* পাঠকদের জন্য সতর্কবার্তা: এই প্রতিবেদনে নারী ক্রিকেটে যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিবরণ রয়েছে। কিছু বিবরণ পাঠকের জন্য মানসিকভাবে অস্বস্তিকর হতে পারে।
ঢাকার পুরোনো একটি ক্রিকেট ক্লাব। ১৫-১৬ জন নারী ক্রিকেটার। আবাসিক হোস্টেলে ওয়াশরুম ছিল মাত্র দুটি। গোসলের সারি লম্বা হলে মেয়েরা প্রায়ই কোচের ঘরের ওয়াশরুমে যেতেন।
মেয়েটি সেদিন গিয়েছিলেন এক সতীর্থের সঙ্গে। তখন তার বয়স ১৮। কোচ বয়সে তার বাবার মতো। নারী ক্রিকেটে প্রভাবশালী কোচদের একজন। সতীর্থ মেয়েটি গোসলে ঢুকে গেলে সেখানে ছিলেন কেবল সেই কোচ আর তিনি।
সেদিনের ঘটনা দ্য হুইসেলকে বলতে গিয়ে কেঁদেই ফেলেন মেয়েটি, ‘উনি ডিরেক্ট আমার বুকে টাচ কইরাই ফেলছে। আমি ওই রকম আশা করি নাই যে স্যার এ রকম কিছু করবে।’
মেয়েটি তখনই ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। কাউকেই কিছু বলেননি—না পরিবারকে, না সতীর্থদেরও।
বললেও যেতেন কার কাছে? কোথায়?
যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই রুহুল আমিন তিন দশক ধরে ঢাকার খেলাঘর ক্লাবের কোচ ছিলেন। ছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বেতনভুক্ত কোচ। ২০২০ সালে কক্সবাজারে মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের যে ক্যাম্পে মেয়েটি ডাক পেয়েছিলেন, সেখানেও কোচ ছিলেন তিনি।
আর তখন বিসিবিতে যৌন হয়রানির অভিযোগ নেওয়ার কোনো কমিটি ছিল না।
কয়েক বছর পর ক্রিকেট খেলাই ছেড়ে দেন মেয়েটি। তার মা আজও কারণটি জানেন না। অথচ মেয়েটি পরিবারের বাধা, আপত্তি উপেক্ষা করে ক্রিকেটার হতে চেয়েছিলেন, এ জন্যই নিজ জেলা ছেড়ে এসেছিলেন ঢাকায়।
একই ছকে হয়রানি, বছরের পর বছর উপেক্ষা
ক্রিকেটে আসা সব মেয়ে যৌন হয়রানির শিকার হন, এমন নয়। একইভাবে, সব কোচ-নির্বাচকও অভিযুক্ত নন। তবে অনুসন্ধানে ইঙ্গিত মিলেছে, প্রবণতাটি ব্যাপক এবং এর একটি বাঁধাধরা ছক আছে।
অর্থাৎ, ওই মেয়ের অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। জেলার মাঠ থেকে ঢাকার ক্লাব হোস্টেল, বিসিবির বয়সভিত্তিক ক্যাম্প থেকে জাতীয় দল—প্রতিটি ধাপেই একই ছক দেখতে পেয়েছে দ্য হুইসেল।
মেয়েরা দলে সুযোগ পাবেন কি না, চুক্তির আওতায় আসবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত যাদের হাতে, অভিযোগ উঠেছে তাদেরই বিরুদ্ধে। প্রস্তাবে সাড়া না দিলে মেয়েদের তারা বসিয়ে রেখেছেন, মানসিক চাপ দিয়ে মনোবল ভেঙে দিয়েছেন।
বিসিবি অভিযোগগুলোর কথা জানত। উইমেন্স উইংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল দ্য হুইসেলকে বলেছেন, ‘অভিযোগ একদম পাইনি, সেটা নয়।’ বর্তমান চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বাবুও বলেছেন, ‘আমরাও দেখেছি, শুনেছি।’
নারী জাতীয় দলে যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রথম প্রকাশ্যে আসে ২০২৫ সালের নভেম্বরে। তখন সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলম অভিযোগ করেন, নিউজিল্যান্ডে ২০২২ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের প্রস্তুতির সময় নারী দলের তখনকার নির্বাচক ও ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু তাকে যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
শুরুতে বিসিবি অভিযোগটি আমলে নিতে চায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার পর বোর্ড আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি তারিক উল হাকিমের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে। জাহানারার চারটি অভিযোগের মধ্যে দুটিতে প্রাথমিক প্রমাণ পায় কমিটি। এই দুটি অভিযোগই ছিল মঞ্জুর বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত অন্য তিনজনের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পায়নি কমিটি। বোর্ড মঞ্জুকে নিষিদ্ধ করে, যদিও তখন তিনি বিসিবির কোনো দায়িত্বে ছিলেন না। আট মাস আগেই বোর্ডের সঙ্গে তার চুক্তি শেষ হয়ে গিয়েছিল।
নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশের ঘাটতি ছিল কিনা জানতে চাইলে, বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিজাম উদ্দিন চৌধুরী নিজেও মানছেন, এই বিষয়ে বোর্ডের ঘাটতি ছিল। দ্য হুইসেলকে তিনি বলেন, ‘কিছু লিমিটেশন তো ছিল বা ঘাটতি, যেটা বলছেন আপনি, সেটা তো অবশ্যই ছিল।’
সেই ঘাটতি কতটা গভীর, তার প্রমাণ বোর্ডের নিজের তদন্তেই উঠে এসেছে। কমিটি জাহানারার অভিযোগ তদন্তের প্রতিবেদন বিসিবির কাছে জমা দিয়েছিল চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি। এই প্রতিবেদন আজও প্রকাশ করেনি বিসিবি।
প্রতিবেদনটি এখন দ্য হুইসেলের হাতে। সেখানে কমিটি লিখেছে, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিসিবির কোনো পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর কাঠামো ছিল না। কমিটির কার্যপরিধিতে অন্য নারী ক্রিকেটারদের অভিযোগ নিয়ে তদন্তের সুযোগও রাখা হয়েছিল। কিন্তু বিসিবি জাহানারার ছাড়া আর কোনো অভিযোগ কমিটির কাছে পাঠায়নি।
তদন্তের ফল আর মঞ্জুর নিষেধাজ্ঞা জানিয়ে ফেব্রুয়ারিতেই বিসিবি দুটি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল। কোনোটিতেই এর উল্লেখ ছিল না।
অনুসন্ধানের আদ্যোপান্ত
জাহানারা আলমের ঘটনা কি বিচ্ছিন্ন ছিল?
এই প্রশ্ন নিয়ে আমরা কথা বলেছি জেলার মাঠ থেকে জাতীয় দল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের ৬৭ জন সাবেক ও বর্তমান নারী ক্রিকেটারের সঙ্গে। কথা বলেছি তাদের কোচ, সংগঠক, বোর্ডের কর্মকর্তা এবং ক্রীড়া সাংবাদিকদের সঙ্গেও; সব মিলিয়ে ১০৪ জন।
যে নারী ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তারা সবাই ভুক্তভোগী নন। তবে তারা যৌন হয়রানির বিভিন্ন নজির জানেন। মেয়েদের অনেকে মুখ খুলেছেন নাম গোপন রাখার শর্তে। কারণ, তাদের ক্যারিয়ার এখনো কোনো না কোনো কোচ বা নির্বাচকের হাতে।
এ কারণে মেয়েরা হয়রানির মুখে পড়লেও অভিযোগ করার সাহস দেখান না বলে দ্য হুইসেলকে জানান জাহানারা। নিজের ১৭ বছরের ক্রিকেট জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘অনেক মেয়ে শিকার হচ্ছে এবং ক্লাব পর্যায়ে ডোমেস্টিকে অসংখ্য ঘটনা আছে, অসংখ্য সাফারার আছে।’
কারও কারও বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তাদের নিজের এলাকার ক্রিকেটে ‘ওপেন সিক্রেট’। এর কিছু বিসিবি পর্যন্তও পৌঁছেছিল। তবু বছরের পর বছর বোর্ড কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের প্রত্যেকের বক্তব্য জানতে চেয়েছে দ্য হুইসেল। অভিযুক্তদের বেশির ভাগই অভিযোগ মেনে নেননি। মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুও সব অভিযোগ অস্বীকার করে দ্য হুইসেলকে বলেন, ‘যে অভিযোগগুলো করা হয়েছে, সেগুলোর কোনোটির সাথেই আমার বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা নেই।’
এই প্রতিবেদনে বেশির ভাগ ভুক্তভোগীর নাম প্রকাশ করা হয়নি। তারা ক্যারিয়ার, প্রতিশোধ আর পরিবারের সম্মান নিয়ে ভয় পান। অনেকের পরিবার আজও ঘটনাগুলো জানে না। তাদের প্রতিটি বয়ান সতীর্থ, প্রত্যক্ষদর্শী বা নথির সঙ্গে মিলিয়ে একাধিক সূত্রে যাচাই করা হয়েছে। যেখানে প্রত্যক্ষদর্শী ছিল না, সেখানে সময়, স্থান, অভিযুক্তের তখনকার পদ, আর একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্যদের একই ধরনের অভিযোগ মিলিয়ে দেখা হয়েছে।
