Image description

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকসংকটের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে শিখন ঘাটতিতে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। অনেকটা বাধ্য হয়ে মুখস্থ নির্ভর হওয়ায় ছাত্রছাত্রীদের যে দুর্বল ভিত তৈরি হয়েছে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেছে এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে। ইংরেজিতে ৩৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং আইসিটিতে ২৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। দেশে বিদ্যালয়ের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ইংরেজি ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক। উচ্চশিক্ষার আগে দীর্ঘ ১২ বছর শিক্ষার্থীদের ইংরেজি বিষয়টি পড়তে হয়। তবে দেশের অধিকাংশ স্কুলে এখনো ইংরেজি শেখানোর পদ্ধতি মুখস্থ নির্ভর। আর যে বিষয়টা জীবন থেকে আহরিত না হয়ে মুখস্থ করা হয়, সে বিষয়টা মাথা থেকে খুব দ্রুত চলে যায়। এ কারণে এক যুগ ধরে পড়ালেখা করেও অনেক শিক্ষার্থীর ইংরেজিভীতি কাটেনি। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যমতে, দেশের ২ হাজার ৬২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক নেই। বর্তমানে ইংরেজি বিষয় যেসব শিক্ষক পড়াচ্ছেন, তাদের সংখ্যা ৬৪ হাজার ২৫৩ জন। তাদের মধ্যে ৫১ হাজার ৩৬০ জনের ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক-স্নাতকোত্তর বা উচ্চতর কোনো ডিগ্রি নেই।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয় বাধ্যতামূলক হয়েছে ১৩ বছর আগে। কিন্তু বিষয়টি চালুর সঙ্গে প্রয়োজনীয় শিক্ষক পদ সৃষ্টি হয়নি, নিয়োগেরও সমন্বয় হয়নি। ফলে এখনো অনেক সরকারি কলেজে নিজস্ব আইসিটি শিক্ষক নেই। আর দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর একটিতেও এ বিষয়ের আলাদা শিক্ষক পদ সৃষ্টি হয়নি। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩ হাজার ৮৬১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটি বিষয়ের কোনো শিক্ষক নেই। আইসিটি পড়ান গণিত, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, ব্যবসায় শিক্ষা ও পদার্থের শিক্ষক। পাশাপাশি প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই। অন্যদিকে ইংরেজি বিষয়ে পাঠদানরত ৫৬ শতাংশ শিক্ষকের বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ নেই। প্রশিক্ষণ ছাড়া যারা শিক্ষকতা করছেন, তারা মেধাবী হলেও শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারছেন কম। ব্যবহারিক ক্লাসও হচ্ছে অনিয়মিত।

শিক্ষাবিদরা বলেন, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের সংকট শিক্ষার্থীদের একটি শক্তিশালী শিক্ষাগত ভিত্তি তৈরির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা আমাদের চিন্তাশক্তিকে সীমিত করে এবং দীর্ঘ মেয়াদে মেধার ভিত দুর্বল করে দেয়। কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য না বুঝে মুখস্থ করার প্রবণতা সাময়িক সাফল্য দিলেও, বাস্তব জীবনে তা কোনো কাজে আসে না। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ মনজুর আহমেদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, করোনা মহামারির পর থেকেই শিক্ষার মান ধারাবাহিকভাবে কমছিল এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

যে কারণে এবারের খারাপ ফলাফল পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল না, তবে এটি গ্রহণযোগ্যও নয়। তিনি বলেন, ফলাফলের জন্য শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের দোষারোপ করা উচিত নয়। আছে শিক্ষকসংকট। অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রধান পদ ফাঁকা। শিক্ষকদের পর্যাপ্ত বেতন-ভাতাও নেই। তিনি বলেন, আসল সমস্যা হলো পুরো শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার মতো সমন্বিত উদ্যোগের অভাব। পূর্ববর্তী সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সরকারের নিষ্ক্রিয়তারও সমালোচনা করেন তিনি। সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচিতে একটি শিক্ষা উন্নয়ন কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও এর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে শিক্ষা খাতের ৯টি ক্ষেত্রে ১১৮টি সুপারিশ পেশ করা হয়েছিল। নির্বাচিত সরকার এখনো সেসব প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনাও হচ্ছে না।’

ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, এবারের ফলাফল একদিকে শিক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি এবং অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিত না থাকার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো, মূল্যায়ন যেন নির্ভুল ও ন্যায্য হয় তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে আমরা এখনো একটি যৌক্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে মনোযোগী ছিল না। গড়ে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসে উপস্থিত থেকেছে, যেখানে পাশের হার ৫২ শতাংশ। যারা নিয়মিত ক্লাস করেছে এবং পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে, তারাই পাশ করেছে।’

নটর ডেম কলেজের একজন শিক্ষক বলেন, এই ব্যাচটি করোনা মহামারির পর থেকেই শিখন ঘাটতির সঙ্গে লড়াই করছিল। করোনার পর থেকেই এই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মৌলিক জ্ঞানের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তারা পাঠ্যবইবিমুখ হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাদের শিক্ষাজীবনে প্রভাব ফেলেছে। ঘন ঘন সিলেবাস পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি। পরীক্ষার সময় বন্যা পরিস্থিতির অস্থিরতাও তাদের মনোযোগ নষ্ট করেছে।’

শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, পাঠদানে অদক্ষ শিক্ষকের কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই তৈরি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ইংরেজির দুর্বলতা। মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলগুলোর ৮৪ শতাংশ ইংরেজি শিক্ষকের নেই ইংরেজিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। এবার ফল বিপর্যয়ের নেপথ্যে রয়েছে দক্ষ শিক্ষকের অভাব। ইংরেজি ও আইসিটিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বল ফলের পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ তুলে ধরে তারা বলেন, এর মধ্যে রয়েছে মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা, ব্যবহারিক ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ঘাটতি, শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত অনুশীলনের অভাব এবং বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা তৈরির পরিবর্তে পরীক্ষায় ভালো ফলের প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া।

ইংরেজির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ব্যাকরণ ও শব্দভান্ডারের দুর্বলতা, ইংরেজিতে কথা বলা, পড়া ও লেখার নিয়মিত চর্চা না থাকা এবং পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুর সঙ্গে বাস্তব ভাষা ব্যবহারের দূরত্ব ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মত তাদের। অন্যদিকে, আইসিটির ক্ষেত্রে হাতে-কলমে শেখার সুযোগের অভাব, পর্যাপ্ত কম্পিউটার ও ল্যাব সুবিধা না থাকা, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংকট এবং ব্যবহারিক জ্ঞানের পরিবর্তে তাত্ত্বিক পড়াশোনার ওপর নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধার বৈষম্যও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

মুখস্থ বিদ্যার চাপে শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতায় মারাত্মক ধস: মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সর্বশেষ ‘ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্টস (নাস)’ প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মুখস্থ বিদ্যার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে সিংহভাগ শিক্ষার্থীই বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো প্রধান বিষয়গুলোতে সাধারণ সমস্যা সমাধান এবং বিশ্লেষণী চিন্তার দক্ষতায় চরম ঘাটতিতে ভুগছে। এমনকি পরীক্ষার হলে সাধারণ রিডিং প্যাসেজ বুঝতে এবং মৌলিক জ্যামিতিক ও গাণিতিক হিসাব মেলাতেও হিমশিম খাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সাধারণ স্কুলগুলোর তুলনায় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বাংলায় সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, ইংরেজি ভাষায় ‘ফ্রি-হ্যান্ড রাইটিং’ বা নিজস্বভাবে লেখার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ঘাটতি এতটাই প্রকট যে, প্রায় ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই মেধার শীর্ষ স্তরে পৌঁছাতে পারছে না। ভৌগোলিক বৈষম্যের কারণে গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের ইংরেজির স্কোর তলানিতে নেমে গেছে, যার মধ্যে রংপুর ও ময়মনসিংহের শিক্ষার্থীদের ফলাফল সবচেয়ে বেশি দু১র্বল।