Image description

গ্যাস ও কাঁচামালের সংকটে গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সার উৎপাদন করতে পারেনি রাষ্ট্রায়ত্ত সাতটি সার কারখানা। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন ছিল শূন্য। সে সংকট কাটেনি এখনো। বন্ধ আছে সাত কারখানার পাঁচটি। এর মধ্যেও গত অর্থবছরের প্রকৃত উৎপাদনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ সার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)।

বিসিআইসির হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত সাত সার কারখানায় মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ লাখ ৫০ হাজার টন। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১২ লাখ ৫১ হাজার ১৩৪ টন। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৪ লাখ ৩ হাজার ৯০০ টন। সে অনুযায়ী গত অর্থবছরের প্রকৃত উৎপাদনের তুলনায় এবার ১১ লাখ ৫২ হাজার ৭৬৬ টন বা ৯২ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি সার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।

বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস ও কাঁচামালের অভাবে বছরের বড় অংশজুড়েই বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। কোনো কোনো কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে। এরপরেও লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর কারণ জানতে চাইলে বিসিআইসির পরিচালক (উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা ধরে নিই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাবে। সেই হিসাব করেই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়’।

পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, সার কারখানাগুলোর বেশিরভাগই পুরনো যন্ত্রপাতিতে চলছে। ফলে সেখানে উৎপাদনে গ্যাস খরচ হয় বেশি। আবার কারখানাগুলোর চাহিদামাফিক গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানায় দৈনিক গ্যাসচাহিদা প্রায় ২৭ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ৮-৯ কোটি ঘনফুট।

 

 

২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত সাত সার কারখানায় মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ লাখ ৫০ হাজার টন। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১২ লাখ ৫১ হাজার ১৩৪ টন। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৪ লাখ ৩ হাজার ৯০০ টন। সে অনুযায়ী গত অর্থবছরের প্রকৃত উৎপাদনের তুলনায় এবার ১১ লাখ ৫২ হাজার ৭৬৬ টন বা ৯২ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি সার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।

 

 

দেশে বছরে ইউরিয়া সারের চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ টন। রাষ্ট্রায়ত্ত সাতটি সার কারখানার পাঁচটি ইউরিয়া উৎপাদন করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওই পাঁচ কারখানায় উৎপাদন হয়েছে ১১ লাখ ৭৩৩ টন। দেশের ইউরিয়ার মোট চাহিদার অর্ধেকের বেশি পূরণ হচ্ছে আমদানি এবং বেসরকারি খাতের কারখানা কাফকোর কাছ থেকে কেনার মাধ্যমে। বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া আমদানি করা হয়েছে ১৬ লাখ ৪৪ হাজার টন। আর গত অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ ৭৯ হাজার টন।

আমদানিনির্ভরতা কমাতে বন্ধ থাকা কারখানাগুলো চালুর চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা। তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনীয় গ্যাস ও কাঁচামাল পাওয়া গেলে নভেম্বরের মধ্যে কারখানাগুলো চালুর বিষয়ে আমরা আশাবাদী। এজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।’

বিসিআইসির উৎপাদন বিবরণী অনুযায়ী, গত অর্থবছরে সাতটি সার কারখানার কোনোটিই নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। এদিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার। গ্যাস সংকটে কারখানাটি এখনও বন্ধ। সেখানে এবার ১ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। গত বছর কারখানাটির উৎপাদন ছিল শূন্য।

জামালপুরের যমুনা সার কারখানায় গত অর্থবছরে আড়াই লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৩৮ হাজার ২৩৯ টন। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১৫ দশমিক ৩০ শতাংশ অর্জন করতে পেরেছে কারখানাটি। এই কারখানাটিও গ্যাস সংকটে বর্তমানে বন্ধ আছে।

চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজারের অবস্থাও প্রায় একই। কখনো গ্যাস সংকট, আবার কখনো যান্ত্রিক ত্রুটিতে বন্ধ থাকছে কারখানাটি। গত অর্থবছর দেড় লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে কারখানাটিতে উৎপাদিত হয়েছে ৬৫ হাজার ৬ টন ইউরিয়া। বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, যান্ত্রিক ত্রুটিতে কারখানাটি এখনো বন্ধ।

রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন করছে নরসিংদীর ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার। কারখানাটিতে সাড়ে আট লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার গেল অর্থবছরে উৎপাদিত হয়েছে ৭ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৫ টন। সিলেটের শাহজালাল ফার্টিলাইজারে ৩ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৫৩ টন। বর্তমানে শুধু এই দুই কারখানায় চালু আছে।