একজন নারী ক্রিকেটারের যাত্রা শুরু হয় জেলার কোনো মাঠে। তার লক্ষ্য থাকে একে একে বিভাগীয় দল, ঢাকার ক্লাব দল ও বিসিবির বয়সভিত্তিক দল পেরিয়ে জাতীয় দলে পৌঁছানো। এই অনুসন্ধান সেই পথ ধরে এগিয়েছে, ধাপে ধাপে।
এক কোচ, প্রায় দুই দশকের হয়রানির অভিযোগ
খুলনা বিভাগীয় স্টেডিয়ামের এক কোণে একদল কিশোরী নেটে ব্যাট করছিলেন। পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন ইমতিয়াজ হোসেন পিলু। খুলনার বিভাগীয় দলের দায়িত্বে তিনি আর নেই, তবে নিজের একাডেমিতে এখনো মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেন। এই মেয়েদের তিনি ঢাকার প্রথম বিভাগ লিগে খেলানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।
২০০৬ সাল থেকে টানা ১৭ বছর খুলনার মেয়েদের কোচ ছিলেন পিলু; জেলা দল আর বিভাগীয় দল—দুটিরই। তার হাত ধরে উঠে এসেছেন সালমা খাতুন, আয়েশা আক্তার শুকতারা, রুমানা আহমেদের মতো জাতীয় দলের তারকারা।
খুলনা বিভাগীয় স্টেডিয়ামে দ্য হুইসেলকে পিলু বলেন, ‘ন্যাশনাল টিমে আছে প্রায় ১৪ জন, এক শর উপরে প্লেয়ার আমি তৈরি করেছি।’
একজন কোচের প্রভাব বুঝতে হলে জানতে হবে, খেলোয়াড়েরা ওপরে ওঠেন কীভাবে। বিসিবি প্রতিটি জেলায় গিয়ে খেলোয়াড় বাছাই করে না। বোর্ড চিঠি পাঠায় বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থায়, সেখান থেকে জেলায়।
জেলার মেয়েদের মধ্যে কারা বিভাগীয় বাছাইয়ে যাবেন, তা ঠিক করেন ‘ওই জেলার যে কোচের কাছে ও (মেয়েটি) প্র্যাকটিস করতেছে, তিনি আর ক্রীড়া সংস্থার লোকজন’, জানান জাতীয় নারী দলের নির্বাচক সালমা খাতুন।
পিলু নিজেও তেমনটাই বলেছেন। কে বাছাইপর্বের ক্যাম্পে যাবেন, তা কি কোচের সিদ্ধান্তে হয়? এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সিদ্ধান্ত বলাও যায়। বা তার জাজমেন্ট বলা যায়।’
খুলনার ক্রিকেটে পিলুর বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ বহু বছরের পুরোনো। এ বিভাগ থেকে উঠে আসা বিভিন্ন পর্যায়ের ২১ জন নারী ক্রিকেটারের সঙ্গে কথা বলেছে দ্য হুইসেল। তাদের মধ্যে ১০ জন জানিয়েছেন, পিলুর কাছে তারা হয়রানিমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। ঘটনার সময় তাদের বেশির ভাগের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে।
দ্য হুইসেল যেসব ঘটনার কথা জেনেছে, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনোটি ২০১০ সালের।
খুলনার এক নারী ক্রিকেটার জাতীয় দলের ক্যাম্প এবং ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন। ২০০৮ সালে পিলুর কাছেই তার ক্রিকেটে হাতেখড়ি হয়েছিল। দুই বছর পর একটি টুর্নামেন্টে খেলতে বিভাগীয় দলের সঙ্গে ঢাকার মিরপুরে এসে তিনি হয়রানির মুখে পড়েন।
তখন মেয়েটি দশম শ্রেণিতে পড়তেন, বয়স ছিল ১৫ কিংবা ১৬ বছর। হাত দিয়ে ভঙ্গিটা দেখিয়ে মেয়েটি বলেন, ‘হোটেলে রুমে এসে উনি আমাকে এভাবে জড়িয়ে ধরলেন। জড়িয়ে ধরেই আছে। মানে এত বড় একটা লোক...আমি তো অনেক ভয় পেয়েছিলাম। ভয়ে শুধু চুপ করে বসে ছিলাম।’
খুলনার এমন তিনজন নারী খেলোয়াড়, যারা এখনো ক্রিকেট খেলছেন, আলাদা সাক্ষাৎকারে একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। তারা চার-পাঁচ বছর আগে পিলুর কাছে প্রশিক্ষণ নিতেন। তখন তাদের সবারই বয়স ছিল আঠারোর নিচে।
পিলু তখন বিভাগীয় কোচ ছিলেন। তাদের একজনের ভাষ্য অনুযায়ী, একদিন স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুমে পিলু তাকে এবং জেলার আরেক কিশোরী ক্রিকেটারকে একসঙ্গে চেপে ধরেছিলেন।
এই ভুক্তভোগী বলেন, ‘উনি জোরজবরদস্তি করে প্রথমে আমাকে চুমু খেতে গেছে। পরে আমাকে পারেনি, আমি ওনার বগলের নিচ দিয়ে চলে আসছি। আর ওকে রুমের মধ্যে আমার সামনেই চুমু খেয়েছে।...স্যার যখন বের হয়েছে, আমি বললাম, স্যার, আপনি কাজটা ঠিক করেননি। আমরা ছোট মানুষ।’ ওই মেয়েটা স্যারের জন্যই মাঠ ছেড়ে চলে গেছে।’
আরেকজন ব্যাট ও হেলমেট আনতে পিলুর বাসায় গিয়েছিলেন। তাকে একা পেয়ে পিলু চুমু খেতে চাইলে তিনি ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে আসেন।
তৃতীয়জনের অভিজ্ঞতাও একই রকম। এক বৃষ্টির দিনে অনুশীলনে লোক কম ছিল। মেয়েটি বলেন, ‘হঠাৎ করে আমাকে পিছন থেকে জোরে জড়িয়ে ধরছে।...সব সময় সে মাঠে বলত যে, “তোকে জড়ায় ধরতে মন চাচ্ছে।”... ছেড়ে দেওয়ার পর বলছে, “আমাকে ঠোঁটে একটা লিপ কিস কর।”’
পিলুর কাছেই ক্রিকেট শুরু করেছিলেন রেশমা আক্তার আদুরি। তিনি ২০০৭ সালে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের নারী টুর্নামেন্টে অংশ নিতে যাওয়া বাংলাদেশ দলের সদস্য ছিলেন। অবসরের পর খুলনা জেলা ও বিভাগীয় দলের সহকারী কোচ ছিলেন। ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর দ্য হুইসেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আদুরি জানান, সতীর্থরা তার কাছে পিলুর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। তার ভাষায়, কাউকে পিলু টেক্সট করতেন, ‘আমার রুমে চলে আসিস।’ আবার কাউকে বলতেন, ‘নে, চাবিটা নে, রুমে যা। আমি আসতেছি।’
২০১৯ সালে ময়মনসিংহে নারীদের প্রথম অনূর্ধ্ব-১৮ জাতীয় ক্রিকেট লিগে পিলু ছিলেন খুলনা বিভাগের প্রধান কোচ, আদুরি ছিলেন সহকারী। আদুরি নিজে কোনো ঘটনা ঘটতে দেখেননি, তবে তার প্রায়ই খটকা লাগত।
প্রধান কোচ খেলোয়াড়দের আলাদা করে রুমে ডেকে পাঠাতেন। আদুরি মেয়েদের বলতেন, ‘যে-ই ডাকুক, যার কাছেই যাও, একা যাইয়ো না।’
আদুরি জানান, তার চেনা কয়েকজন মেয়ে এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচার একটাই পথ খুঁজে পেয়েছিলেন—খেলা ছেড়ে দেওয়া।
আয়েশা আক্তার শুকতারা বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ওয়ানডে আর প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলা নারী ক্রিকেটারদের একজন। তিনি এখন খুলনা বিভাগীয় নারী দলের প্রধান কোচ। তিনিও পিলুর কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
শুকতারা জানান, তার নিজের সঙ্গে এমন কিছু ঘটেনি বা তিনি পিলুকে কাউকে জড়িয়ে ধরতেও দেখেননি। তবে দেখেছেন, পিলু কথা বলার সময় মেয়েদের হাত ধরতেন, কাঁধে হাত রাখতেন। এ ধরনের কথা তিনি অনেকের কাছে শুনেছেন। শুকতারা বলেন, ‘অনেকবার নাকি বিচারও বসছে।’
খুলনা বিভাগীয় স্টেডিয়ামে গত ২৯ সেপ্টেম্বর ইমতিয়াজ হোসেন পিলুর সাক্ষাৎকার নিই আমরা। শুরুতে হাসিমুখে নিজের অবদানের কথা বলছিলেন তিনি। তবে মেয়েদের হয়রানির প্রশ্ন তুলতেই তার সেই হাসি মিলিয়ে যায়।
‘আপনি ১০০ মেয়েকে তৈরি করেছেন, তাদের কতজন আপনার হাতে হয়রানির শিকার?’ এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, হইছে। এমন না যে হয় নাই।’
‘কতজনকে জড়িয়ে ধরেছেন?’ তার উত্তর, ‘এ রকম ক্লেইম আছে। অনলাইনে একজন অভিযোগ করছে।’
দ্য হুইসেল পিলুকে জানায়, ১০ জন মেয়ে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি এখনো মেয়েদের হয়রানি করেন। জবাবে পিলু বলেন, ‘এগুলো অনলাইনে অনেক কিছু বলা যায়। এগুলোর প্রমাণ দিতে হবে।’
শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ১১ বছর বিসিবির পরিচালক ছিলেন। শেষ তিন বছর তিনি ছিলেন উইমেন্স উইংয়ের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে। দ্য হুইসেল হয়রানির যে অভিযোগগুলো পেয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই তার আমলের।
