের মতো দামি মোটরপার্টস খালাসের চেষ্টা করেছে। একই সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সহযোগিতায় আরেকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘নিউ ট্রাস্ট ট্রেডার্স’ চীন থেকে ২৩ টন হিট ট্রান্সফার পেপার আমদানির ঘোষণা দিয়ে সাড়ে ২১ টন ফ্লেক্স ব্যানার খালাসের চেষ্টা করে। এনবিআরের কর্মকর্তারা তদন্তে এসব জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেয়েছেন।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের একাধিক কর্মকর্তা কালবেলাকে জানিয়েছেন, এমএসটি ইন্টারন্যাশনাল যেসব প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করে সেসব পণ্য চালানে লক দেওয়ার সাহস অনেকের নেই। কারণ হিসেবে ওই কর্মকর্তারা বলেন, সিআইসি লক দেওয়ার পরও সময়মতো পণ্য চালান পরীক্ষা করতে পারেনি। দফায় দফায় তিনি কায়িক পরীক্ষা আটকে রেখেছেন। এমনকি যে কর্মকর্তার নেতৃত্বে লক দেওয়া হয়েছিল, তাকেও চেয়ার থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে তার একচ্ছত্র আধিপত্য চলছে। এ ছাড়া এস এম সাইফুলের প্রভাবে আরও কিছু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে বলেও জানান কর্মকর্তারা।