চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় পাসে বিপর্যয় ঘটেছে। আর এর প্রভাব পড়বে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষ করে নামসর্বস্ব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মানহীন কলেজগুলো এবার শিক্ষার্থী না পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, এইচএসসি পাস করা সব শিক্ষার্থী ভর্তিও হলেও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আসন ফাঁকা থাকবে ৮ লাখ ৪৫ হাজার। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১১৭টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এবার উচ্চশিক্ষায় মোট আসন রয়েছে ১৪ লাখ ৯২ হাজারের মতো। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ১০ লাখের বেশি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ৪ লাখের বেশি আসন রয়েছে। এর বিপরীতে এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। এ হিসাব অনুযায়ী, এবার উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের সবাই উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হলেও ৮ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি আসন খালি থাকার কথা।
উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দের তালিকায় থাকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ। ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের বড় অংশই এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নেন। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে আসন সংখ্যা খুবই সীমিত। অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদে শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন রয়েছে কমবেশি ৬৩ হাজারের কিছু বেশি। সরকারি- বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে আসন ১৫ হাজারের মতো। ফলে প্রথম সারির সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও পেশাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রতিযোগিতা থাকলেও সামগ্রিকভাবে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় আসন ও শিক্ষার্থীর সংখ্যার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন ভর্তি যুদ্ধে শিক্ষার্থী টানতে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে ভর্তি যোগ্যতা শিথিল করা এবং সেমিস্টার ফিতে বড় ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অস্তিত্বের ঝুঁকিতে ৭০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় : বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় দেশে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৭টিতে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয় সঠিকভাবে চলছে। বাকিগুলোর মধ্যে অন্তত ৭০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। অনেক প্রতিষ্ঠানে উপাচার্য, উপউপাচার্য বা কোষাধ্যক্ষের মতো শীর্ষ পদ শূন্য, নেই পর্যাপ্ত অধ্যাপকও। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হয় ১০-২০ হাজার। বেতন না দেওয়ায় নেই ভালো শিক্ষকও। কিন্ডারগার্টেনের মতো কয়েকটা ফ্লোর ভাড়া নিয়ে চলা এসব বিশ্ববিদ্যালয় এবার তীব্র শিক্ষার্থী সংকটে পড়ে শিক্ষকদের বেতন দেওয়ার সক্ষমতাও হারাতে পারে।
যে কারণে সংকট : বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৬ সাল থেকে খাতা মূল্যায়নে কড়াকড়ি কমানোয় এইচএসসি ও সমমানে পাসের হার বাড়তে থাকে। ২০২০ সালে অটোপাস দিয়ে সবাইকে পাস করিয়ে দেওয়া হয়। ২০২১ সালে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা হয়। সে বছর পাসের হার ছিল ৯৫.২৬ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮৫.৯৫ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৭৮.৬৪ শতাংশ। ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৭৭.৭৮ শতাংশ। বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পাস করায় রাজনৈতিক বিবেচনায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরিতেও আগ্রহ বাড়ে। তবে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পাসের হার কমে দাঁড়ায় ৫৮.৮৩ শতাংশ। আর ২০২৬ সালে পাসের হার আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। এতেই বিপাকে পড়েছে মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। আসন্ন ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হলে কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি না হওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক বা দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত পুনঃপরীক্ষার যে সুযোগ দিচ্ছে, তাতে পাসের হার কিছুটা বাড়লে এই সংকট সামান্য কমতে পারে।