দ্য হুইসেলকে অনলাইনে দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে গত ৯ সেপ্টেম্বর নাদেল বলেন, ‘এই জায়গায় আমি আপনাকে বলি, বোর্ডের সঙ্গে কিন্তু পিলু সাহেবের সরাসরি সম্পৃক্ততা ওরকম নেই। তিনি বিভাগীয় পর্যায়ে কাজ করেন। তিনি কিন্তু বোর্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না। তো আমরা এই অভিযোগ যে একদম পাইনি, সেটা নয়। কিন্তু ওই যে আমি যে কথাটি আগে বললাম যে কেউ যদি সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ না দিয়ে থাকে…।’
অথচ বিভাগীয় দলগুলো খেলে বিসিবির আয়োজিত টুর্নামেন্টেই। জাতীয় দলের পথে মেয়েদের প্রথম বাছাইও এই বিভাগীয় দল থেকেই হয়। বিভাগীয় কোচও বিসিবি নিয়োগ দেয়।
২০২৩ সালে খুলনা বিভাগীয় নারী দলের কোচের দায়িত্ব ছাড়েন পিলু। তবে তিনি এখনো খুলনা বিভাগীয় স্টেডিয়ামে নিজের একাডেমিতে নিয়মিত মেয়েদের প্রশিক্ষণ করান। তার এক সাবেক সহকারী জানান, এখন কিশোর বয়সী যে মেয়েরা পিলুর কাছে অনুশীলন করে, তারাও হয়রানির মুখে পড়ছে।
আদুরি এখন ঢাকায় থাকেন। আমরা তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, পিলুর বিরুদ্ধে এ ধরনের হয়রানির অভিযোগ এখনো চলছে কি না। আদুরির উত্তর ছিল এককথায়—‘হ্যাঁ, এখনো চলছে।’
ক্লাব থেকে ক্যাম্প: হয়রানির একই চিত্র
বিভাগের গণ্ডি পেরোতে পারলে একজন নারী ক্রিকেটার ঢাকায় আসেন। এরপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিয়ে লিগে নিজেকে প্রমাণ করতে পারলেই খোলে জাতীয় দলের দরজা। সেই সুযোগ অবশ্য খুব সীমিত।
গত বছর ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন নারী লিগে দল ছিল নয়টি। আর ২০২৫-২৬ মৌসুমে এই টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিতই হয়নি। বিসিবির তথ্য বলছে, নিবন্ধিত প্রায় ৮০০ নারী ক্রিকেটারের মধ্যে প্রতিবছর ঢাকা প্রথম বিভাগ, প্রথম বিভাগ বাছাই এবং প্রিমিয়ার লিগে খেলার সুযোগ পান ৪০০ জনের মতো।
তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কোন মেয়ে দলে থাকবেন, তা ঠিক করেন কে? উত্তরটা দিয়েছেন উইমেন্স উইংয়ের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বাবু। ক্লাবগুলো দল গড়ে কীভাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ক্লাবগুলো যেগুলো আছে, সেখানে কোচের ভূমিকা বিশাল।’
জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার আরেকটি পথ হচ্ছে বিসিবির বয়সভিত্তিক দল। বিভাগে বিভাগে বাছাই হয়, খেলোয়াড় বাছাই করেন বোর্ডের নির্বাচকেরা। বাছাই হওয়া মেয়েরা যান বিসিবির ক্যাম্পে, সেখানে দায়িত্বে থাকেন বোর্ডের কোচ আর নির্বাচক। বিসিবির জাতীয় লিগে কে একাদশে নামবেন, তা ঠিক করেন বিভাগীয় দলের কর্মকর্তারা। এর পরের ধাপ বোর্ডের বেতনভুক্ত খেলোয়াড়ের তালিকা, তারপর চুক্তি।
অর্থাৎ জেলার মাঠ থেকে চুক্তি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে একেকজন কর্তাব্যক্তির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে একটি মেয়ের পরবর্তী ধাপে ওঠার সুযোগ: জেলা বা বিভাগীয় কোচ, ক্লাবের কোচ, ক্যাম্পের কোচ ও নির্বাচক।
এই পথের দুটি ধাপে তিনজনের বিরুদ্ধে প্রায় একই ধরনের অভিযোগ পেয়েছে দ্য হুইসেল—ক্লাব আর বিসিবির কোচ রুহুল আমিন; একাডেমি আর ক্লাবের কোচ সাইফুল ইসলাম খোকন; বয়সভিত্তিক দলের বাছাইয়ে নির্বাচক সজল আহমেদ চৌধুরী।
অভিযোগের ধরন এক। আগে সুযোগের প্রলোভন, তারপর প্রস্তাব এবং তা প্রত্যাখ্যান করলে শাস্তি। আর এই তিনজন একে অপরের অচেনা নন। কখনো কখনো সহযোগীও বটে।
ক্লাবেও তিনি, ক্যাম্পেও তিনি
ঢাকার নারী ক্রিকেটে প্রভাবশালী কোচদের একজন রুহুল আমিন। তার প্রভাব ছিল তিন জায়গায়—খেলাঘরের মাঠে, ক্লাব ক্রিকেটে আর বিসিবির ক্যাম্পে।
মেয়েটির ভাষায়, রুহুল তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি ঢাকাতে আসো, প্র্যাকটিস করো, তোমার ফিউচার ভালো আছে।’
বাবা-মাকে রাজি করিয়ে তিনি সরাসরি খেলাঘরের হোস্টেলে উঠেছিলেন। প্রথম কয়েক মাস ভালোই কাটে। দিনে দুই বেলা অনুশীলন, মাঠ আর ঘর। কিছুদিনের মধ্যে মেয়েদের প্রথম অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় ক্যাম্পের জন্য দল ঘোষণা করা হয়। সেখানে তার নাম ছিল।
মেয়েটি জানান, ঝামেলা শুরু হয় তখন থেকে। রুহুল এমনভাবে কথা বলতে শুরু করেন, যেন মেয়েটির ক্যাম্পে জায়গা পাওয়ার পুরো কৃতিত্ব তার। অথচ খেলাঘরে আসার আগেই মেয়েটি অনূর্ধ্ব-১৮ জাতীয় লিগে ভালো খেলে এসেছিলেন।
২০২০ সালের শুরুতে কক্সবাজারে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের প্রথম ক্যাম্প বসে। বিসিবির কোচ হিসেবে সেখানে ছিলেন রুহুলও। মেয়েটি বলেন, রুহুল তাকে বারবার প্রশ্ন করতেন, ‘তুই আমার একাডেমির, তোরে আমি এখানে নিয়ে আসলাম, তুই কেন আমার রুমে এসে কথা বলিস না?’
মেয়েটির ভাষায়, রুহুল অন্য মেয়েদের নাম উল্লেখ করে আরও বলতেন, ‘ও আমার রুমে আসে, বসে থাকে, কথা বলে, ও ভালো করতেছে। দেখবি ও ভালো জায়গায় যাবে।’
তারপর এলো এক শুক্রবার। ওই দিন রুহুল নিজে রান্না করে মেয়েদের খাওয়াতেন। মেয়েরাও রান্নায় হাত লাগাতেন। সেদিন মেয়েটি চুলার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে মাছ নাড়ছিলেন। রুহুল পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরেন, আর বারবার পেছনের দিকে তাকাতে থাকেন। মেয়েটি জানান, কেউ একজন রান্নাঘরের দিকে আসতেই রুহুল চমকে সরে যান।
এরই কয়েক দিন পর কোচের ঘরে স্পর্শের সেই ঘটনা ঘটে, যার বর্ণনা এই প্রতিবেদনের শুরুতে আছে। মেয়েটি জানান, এরপর সুযোগ পেলেই রুহুল তাকে স্পর্শের চেষ্টা করতেন। চেয়ার আনতে ঘরে পাঠাতেন, তারপর দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেন।
একদিন রুহুল মেয়েটিকে বলেন, ‘কোনো কিছু পাইতে হলে কোনো কিছু ছাড় দিতে হয়।’ মেয়েটি ছাড় দেননি। তিনি খেলাঘর ছেড়ে অন্য একাডেমিতে চলে যান।
সেখানে তার খেলার উন্নতি হচ্ছিল। কিন্তু প্রিমিয়ার লিগে দল পেতে তাকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অবশেষে দল পান, কিন্তু পারিশ্রমিক ছিল প্রথম বিভাগের চেয়ে কম। মেয়েটির ধারণা, রুহুল যেসব ক্লাবের দল ‘গুছায়ে দেয়’, সেখানে তার জায়গা হতো না।
মেয়েটি এখন আর ক্রিকেট খেলেন না। তিনি বলেন, ‘সবকিছু মিলায়ে আমি ক্লান্ত হয়ে আসলে ডিসিশনটা নিছি।’
রুহুলের প্রভাবের কথা বলেছেন জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার আয়েশা আক্তার শুকতারাও। ক্যারিয়ারের শেষ দিকে বিকেএসপির এক ক্যাম্পে ডাক পেয়েছিলেন তিনি। শুকতারা জানান, যোগ দেওয়ার আগেই তিনি শুনেছিলেন, রুহুল কয়েকজনকে বলেছেন যে এটাই তার শেষ ক্যাম্প। যত ভালোই খেলুন, তাকে দলে রাখা হবে না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রুহুল আমিন নিজেকে গুটিয়ে নেন। কয়েক দফা তাকে ফোন করা হয়, কিন্তু তিনি ক্যামেরার সামনে আসতে রাজি হন না। অবশেষে রুহুল উত্তরার একটি মাঠে খেলা দেখতে গেছেন, এমন খবর পেয়ে গত ১৩ অক্টোবর সেখানে যায় দ্য হুইসেল।
‘আমাকে মাফ করেন’ বলে রুহুল হাতজোড় করে প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে চান। হয়রানির অভিযোগগুলোর ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলোর কোনো কিছুই আমি করি নাই।’
গুরুর পথে শিষ্য
রুহুল আমিনের হাত ধরে কোচিং শুরু করেছিলেন সাইফুল ইসলাম খোকন। খেলাঘরে তিনি আট বছর সহকারী কোচ ছিলেন, পরে নিজের একাডেমি খোলেন। তিনি জানান, ছেলে আর মেয়ে মিলিয়ে প্রায় ২৫টি ক্লাব ও একাডেমির কোচ ছিলেন।
