Image description

ধারাবাহিক লাশের মিছিলে আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে খুলনা। সর্বশেষ মাত্র ৩৬ ঘণ্টার ব্যবধানে খুলনা মহানগরী ও রূপসা উপজেলায় চারটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে । সোমবার রূপসার সিংহেরচর এলাকায় নদীর চর থেকে দুজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের উভয়ের মাথায় গুলির চিহ্ন ছিল। এর আগে গত রোববার সন্ধ্যায় নগরের আড়ংঘাটা থানার রায়েরমহল এলাকায় নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে খুন হন তাঁতীদলের নেতা হুমায়ুন কবির। তিনি দলের খুলনা মহানগরের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।

এছাড়া গত শনিবার রাতে নগরের লবণচরা এলাকার সড়ক থেকে এক যুবকের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের দাবি, দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে হত্যার পর লাশ ফেলে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে খুলনা মহানগর ও জেলায় ৭৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক এসব হত্যাকাণ্ডে নগরীর সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

এ পরিস্থিতির মধ্যে আগামী বুধবার খুলনা সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এদিন জেলা স্টেডিয়ামে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬-২০২৭ (সিজন-২)’-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তৎপরতা বাড়িয়েছে পুলিশ।

জানা যায়, সোমবার রূপসার আইচগাতি ইউনিয়নের সিংহেরচর এলাকার জেলখানা ঘাটসংলগ্ন আলম মেম্বারের ঘাট থেকে লাশ দুটি উদ্ধার করা হয়। তাদের একজন মেহেদী হাসান সোহাগ (৩৫)। তিনি উপজেলার রাজাপুর এলাকার আব্দুল্লাহর ছেলে। তিনি পেশায় জেলখানা ঘাটের মাঝি ছিলেন। অপরজন রেজাউল করিম (৩০)। তিনিও একই উপজেলার বাসিন্দা। তবে তার বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়রা জানান, সোমবার বেলা ১১টার দিকে নদীর কাদার মধ্যে প্রথমে একটি লাশ দেখতে পান তারা। পরে ভাটার সময় পানি কমে গেলে একই এলাকায় আরেকটি লাশ দেখা যায়। খবর পেয়ে পুলিশ লাশ দুটি উদ্ধার করে।

রূপসা থানার ওসি মাসুম খান বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, জোয়ারের পানিতে লাশ দুটি ভেসে এসেছে। নিহত সোহাগ সন্ত্রাসী গ্রুপ ‘বি’ কোম্পানির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। রেজাউলের বিস্তারিত পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।

এদিকে তাঁতীদল নেতা হুমায়ুন কবির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ছাত্রদল নেতা আরাফাতসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন নিহতের ছেলে সৈয়দ নুর আমিন সৌহার্দ্য। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরো দুই-তিনজন আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় এজাহারভুক্ত শেখ সিদ্দিক (৫৩) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

আড়ংঘাটা থানার ওসি হালিমুর রহমান জানান, মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, চার থেকে পাঁচজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রায়েরমহল এলাকায় ‘আল-ক্যান্টিনো’ রেস্টুরেন্টে ঢুকে হুমায়ুন কবিরের ওপর হামলা চালান। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে গত শনিবার রাতে লবণচরা থানাধীন কাশেমিয়া জামে মসজিদ থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে শহীদুল ইসলাম কলিন (৩৫) নামে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তার বাবা মাহতাব চারজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। লবণচরা থানার ওসি সৈয়দ মোশারেফ হোসেন জানান, আসামিদের গ্রেপ্তারের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। কলিনের বিরুদ্ধে মাদক ও হত্যাসংক্রান্ত মোট আটটি মামলা রয়েছে।

কেএমপির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মহানগরীর দুটি হত্যাকাণ্ডের একটি ফ্রিজের কিস্তির পাওনা টাকা নিয়ে এবং অন্যটি মাদকসংক্রান্ত বিরোধের জেরে ঘটতে পারে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে টহল জোরদার করা হয়েছে।

জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক আমার দেশকে বলেন, রূপসায় নদী থেকে উদ্ধার হওয়া দুজনকেই দুর্বৃত্তরা মাথায় গুলি করে হত্যা করেছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, নিহত দুজনই সন্ত্রাসী গ্রুপ ‘বি’ কোম্পানির সক্রিয় সদস্য। দুর্বৃত্তরা অন্য কোথাও হত্যা করে তাদের লাশ নদীতে ফেলে দিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ কাজ করছে বলে তিনি জানান।

এর আগে ২২ অক্টোবর সকালে ও সন্ধ্যার পর খুলনা নগরে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। সেদিন সকালে খুন হন তাওহিদুল ইসলাম নামে এক যুবক। সন্ধ্যার পর খুন হন খুশি আক্তার নামে এক নারী।

পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, তাওহিদুল ‘পলাশ গ্রুপের’ সদস্য ছিলেন। এ গ্রুপের সঙ্গে রনি চৌধুরী বাবু ওরফে ‘গ্রেনেড বাবু’ গ্রুপ বা বি কোম্পানির বিরোধ রয়েছে। অন্যদিকে খুশি আক্তার একটি গ্রুপের হয়ে মাদক বিক্রি করতেন।

এরপর ২৪ ও ২৫ অক্টোবর বটিয়াঘাটার বিএনপি ও যুবদলের দুই নেতাকে গুলি করা হয়। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। একই দিন নগরীর নিরালা মোড়ে সালমান হাওলাদার নামে বেসরকারি এক চাকরিজীবীকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা।

কেএমপির তথ্য অনুযায়ী, মহানগরীর আট থানায় ২০২৪ সালে ২৯টি, ২০২৫ সালে ৩৭টি এবং চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ৩০টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। সে হিসাবে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৩ মাসে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৯৬টি। এছাড়া চলতি বছরের জেলা ও মহানগর মিলে মোট হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ৭৫টি।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশের পেছনে অস্ত্র ও মাদক কারবার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, পূর্বশত্রুতা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিরোধের মতো কারণ রয়েছে।