 

 

গত অর্থবছরে সাতটি সার কারখানার কোনোটিই নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। এদিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার। গ্যাস সংকটে কারখানাটি এখনও বন্ধ। সেখানে এবার ১ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। গত বছর কারখানাটির উৎপাদন ছিল শূন্য।

 

 

ইউরিয়ার বাইরে চট্টগ্রামের টিএসপি কমপ্লেক্স এবং ডিএপি ফার্টিলাইজার সার কারখানা বন্ধ আছে কাঁচামাল সংকটে। গত অর্থবছরে টিএসপি কমপ্লেক্সে ১ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৬৮ হাজার ২৫৯ টন এবং ডিএপি ফার্টিলাইজারে ১ লাখ টনের বিপরীতে ৮২ হাজার ১৪২ টন সার উৎপাদিত হয়েছে।

কারখানাদুটির কাঁচামালের জন্য দরপত্র আহ্বান করেও সাড়া পাচ্ছে না বিসিআইসি। সংস্থাটির পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এই দুই কারখানার কাঁচামালের জন্য এক দফায় দরপত্র আহ্বান করেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যায়নি। পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে দরপত্রে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

চলতি অর্থবছরে ঘোড়াশাল পলাশ সার কারখানার উৎপাদন লক্ষ্য সাড়ে ৮ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৯ লাখ ২৪ হাজার টন করা হয়েছে। এছাড়া শাহজালালের লক্ষ্যমাত্রা ৩ থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ এবং বন্ধ থাকা যমুনার আড়াই লাখ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৩ লাখ টন নির্ধারণ করা হয়েছে। গত অর্থবছরে আশুগঞ্জ সার কারখানায় উৎপাদন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ টন। এর বিপরীতে এক টন সারও উৎপাদন করতে পারেনি কারখানাটি। এবার লক্ষ্য বাড়িয়ে আড়াই লাখ টন করা হয়েছে।

অন্যদিকে আগের অর্থবছরে মাত্র ৬৫ হাজার টন উৎপাদন করা চট্টগ্রাম ইউরিয়া কারখানার লক্ষ্য দেড় লাখ থেকে বাড়িয়ে আড়াই লাখ টন নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে ডিএপি ফার্টিলাইজারের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯০০ টন করা হয়েছে। তবে টিএসপি কমপ্লেক্সের লক্ষ্য ১ লাখ থেকে কমিয়ে ৯০ হাজার টন নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিসিআইসির উৎপাদন বিবরণী অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) সাতটি কারখানায় ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৪০০ টন সার উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৮৬ হাজার ১১ টন। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৪৯ দশমিক ৮২ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৩৮৯ টনে।

এই দুই মাসে সার উৎপাদন হয়েছে শুধু ঘোড়াশাল পলাশ ও শাহজালাল কারখানায়। ঘোড়াশাল পলাশে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদিত হয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ৩৯৪ টন। অন্যদিকে শাহজালালে ৩০ হাজার টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৩৩ হাজার ৬১৭ টন।

 

 

চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) সাতটি কারখানায় ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৪০০ টন সার উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৮৬ হাজার ১১ টন। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৪৯ দশমিক ৮২ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৩৮৯ টনে।

 

 

যমুনা, আশুগঞ্জ, চট্টগ্রাম ইউরিয়া, টিএসপি কমপ্লেক্স ও ডিএপি ফার্টিলাইজারে জুলাই ও আগস্টে কোনো সার উৎপাদিত হয়নি। এই পাঁচ কারখানায় দুই মাসে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৪০০ টন সার উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল।

বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬ লাখ ৪৪ হাজার টন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৪ লাখ ৭৯ হাজার টন ইউরিয়া সার আমদানি করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ইউরিয়া আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ১২ লাখ টন। এরই মধ্যে গত ১৯ অক্টোবর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ৭০ হাজার টন ইউরিয়া সার কেনার অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের সাবিক এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি থেকে ৪০ হাজার টন আমদানি এবং দেশীয় যৌথ উদ্যোগের কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো) থেকে ৩০ হাজার টন সংগ্রহ করা হবে।

বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, ‘দেশের সারের চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলোর উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং কৃষকের কাছে সময়মতো সার পৌঁছানো সহজ হবে। দেশের সব সার কারখানা চালু করে ইউরিয়া আমদানি বাবদ ২২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে’।