সাইফুল এখন বাংলাদেশ পুলিশ ক্রিকেট ক্লাবের নারী দলের কোচ। দলটি প্রিমিয়ার লিগ খেলে। দল গঠনে নিজের ক্ষমতা নিয়ে সাইফুলের কোনো লুকোছাপা নেই। গত ৭ অক্টোবর দ্য হুইসেলকে তিনি বলেন, ‘আমি কাকে নেব, কাকে খেলাব, এটা একমাত্র আমার ওপর ডিপেন্ড করবে।’
দুজন নারী ক্রিকেটার আলাদাভাবে দ্য হুইসেলকে জানিয়েছেন, এই ক্ষমতাকেই সাইফুল প্রলোভন হিসেবে ব্যবহার করেছেন। পুলিশ দলে আর জাতীয় দলে সুযোগ করে দেওয়ার কথা বলে তাদের অনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে দুজনের পরিচয় গোপন রাখা হচ্ছে।
প্রথমজন গ্রামের মেয়ে, ঢাকায় এসে সাইফুলের অধীনে অনুশীলন শুরু করেছিলেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাইফুল তাকে বলতেন, ‘তুমি আমার সঙ্গ দাও, ফিজিক্যালি রিলেশন করো, আমার সাথে ঘুরতে যাও, তাহলে তোমাকে পুলিশ টিমের ফার্স্ট ডিভিশন খেলতে দেওয়া হবে।’
মেয়েটি জানান, সাইফুল তার থাকা-খাওয়ার খরচ দেওয়ার কথাও বলেছেন। তিনি রাজি না হলে শুরু হয় বকাঝকা আর অপমান। মেয়েটি বলেন, ‘আমি গরিব ঘরের মেয়ে, এখানে খেলতে আসছি।’ একপর্যায়ে খেলা ছেড়ে তিনি গ্রামে ফিরে যান।
দ্বিতীয়জনের অভিযোগ, অনুশীলনের সময় সাইফুল তাকে নানাভাবে স্পর্শ করতেন। এক রাতে সাইফুল তাকে ফোন করে বলেন, পরদিন তার বাসায় দলের সবাইকে দাওয়াত করা হয়েছে, সেখানে তার স্ত্রীও উপস্থিত থাকবেন।
পরদিন বিকেলে সাইফুলের বাসায় গিয়ে মেয়েটি দেখেন, সেখানে তিনি একা। মেয়েটি দ্য হুইসেলকে বলেন, ‘তারপর উনি আমার সাথে বাজে ভাষায় বিভিন্ন কথা বলা শুরু করে, বাজে অফার করে এবং ফিজিক্যালি অ্যাটাচড হইতেও বলে।’
মেয়েটির ভাষ্যে, সাইফুল তাকে বলেন, তার কথামতো চললে পরের বছর তাকে পুলিশ দলে খেলাবেন, জাতীয় দলে তুলে দেবেন। মেয়েটি চলে যেতে চাইলে সাইফুল জোর করার চেষ্টা করেন। তখন হঠাৎ বাসায় ফেরেন সাইফুলের স্ত্রী, যিনি বর্তমানে তার সাবেক স্ত্রী। মেয়েটি দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন, সব খুলে বলেন।
সাইফুলের সেই সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছে দ্য হুইসেল। মেয়েটির বর্ণনা সঠিক কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, এটা সত্য।’
তিনি আরও জানান, এ নিয়ে তাদের মধ্যে অনেক ঝগড়া হয়েছে এবং সাইফুল আরও কয়েকজন মেয়ের সঙ্গে এমন আচরণের কথা স্বীকার করেছিলেন।
ঢাকার বিজি প্রেস মাঠে নিজের একাডেমিতে সাইফুল নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেন। সেখানে দ্য হুইসেল তাকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রশ্ন করে। দল পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে মেয়েদের যৌন হয়রানি করেছেন কি না, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, ভুল ধারণা। এ রকমের কখনো আমি করিও নাই।’
নির্বাচকের ফোন
বয়সভিত্তিক দলে ক্ষমতার আরেক কেন্দ্র নির্বাচক। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন বছর সজল আহমেদ চৌধুরী একই সঙ্গে নারী দলের নির্বাচক আর বয়সভিত্তিক দলের ম্যানেজার ছিলেন। বিভাগ থেকে বিভাগে ঘুরে তিনি অনূর্ধ্ব-১৮ আর অনূর্ধ্ব-১৯ দলের খেলোয়াড় বাছাই করতেন।
রাজশাহীর বাঁহাতি ব্যাটার খাদিজা আক্তার লামিয়ার বয়স তখন ১৭। ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি দ্য হুইসেলকে জানান, সজলের সঙ্গে তার পরিচয় হয় রাজশাহীর একটি হোটেলে, ২০২৪ সালের শেষ দিকে। সেই পরিচয় করিয়ে দেন রুহুল আমিন। লামিয়ার দুর্ভোগ তখন থেকেই শুরু।
লামিয়া জানান, প্রথম দিন সজল স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন। কয়েক দিন পর তাকে ডেকে পরিবারের খোঁজ নেন। বাবা-মা দুজনেই চাকরি করেন, ছোট ভাই অসুস্থ, ঢাকায় গিয়ে অনুশীলনের সামর্থ্য নেই—সব শোনেন।
২০২৫ সালে রাজশাহীতে অনূর্ধ্ব-১৮ দলের বাছাইয়ের একটি ঘটনা নিয়ে লামিয়া জানান, নেটে ব্যাটিং শেষে বের হতেই সজল তাকে ডেকে তার চোখ, ঠোঁট আর শরীরের গড়ন নিয়ে মন্তব্য করেন।
বাছাইয়ে নির্বাচিত হয়ে লামিয়া অনুশীলনের জন্য ঢাকায় আসেন। লামিয়া জানান, সজল আগেই বলেছিলেন, ঢাকায় এলে তাকে জানাতে; তিনি সব ব্যবস্থা করে দেবেন। এরপর এক সন্ধ্যায় সজলকে ফোন করেন।
ফোনটি লাউডস্পিকারে ছিল। তখন ঢাকায় লামিয়ার রুমমেট আফিয়া হুমায়রা আনাম প্রত্যাশাও রুমে ছিলেন। তিনি ২০২৩ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে খেলেছেন। প্রত্যাশা বলেন, ‘আমি আই লাভ ইউটা ফার্স্ট শুনি।’
লামিয়া চুপ করে গেলে ওপাশ থেকে প্রশ্ন আসে, তার কি বয়ফ্রেন্ড আছে? প্রত্যাশা জানান, তিনি শোনেন সজল বলছে, ‘যদি থাকে তো প্রবলেম নাই, আমারও তো ওয়াইফ আছে।’
লামিয়া জানান, সেই ফোনালাপে সজল তাকে একটি প্রস্তাব দেন। লামিয়ার ভাষায়, সেটি ছিল, ‘তোমার ঢাকার খরচ আমি চালাই দিবো, তোমার খাওয়া-দাওয়া, তোমার পুরা লাইফ সেটেল করে দিবো, তোমাকে ওয়ার্ল্ড কাপ খেলাবো, তুমি যদি আমার কথামতো চলো আর আমার সাথে সম্পর্ক রাখো।’
লামিয়া জানান, এই ঘটনার পর তিনি ফোন কেটে নম্বরটি ব্লক করে দেন।
২০২৫ সালের মে মাসে খুলনায় বিসিবির অনূর্ধ্ব-১৮ জাতীয় লিগ অনুষ্ঠিত হয়। রাজশাহী বিভাগীয় দলে ছিলেন লামিয়া, কিন্তু একটি ম্যাচও খেলতে পারেননি। এক রাতে দলের এক কর্মকর্তা তাকে জানান, পরদিন তিনি খেলবেন। কিন্তু সকালে মাঠে গিয়ে দেখেন, একাদশে তার নাম নেই।
লামিয়া জানান, টুর্নামেন্ট চলাকালে অচেনা একটি নম্বর থেকে সজল ফোন করে বলেন, ‘তুমি আমার কোনো কিছু অ্যাকসেপ্ট করো নাই।’ এর কিছুদিন পর স্টেডিয়ামে ড্রেসিংরুমে যাওয়ার পথে সজল তাকে বলেন, ‘ঠিক আছে, দেখে নিব তুমি কেমনে খেলো।’
সজলের এই হয়রানি নিয়ে লামিয়া গণমাধ্যমে মুখ খোলার পর রাজশাহী দলের ম্যানেজার রোজী তাকে ফোন করেন। লামিয়া বলেন, রোজী ভয় দেখান যে সজল তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করবেন।
লামিয়া কলটি রেকর্ড করেছিলেন। রেকর্ডটি দ্য হুইসেলের কাছে রয়েছে।
সজলের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু খেলোয়াড়দের নয়। ২০২৩ সালে রাজশাহীতে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্যাম্পে নারী মাসাজ থেরাপিস্ট ছিলেন তাজিয়া আক্তার। তার কাজ খেলোয়াড়দের পেশির ক্লান্তি দূর করা। তাজিয়া বলেন, সজল তাকে বারবার শরীর মালিশ করে দিতে বলতেন।
হোটেলে লিফটের পাশে ছিল তাজিয়ার ঘর, আসতে-যেতে সজল দরজায় কড়া নাড়তেন। কয়েক দিন এমন চলার পর তাজিয়া নিজেই প্রমাণ রাখতে শুরু করেন। সজল যে মাসাজ নিচ্ছিলেন, সেই ছবি দ্য হুইসেলকে দিয়েছেন তাজিয়া।
বিভিন্ন মাধ্যমে কয়েক দফা চেষ্টা চালানোর পর গত ২০ অক্টোবর মোবাইল ফোনে সজল চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। তিনি দ্য হুইসেলকে জানান, এসব বিষয় নিয়ে বিসিবিতে তিনি সব জবাব দিয়েছেন। মাসাজ নেওয়ার ছবিটি যে তার, তা স্বীকার করে সজল দাবি করেন, জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে মাঠের মেডিকেল রুমে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে হয়েছিল।
আর লামিয়ার অভিযোগগুলো নিয়ে জানতে চাওয়া হলে সজল বলেন, ‘ওরকম কোনো কিছু তার সাথে আমার কথা হয়নি।… এগুলো অ্যাবসলিউটলি ফেইক জিনিস।’
একই বৃত্ত
তিনজন তিন ধাপের মানুষ। কিন্তু তারা একে অপরের অচেনা নন।
সাইফুল কোচিং শিখেছেন রুহুলের সহকারী হিসেবে, খেলাঘরে আট বছর। রুহুল ও সজল একসঙ্গে বিভিন্ন বিভাগে খেলোয়াড় বাছাই করতে যেতেন। লামিয়াকে সজলের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন রুহুল নিজেই। সজলের বিরুদ্ধে মুখ খোলার পর লামিয়াকে মামলার ভয় দেখিয়েছিলেন সজলের ঘনিষ্ঠ এক দলীয় ম্যানেজার।



তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন নারী ক্রিকেটার যে পথ ধরে জাতীয় দলের দিকে এগোন, তার এক দরজা থেকে আরেক দরজা পর্যন্ত পাহারায় থাকেন এই একই বৃত্তের মানুষ। একজনকে ‘না’ বললে খবর পরবর্তী জনের কাছেও পৌঁছে যায়। এই আশঙ্কা মেয়েদের কথায় বারবার এসেছে।
রেশমা আক্তার আদুরি বলেন, ‘আপনি ঘুরেফিরে দেখেন যে প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকে রিলেটেড। তো একটা মেয়ে যখন এই ধরনের সমস্যা ফেস করতেছে, তো ও ভালো করেই জানে যে এ এখানে গিয়ে বললে আসলে কোনো লাভই হবে না। কারণ, একজনের পর একজন, একজনের পর একজন—এরা সবাই একই রাস্তার মানুষ।’
অভিযোগ উঠলে, কিংবা গণমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হলে, বিসিবি সাধারণত অভিযুক্তকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছে। শাস্তি বলতে এটুকুই। আর কিছুই নয়।
উইমেন্স উইংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের দাবি, অভিযোগ কানে আসার পরই তারা রুহুলকে সরিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘এই ধরনের কথাবার্তা যখন আমাদের কানে আসলো, আমরা কিন্তু রুহুলকে সরিয়ে দিয়েছি। আমরা কিন্তু রুহুলকে উইমেন্স উইংয়ে রাখি নাই।’
কিন্তু নথি বলছে ভিন্ন কথা। রুহুল আমিন ও সজল চৌধুরী বিসিবির বেতনভুক্ত ছিলেন ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। নবনির্বাচিত বোর্ড দুজনের চুক্তি বাতিল করে। উইমেন্স উইংয়ের বর্তমান চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘এটা অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, পরিতাপের বিষয় ছিল। এগুলি আমরাও দেখেছি, শুনেছি। সেটার বিরুদ্ধে আমি এসেই ব্যবস্থা নিয়েছি।’
অভিযোগগুলো কী ছিল, জানতে চাইলে তিনি পরিষ্কার করে কিছু বলেননি। শুধু বলেন, ‘ডেফিনেটলি কিছু কিছু অভিযোগের ভিত্তিতেই বের করেছি।’
রফিকুল নিজে যৌন হয়রানিকে ফৌজদারি অপরাধ মনে করেন। অথচ দুজনকে চাকরি থেকে সরানো ছাড়া বোর্ড আর কিছু করেনি। পুলিশে অভিযোগ দেয়নি, আইনি ব্যবস্থা নেয়নি।
সাইফুল ইসলাম খোকনের ক্ষেত্রে সেটুকুও হয়নি। তিনি বিসিবির চুক্তিভুক্ত নন, তাই তার বিষয়ে বোর্ডের কোনো পদক্ষেপ নেই। তিনি এখনো পুলিশ ক্লাবের নারী দলের কোচ, যে দল বিসিবি আয়োজিত প্রিমিয়ার লিগে খেলে। আর রুহুল এখনো মাঠে কোচিং করাচ্ছেন।
তিনজনকে সরানো বা না সরানোর চেয়ে বড় প্রশ্ন অন্যখানে। আর তা হচ্ছে, মেয়েরা যখন অভিযোগ করেছিলেন, সেই অভিযোগ কোথায় গিয়েছিল?
জাতীয় দলেও একই ছক
তৃণমূলের সব ধাপ পেরিয়ে যারা জাতীয় দলে পৌঁছান, তাদের নিয়ন্ত্রকদের বৃত্তটা আরও ছোট হয়ে আসে। ক্ষমতার লাগাম তখন থাকে আরও কম মানুষের হাতে।
জাতীয় দলে জায়গা পেলে ঢোকা যায় বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তিতে। বিসিবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন এই চুক্তির আওতায় আছেন ১৭ নারী ক্রিকেটার। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট মিলিয়ে সংখ্যাটা ৫৮। চুক্তি হয় এক বছরের। পরের বছর চুক্তি নবায়ন হবে কি না, গ্রেড বাড়বে না কমবে, তা ঠিক হয় নির্বাচকদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে।
মাসের বেতন, দলে ঠাঁই পাওয়া, বিদেশ সফর—সবই বাঁধা এই চুক্তিতে। ফলে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করার আগে একজন মেয়েকে হিসাব করতে হয়, পরের বছরের চুক্তি হয়তো তারই হাতে।
২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আড়াই বছর এই ক্ষমতার বড় অংশ ছিল একজনের হাতে। তিনি জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি ছিলেন একাধারে নারী দলের নির্বাচক আর ম্যানেজার।
গত ৮ সেপ্টেম্বর হোয়াটসঅ্যাপ কলে দ্য হুইসেলকে মঞ্জু বলেন, ‘ওই সময় নারী ক্রিকেট দলে আমি একাই নির্বাচক ছিলাম। আর তখন জাতীয় দলের ম্যানেজারও ছিলাম আমি নিজেই।’
অর্থাৎ, দলে কে থাকবেন, তা ঠিক করতেন তিনি। সফরে দলের দেখভালের দায়িত্বও ছিল তার। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলম যৌন হয়রানির বড় অভিযোগটি করেছেন এই মঞ্জুর বিরুদ্ধেই।
জাহানারা বলছেন, ২০২১ সালের মার্চে উইমেন্স উইংয়ের প্রয়াত ইনচার্জ তৌহিদ মাহমুদের একটি ‘পরোক্ষ কুপ্রস্তাব’ তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। জাহানারার ভাষ্যে, ‘তারপর থেকে কিন্তু স্টার্ট হয় টর্চারিং, দশ-এগারো মাস ধরে চলে এই চাপ; ধীরে ধীরে সুযোগ-সুবিধাও কমতে থাকে।’ এরপর ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে বিশ্বকাপে মঞ্জু তাকে সরাসরি যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব দেন।
যৌন হয়রানির এসব অভিযোগ জাহানারা প্রথম করেন ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর, সামাজিক মাধ্যমে স্পোর্টস কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিয়াসাদ আজিমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে।
এটা নিয়ে দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে সমালোচনার ঝড় উঠলে সে রাতেই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলে ঘোষণা দেয় বিসিবি। পরে আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি তারিক উল হাকিমের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়। চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি বোর্ড সেই কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য জানিয়ে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাহানারার করা চারটি অভিযোগের মধ্যে দুটিতে মঞ্জুর বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। ২২ ফেব্রুয়ারি আরেকটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মঞ্জুকে দেশের সব ধরনের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করার কথা জানায় বিসিবি।
কিন্তু হয়রানির ঘটনা সামনে আনতে জাহানারা কেন প্রায় চার বছর দেরি করলেন? গত ১২ সেপ্টেম্বর দ্য হুইসেলকে অনলাইনে দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে জাহানারা বলেন, ‘আমি বোর্ডের চুক্তিভুক্ত খেলোয়াড় ছিলাম। আপনি চাইলে অনেক কিছু বলতে পারবেন না...আমি যখন খেলছি, ইতিমধ্যে দেখছি যে জিনিসগুলো করে এসেছি এবং যেভাবে সহ্য করতেছি, কেবল টেকনিক্যালি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য। তখন যদি আমি যৌন হয়রানির কথাটা উল্লেখ করতাম, তাহলে আমাকে কোনো না কোনোভাবে পুরোপুরি ক্রিকেট থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে, বহিষ্কার করে দেওয়া হবে।’
চুক্তি অনুমোদনের ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে, তা সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায় খাদিজাতুল কুবরার গল্পে। মেয়েদের ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সেরা বোলিং ফিগার এখনো এই স্পিনারের। কুবরা বলছেন, ২০২১ সালে তিনি তখনকার নির্বাচক ও ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুর রোষানলে পড়েন। এর জেরে প্রথমে তিনি দল থেকে বাদ পড়েন। এরপর তার চুক্তির গ্রেড ‘এ’ থেকে ‘ডি’তে নেমে যায়, শেষ পর্যন্ত বেতনও বন্ধ হয়ে যায়।
কুবরা মঞ্জুকে ফোন করে এর কারণ জানতে চেয়েছিলেন। মঞ্জু বলেছিলেন, এটা ‘পানিশমেন্ট’। তবে কিসের শাস্তি, তা বলেননি। কোচ মাহমুদ ইমন বলেছিলেন, তার কিছু করার নেই, এটা নির্বাচকদের বিষয়।
আর নারী বিভাগের ইনচার্জ প্রয়াত তৌহিদ মাহমুদ বলেছিলেন, নির্বাচককে জিজ্ঞেস করো। তিন দরজা ঘুরে কুবরা ফিরে যান সেই মঞ্জুর কাছেই। ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর দ্য হুইসেলকে কুবরা বলেন, ‘পেঁচাই দিছে; আমি কাকে বলব? আমাকে জানতে হবে তো; আমি তো ফর্মে ছিলাম…।’
২০২৪ সালের ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ৮ ইনিংসে ২৩ উইকেট নিয়ে তিনি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হন। তবু তাকে ক্যাম্পে ডাকা হয়নি।
সাবেক অধিনায়ক রুমানা আহমেদও বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরীর কাছে গিয়েছিলেন। রুমানার মতে, ভালো খেলেও তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, দলের ভেতরে ‘সিন্ডিকেট’ চলছে। চেয়ারম্যান, সিইও আর নির্বাচককে নিয়ে বৈঠক হয়েছিল। কিছু বদলায়নি।
২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর রুমানা দ্য হুইসেলকে বলেন, ‘এই পর্যন্ত কোনো আওয়াজ তুলে কোনো ভালো ফলপ্রসূ [ফল] পাইনি; বরং যারাই এ পর্যন্ত এইগুলো নিয়ে কথা বলেছি, তারাই কিন্তু এখন ব্যাক সাইডেই আছে।’
জাহানারা, কুবরা আর রুমানা—তিনজনই গিয়েছিলেন বোর্ডের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের কাছে। কারণ, অভিযোগ জানানোর আর কোনো জায়গা বিসিবিতে ছিল না।
অভিযোগ জানানোর দরজাই ছিল না
অভিযোগ জানানোর একটা আলাদা জায়গা থাকার কথা ছিল ১৬ বছর আগেই। ২০০৯ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট এক রায়ে দেশের সব কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে অভিযোগ কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করেন। কমিটির প্রধান হবেন একজন নারী এবং অন্তত দুজন সদস্য হবেন প্রতিষ্ঠানের বাইরের। আইন না হওয়া পর্যন্ত এই নির্দেশনা সবাইকে মানতে হবে—বলেছিলেন আদালত।
বিসিবি তা মানেনি। নিজাম উদ্দিন চৌধুরী ২৬ বছর ধরে বোর্ডে আছেন, সিইও পদেই ১২ বছর হলো। এত দিন কেন কমিটি হয়নি, তা জানতে চাইলে তিনি জানান, সমস্যা এলে তা সামলানো হতো ‘অ্যাডহক বেসিসে’ ।
জাহানারার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্দেশনা পেয়ে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বোর্ড অভিযোগ কমিটি গঠন করলেও তামিম ইকবালের নির্বাচিত বোর্ডে সেই কমিটি এখন নেই।
উইমেন্স উইংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের মতে, কমিটির দরকারই ছিল না। তার যুক্তি, মেয়েরা চাইলেই পরিচালক, সিইও বা সভাপতির কাছে যেতে পারতেন। মেয়েরা গিয়েছিলেনও। ফল কী হয়েছে, তা আগেই বলা হয়েছে।
অথচ এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা অনেক ঘটনা ঘটেছে বিসিবির নিজের আয়োজনেই: কক্সবাজারের অনূর্ধ্ব-১৯ ক্যাম্পে, রাজশাহীর বাছাইপর্বে, খুলনার অনূর্ধ্ব-১৮ জাতীয় লিগে, আর বিশ্বকাপে জাতীয় দলের সফরে।
নতুন বোর্ড আসার পরও ছবিটা বদলায়নি। গত ৮ অক্টোবর উইমেন্স উইংয়ের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বাবু দ্য হুইসেলকে বলেন, ‘না, আমাদের অভিযোগ কমিটি করেনি এখনো। কোনো অভিযোগও আসেনি।’
কমিটি না থাকলে অভিযোগ আসবে কীভাবে? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি নিজের দিকে ইশারা করে বলেন, ‘মেয়েরা আমাদের কাছে, আমার কাছে অভিযোগ করবে, আমি অ্যাকশন নেব সাথে সাথে।’
অভিযোগ যদি তার নিজের বিরুদ্ধে হয় তখন? এই প্রশ্নে তিনি কিছুটা থেমে গিয়ে বলেন, ‘মেয়েরা বোর্ডের কাছে যাবে।’
তিনি দ্য হুইসেলকে এমন প্রতিশ্রুতিও দেন যে পরের বোর্ড সভাতেই একটি স্বাধীন অভিযোগ কমিটি গঠন করা হবে।
অর্থাৎ ১৬ বছর পরও বলা হচ্ছে, একজন মেয়ে তাদের কাছেই অভিযোগ জানাবেন, যারা দল গড়েন এবং কোচ আর নির্বাচকদের বসান। অভিযোগ করার দরজা না থাকার দাম কী, তা লেখা আছে বিসিবিরই করানো তদন্ত প্রতিবেদনে, যেটা বোর্ড থেকে নয় মাস ধরে প্রকাশ করা হয়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বিসিবির ব্যর্থতার চিত্র
জাহানারার অভিযোগ তদন্তে বিসিবি সাবেক বিচারপতি তারিক উল হাকিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছিল ২০২৫ সালের ৮ নভেম্বর। পরে আরও দুজন সদস্য নেওয়া হয়। কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয় প্রায় তিন মাস পর, গত ২ ফেব্রুয়ারি।
সেই প্রতিবেদন প্রকাশ না করে ফেব্রুয়ারিতে বোর্ড শুধু দুটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায়, মঞ্জুর বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং তাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরপর সব চুপ।
যিনি অভিযোগ করেছিলেন, তিনিও প্রতিবেদনের কপি পাননি। জাহানারা বলেন, ‘তদন্তের রিপোর্ট আমরা পাইনি, আমরা রেজাল্ট পেয়েছি।’
যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনিও প্রতিবেদনটি পাননি। মঞ্জু বলেন, ‘আমি তো জানিই না যে প্রতিবেদনে আমার বিরুদ্ধে কী লেখা হয়েছে।’
তদন্ত কমিটি গঠন এবং প্রতিবেদন—দুটোই হয়েছিল আমিনুল ইসলাম বুলবুল বিসিবির সভাপতি থাকার সময়। এরপর আসে বর্তমান সভাপতি তামিম ইকবালের অ্যাডহক কমিটির বোর্ড। আর প্রায় পাঁচ মাস ধরে আছে তার নির্বাচিত নতুন বোর্ড।
তিনটি বোর্ডের কোনোটিই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্যোগ নেয়নি।
রফিকুল ইসলাম বাবু অ্যাডহক কমিটির বোর্ডেও ছিলেন। নতুন বোর্ডে তিনি উইমেন্স উইংয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। প্রায় পাঁচ মাসেও তিনি সেই তদন্ত প্রতিবেদনটি পড়েননি। দ্য হুইসেলকে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে এটা এখনো ওইভাবে অফিশিয়ালি হ্যান্ডওভার করা হয়নি।’
সভাপতি তামিম ইকবালও প্রতিবেদনটি পড়েননি বলে জানান বিসিবির সিইও নিজাম উদ্দিন। প্রতিবেদন কেন প্রকাশ করা হলো না? এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যতটুকু ডিসক্লোজ করা সম্ভব, ততটুকু কিন্তু ডিসক্লোজ করা হয়েছে। কিছু তো সেনসিটিভ বিষয় থাকে।’
কিন্তু জাহানারা তো যা বলার, তা প্রকাশ্যেই বলেছেন। তাহলে প্রতিবেদনে এমন কী আছে, যা বোর্ড জানাতে চায় না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই দ্য হুইসেল প্রতিবেদনটি জোগাড়ের চেষ্টা শুরু করে। এটি একজনের অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন, কিন্তু নারী ক্রিকেটে যৌন হয়রানির বিষয়ে এটিই বিসিবির একমাত্র আনুষ্ঠানিক নথি। বোর্ড নিজে কী জানত, কী করেছে আর কী করেনি—সব হিসাব আছে এখানেই।
দুই মাসের চেষ্টার পর সাবেক এক বোর্ড পরিচালকের মাধ্যমে প্রতিবেদনটি দ্য হুইসেলের হাতে আসে।
তদন্ত প্রতিবেদনটি দুটি খণ্ডে বিভক্ত। একটি ৭০ পৃষ্ঠার মূল প্রতিবেদন, অন্য খণ্ডে রয়েছে কমিটির সাক্ষাৎকার নেওয়া ব্যক্তিদের জবানবন্দি, জাহানারার অভিযোগপত্রসহ মোট ১২টি সংযুক্তি। দ্য হুইসেল প্রায় এক মাস ধরে প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বিসিবির চার গাফিলতি
জাহানারার ২০২১ সালের চিঠি বৈঠকে নিষ্পত্তি হয়েছিল বলে সিইও জানালেও এর কোনো লিখিত রেকর্ড বা ফলোআপ ছিল না।
ঘটনার সময় যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিসিবির কোনো পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর কাঠামো ছিল না।
অন্য নারী ক্রিকেটারদের অভিযোগ তদন্তের সুযোগ থাকলেও বিসিবি জাহানারার অভিযোগ ছাড়া আর কোনো অভিযোগ তদন্ত কমিটির কাছে পাঠায়নি।
তদন্ত কমিটির আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ থাকলেও বিসিবি মঞ্জুর বিরুদ্ধে শুধু সাংগঠনিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

সেখানে শুধু একজন ব্যক্তির অপরাধের কথা নেই। কমিটি পাতার পর পাতাজুড়ে লিখেছে বোর্ডের গাফিলতির কথাও। আর সেই অংশগুলোর একটিও বিসিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আসেনি।
প্রথম গাফিলতি জাহানারার একটি চিঠি নিয়ে। ২০২১ সালের শেষে তিনি ১৩ পৃষ্ঠার একটি পর্যবেক্ষণ চিঠি লিখে সরাসরি সিইওর হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
প্রতিবেদনের ৫০ নম্বর অনুচ্ছেদে কমিটি বলেছে, জাহানারার চিঠিটি বোর্ডের গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত ছিল। সিইও কমিটিকে বলেছেন, চেয়ারম্যানের সঙ্গে জাহানারার এক বৈঠকেই চিঠির নিষ্পত্তি হয়েছিল, কিন্তু তার কোনো লিখিত রেকর্ড নেই। চিঠির কোনো লিখিত ফলোআপ না থাকায় কমিটি ‘গভীর উদ্বেগ’ জানিয়েছে।
জাহানারা আলম দ্য হুইসেলকে বলেন, ‘২০২১ সালের আমার এই চিঠির ওপর বেইজ করে একটা তদন্ত হতো বা কিছু হতো, আজকে আমি এত বড় হয়রানির শিকারও হতাম না বা এত নোংরা পর্যায়ে আসত না।’
দ্বিতীয় গাফিলতি কাঠামোগত। প্রতিবেদনের ৫৫ নম্বর অনুচ্ছেদে কমিটি লিখেছে, ঘটনার সময় যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিসিবির ভেতরে কোনো পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর কাঠামো ছিল না, আর তা গড়ে তোলা জরুরি।
অর্থাৎ অভিযোগের দরজাটি যে ছিল না, সেটা বোর্ডের নিজের গঠিত কমিটিই লিখে গেছে।
তৃতীয় গাফিলতি হচ্ছে সুযোগ হাতছাড়া করা। জাহানারার অভিযোগের সূত্র ধরে নারী ক্রিকেটে হয়রানির পুরো চিত্র বের করার সুযোগ ছিল। কমিটির কার্যপরিধিতে বোর্ড নিজেই লিখেছিল, অন্য নারী ক্রিকেটারদের অনুরূপ অভিযোগও কমিটি তদন্ত করতে পারবে, যদি বিসিবি সেগুলো পাঠায়।
অর্থাৎ তদন্ত একজনের অভিযোগে আটকে থাকবে, নাকি বড় ছবি বেরিয়ে আসবে, সেই সিদ্ধান্ত ছিল বোর্ডের হাতে।
প্রতিবেদনের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে কমিটি একটি বাক্যে জানিয়েছে, বিসিবি অন্য কোনো অভিযোগ পাঠায়নি। অথচ সেই সময়েই একাধিক নারী ক্রিকেটার গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে অভিযোগ করছিলেন।
তদন্ত কমিটির প্রধান সাবেক বিচারপতি তারিক উল হাকিম গত ১৫ সেপ্টেম্বর দ্য হুইসেলকে বলেন, ‘আমাদের কাছে পাঠায় নাই।’ তবে তিনি বলেন, ‘কমিটির কাজে বিসিবির “কোনো প্রভাব ছিল না”।’
চতুর্থ গাফিলতি শাস্তির ক্ষেত্রে। প্রতিবেদনের ৫৪ নম্বর অনুচ্ছেদে কমিটি মঞ্জুর বিরুদ্ধে শুধু শৃঙ্খলাজনিত নয়, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করেছিল। বোর্ড দিয়েছে কেবল সাংগঠনিক নিষেধাজ্ঞা, তারও মেয়াদ জানায়নি।
আবার নিষেধাজ্ঞাটি এলো এমন সময়ে, যখন মঞ্জু বোর্ডের কোনো দায়িত্বেই ছিলেন না। ওদিকে মঞ্জু বলেন, শাস্তি দেওয়ার আগে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়নি।
আইনি ব্যবস্থার সুপারিশ কেন মানা হলো না? সিইওর ব্যাখ্যা, বোর্ডের আইনি পরামর্শদাতারা বলেছেন, আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে ভুক্তভোগীকেই। বোর্ড শুধু সহায়তা করবে।
উইমেন্স উইংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল অবশ্য ভিন্নমত দেন, ‘আপনি কোনো নারীকে যদি হয়রানি করেন, তাহলে সেটা ফৌজদারি অপরাধ। আপনি শুধু নিষিদ্ধের মধ্যে কেন থাকবেন?’
প্রতিবেদনে বোর্ডের ব্যর্থতা লুকানো হয়েছে, এ কথা মানেননি সিইও। তবে কমিটির পর্যবেক্ষণের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কিছু লিমিটেশন তো ছিল।’
আর রফিকুল ইসলাম আগের বোর্ড সম্পর্কে বলেন, ‘ওরা বিচার করেনি।’
অভিযোগ এসে আটকে যাওয়াকে কাঠামোগত দুর্বলতা মনে করেন কি না, এমন প্রশ্নে তার উত্তর, ‘ডেফিনেটলি ছিল। কারণ, কারও কারও পার্সোনাল ইন্টারেস্টও থাকতে পারে।’
প্রশ্নের পর ওয়েবসাইটে নীতিমালা
গত ৮ অক্টোবর রফিকুলের সাক্ষাৎকারের পর দ্য হুইসেল বিসিবির সিইও নিজাম উদ্দিনের কাছে যায়। অনুসন্ধানে কী কী উঠে এসেছে, সেগুলো জানিয়ে সাক্ষাৎকার চাওয়া হয়। সেদিন তিনি রাজি হননি। পরে ১৫ অক্টোবর তিনি সাক্ষাৎকার দিতে তার অফিসে ডাকেন।
এর মধ্যে ১২ অক্টোবর থেকে বিসিবির ওয়েবসাইটে একটি পপআপ দেখা যায়। তাতে ক্লিক করলে খোলে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সেফগার্ডিং নীতিমালা’। প্রচ্ছদে তারিখ লেখা আগস্ট ২০২৬।
নীতিমালার ফাইলের মেটাডেটা ও ইন্টারনেট আর্কাইভের ওয়েব্যাক মেশিন যাচাই করে দ্য হুইসেল নিশ্চিত হয়েছে, নীতিমালাটি ১২ অক্টোবরই ওয়েবসাইটে তোলা হয়েছিল। নীতিমালার বিষয়ে বোর্ড এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি।
সিইও নিজাম উদ্দিন চৌধুরী দাবি করেন, নীতিমালাটি জুলাইয়ের শেষে বোর্ড অনুমোদন করেছে। তাহলে আড়াই মাস কেউ জানল না কেন? এর জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা তো ইন্টারনাল পলিসি।’
অভিযোগ কমিটি আছে কি না, এই প্রশ্নে একই সাক্ষাৎকারে তিনি একেকবার একেক কথা বলেছেন। একবার বলেছেন, ‘প্যানেলের পার্টটা হয়ে গেছে।’ পরের বাক্যেই বলেছেন, জমে থাকা অভিযোগগুলো এগোবে ‘এই কমিটি ফরমেশনের পরে’। জমে থাকা অভিযোগ কত, জানতে চাইলে বলেন, ‘তিন-চারটা হতে পারে বা চার-পাঁচটা হতে পারে।’
প্রশ্নের মুখে শেষে স্বীকার করেন, প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।
সিইও পরে জানান, নীতিমালাটি জুলাইয়ের শেষেই অনুমোদিত হয়েছে।
নিজাম উদ্দিন বলেন, খসড়াটি তৈরি হয়েছিল আগের অ্যাডহক বোর্ডের সময়ে, তৎকালীন উইমেন্স উইংয়ের প্রধান ব্যারিস্টার রাশনা ইমামের উদ্যোগে।
কিন্তু প্যানেল বা অভিযোগ কমিটিতে কারা আছেন, অভিযোগ কোথায় ও কীভাবে জমা দিতে হবে, বোর্ড তা এখনো জানায়নি। বিসিবির চুক্তিতে থাকা ১০ জন নারী ক্রিকেটারের সঙ্গে ফোনে কথা বলে দ্য হুইসেল জানতে পেরেছে, তারা কেউ এমন কোনো নীতিমালার কথা জানেন না। শুধু তাই নয়, গত ৩০ অক্টোবর দ্য হুইসেলকে ফোনে নারী দলের নির্বাচক সালমা খাতুন জানান, বিসিবির যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা নীতিমালা সম্পর্কে তিনি কিছু শোনেননি, জানেন না।
আর নীতিমালা অনুযায়ী অভিযোগ কমিটির সদস্য নিয়োগ দেবেন উইমেন্স উইংয়ের চেয়ারম্যান। অথচ ওয়েবসাইটে নীতিমালা তোলার চার দিন আগেও তিনি দ্য হুইসেলকে বলেছিলেন, কোনো কমিটি নেই।
নতুন নীতিমালাটিই অবশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছে, ক্রিকেটে হয়রানির ঝুঁকি কোথা থেকে আসে। বোর্ড সেখানে লিখেছে, এই ঝুঁকি তৈরি হয় দল নির্বাচনের ক্ষমতা, কোচের সঙ্গে সম্পর্ক, চুক্তি আর খেলার সুযোগের ওপর নির্ভরতা থেকে।
ঢাকায় খেলাঘরের হোস্টেল থেকে নিউজিল্যান্ড সফর পর্যন্ত এই প্রতিবেদনের প্রতিটি গল্পে মেয়েরা ঠিক এই ঝুঁকির কথাই বলেছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে মঞ্জুর বিষয়ে কমিটি কী পেয়েছে, কারা কী সাক্ষ্য দিয়েছেন, আর বিসিবি কোন অংশগুলো জানায়নি, তা নিয়ে দ্য হুইসেলের বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে।
নারী ক্রিকেটের সিদ্ধান্তে নারী নেই
নীতিমালা আর কমিটি এখন কাগজে-কলমে আছে। কিন্তু একজন মেয়ে অভিযোগ নিয়ে যাবেন কার কাছে?
বিসিবির নতুন পরিচালনা পর্ষদে একজনও নারী পরিচালক নেই। সেখানে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ যে দুজন পরিচালক মনোনীত করে, আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বোর্ডে সেই কোটায় একজন নারী পরিচালক ছিলেন। এবার দুজনই পুরুষ।
উইমেন্স উইংয়ের চেয়ারম্যান থেকে কোচিং স্টাফ পর্যন্ত প্রায় সব পদেই পুরুষেরা আছেন। জাতীয় পর্যায়ে নারী ক্রিকেটের গুরুত্বপূর্ণ পদে নারী আছেন একজনই, নির্বাচক সালমা খাতুন। দলের সঙ্গে বাকি নারীরা আছেন ফিজিও আর মাসাজ থেরাপিস্ট হিসেবে।
একজন নারী থাকলে কী বদলায়, তা গত ১৯ জুন সালমা নিজেই দ্য হুইসেলকে বলেন, ‘আমি যোগ দেওয়ার পর আসলে মেয়েদের জন্য একটু সুবিধা হচ্ছে। ওরা চিন্তা করে, হয়তোবা আপুর কাছে একটা জিনিস বলতে পারব। হয়তোবা একটা ছেলে নির্বাচক থাকলে সেটা শেয়ার করতে পারে না অনেক সময়।’
আশির দশকে নিজে ক্রিকেট খেলেছেন মনোয়ার আনিস খান মিনু। ২০০৭-০৮ সালে তিনি ছিলেন বিসিবির উইমেন্স উইংয়ের প্রধান। সে সময়কার নারী খেলোয়াড়েরা এখনো তার কথা বলেন। সাবেক ওপেনার শুকতারার ভাষায়, মিনু তাদের ‘নিজের বাচ্চার মতো’ আগলে রাখতেন।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর দ্য হুইসেলকে সাক্ষাৎকার দেন মিনু। তার মতে, মেয়েরা একজন পুরুষ কর্মকর্তার কাছে গিয়ে সব কথা বলতে ‘সাহস করবে না’। তিনি বলেন, ‘ম্যানেজার হিসেবে তো এখানে ছেলেদের নিয়োগ দেওয়ার কোনো কারণ আমি খুঁজে পাই না। একই মানুষ নির্বাচক আর ম্যানেজার হলে ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়।’
এই প্রতিবেদনে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা এসেছে, তাদের মধ্যে মঞ্জু আর সজল—দুজনই এই দুই পদে ছিলেন।
উইমেন্স উইং পুরুষেরা চালান, এটা কি কোনো সমস্যা? চেয়ারম্যান রফিকুল বলেন, ‘এটা যার যার ব্যক্তিত্বের ব্যাপার, এটা সমস্যা নয়।’ তবে তিনি জানান, আট বিভাগে আটজন নারী কোচ নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, আর শিগগির দলের সঙ্গে আরও নারী যুক্ত হবেন।
বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল ক্যামেরার সামনে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হননি। তবে দ্য হুইসেলকে বলেছেন, নারী ক্রিকেটারদের নিরাপত্তায় সাধ্যমতো সব উদ্যোগ নেবেন। সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল আর অ্যাডহক কমিটির উইমেন্স উইংয়ের প্রধান রাশনা ইমামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা সাড়া দেননি। উইমেন্স উইংয়ের সাবেক প্রধান রুবাবা দৌলার কাছে প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হননি।
সব কোচ খারাপ নন, সব মেয়েও হয়রানির মুখে পড়েন না
এই প্রতিবেদন নারী ক্রিকেটের পুরো ছবি নয়। দেশের মাঠে মাঠে বহু কোচ বছরের পর বছর মেয়েদের খেলা শিখিয়েছেন, আগলে রেখেছেন। দ্য হুইসেল যে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলেছে, তাদের অনেকে কখনো হয়রানির মুখে পড়েননি। খুলনায় যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাদের অনেকে এমন কোনো অভিজ্ঞতার কথা বলেননি।
খুলনার সেই মাঠেই এখন মেয়েদের কোচিং করান আয়েশা আক্তার শুকতারা। তিনি এখন ওই বিভাগের কোচ। তার কাছে এখন পাশের বিভাগ থেকেও মায়েরা মেয়েদের পাঠাচ্ছেন।
দ্য হুইসেলকে গত ২৯ সেপ্টেম্বর শুকতারা বলেন, ‘সব কোচই খারাপ নন, ভালো কোচও আছেন। কয়েকজনের জন্য যে এনভায়রনমেন্টটা খারাপ হচ্ছে, এটা সবার নজরে রাখা উচিত।’
উইমেন্স উইংয়ের সাবেক প্রধান মিনুর হিসাবও একই—খারাপ মানুষের সংখ্যা কম, ভালো মানুষের সংখ্যাই বেশি।
সমস্যা তাই সংখ্যায় নয়। সমস্যা হলো, সেই কয়েকজন বছরের পর বছর একই চেয়ারে থেকে গেছেন। ক্লাবের কোচ ছিলেন বোর্ডের ক্যাম্পেরও কোচ। নির্বাচক ছিলেন ম্যানেজারও। অভিযোগ কানে আসার পরও বেতন বন্ধ হয়নি।
এই প্রতিবেদনে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, দ্য হুইসেল তাদের প্রত্যেকের কাছে গিয়েছে। সাইফুল বলেছেন, ‘এ রকমের কখনো আমি করিও নাই।’ মঞ্জু বলেছেন, অভিযোগগুলোর ‘কোনোটির সাথেই’ তার ‘বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা নেই’। পিলু অভিযোগ ওঠার কথা মেনেছেন, তবে প্রমাণ চেয়েছেন।
অভিযোগ অস্বীকার করা তাদের অধিকার, আর তাদের সেই বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পুরোপুরি তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু অস্বীকারেই অভিযোগ শেষ হয়ে যায় না। প্রতিটি অভিযোগ দ্য হুইসেল মিলিয়েছে একাধিক সূত্রে। সূত্রগুলো হচ্ছে সতীর্থ, প্রত্যক্ষদর্শী, পরিবার, কল রেকর্ড আর নথি।
যেখানে প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না, সেখানে সময়, স্থান, অভিযুক্তের তখনকার পদ, আর একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্যদের একই ধরনের অভিযোগ মিলিয়ে দেখা হয়েছে।
যাচাইয়ের পর যা দাঁড়ায়, তা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অস্বীকারের সঙ্গে মেলে না। ভিন্ন জেলা এবং ভিন্ন বয়সের মেয়েরা একে অপরকে না চিনেও একই মানুষের বিরুদ্ধে একই ধরনের ঘটনার কথা বলেছেন।
একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগে বোর্ডের নিজের কমিটিই প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে। দুজনকে বোর্ড সরিয়েছে ‘কিছু কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে’। আর দ্য হুইসেলের অনুসন্ধানে পাওয়া সাক্ষ্য আর নথি বলছে, এই ঘটনাগুলো ঘটেছে, আর ঘটেছে এই মানুষগুলোর হাতেই।
অভিযুক্তরা এত সহজে সবকিছু অস্বীকার করতে পারছেন কারণ কোনো স্বাধীন কমিটি কখনো তাদের অভিযোগকারীর মুখোমুখি করেনি। কোনো অভিযোগ বোর্ডের নথিতে ওঠেনি। বোর্ডের যে প্রশ্নগুলো করার কথা ছিল, সেগুলো অভিযুক্তদের প্রথমবার করেছে দ্য হুইসেল।
মিরপুরে বিসিবির কার্যালয়ের প্রতিটি দরজায় নামফলক আছে। কিন্তু ‘অভিযোগ কমিটি’ লেখা কোনো দরজা নেই। সেটি আছে শুধু একটি নীতিমালার পাতায়, যা সাইটে উঠেছে কোনো ঘোষণা ছাড়া। কুবরা জানতে চেয়েছিলেন, ‘আমি কাকে বলব?’ সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো কেউ দেয়নি।
ঢাকার খেলাঘর ক্লাবের মেয়েটি, যার গল্প দিয়ে এই প্রতিবেদন শুরু হয়েছে, তিনিও কাউকে বলতে পারেননি। সতীর্থকে না, মাকেও না। কয়েক বছর ধরে যে কথা বুকে চেপে রেখেছিলেন, দ্য হুইসেলকে তা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন। ক্রিকেট তিনি ছেড়ে দিয়েছেন।
কেন ছেড়েছেন, তার মা এখনো জানেন না। এখনো জিজ্ঞেস করেন, ‘যাচ্ছিস না কেন প্র্যাকটিসে? কবে থেকে যাবি?’