বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার আমির মাওলানা মোবারক হোসাইন আকন্দের বিরুদ্ধে জমি দখল ও অর্থ আত্মসাতসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিপুল অঙ্কের জমি দখল করে প্রশাসনকে দিয়ে উচ্ছেদ করেছেন অন্তত ৩২ জন দোকানিকে। সেখানে এখন নির্মাণ করছেন বহুতল ভবন। এ ছাড়া ‘তিতাস টাওয়ার’ নামে আরেকটি ভবনের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন তিনি।
এ নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কাছেও অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তবে এখনও কোনো প্রতিকার মেলেনি।
একই সাথে গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জোট গঠনের আগে ওই দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে মিথ্যা সংবাদ ছাপানো, অপর আসনে নিজ দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করতে উৎসাহ প্রদান এবং আরেক আসনে জোটের প্রার্থীকে অসহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে এই জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে।
জমি দখল ও উচ্ছেদ করে শতকোটি টাকার বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ
স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের মসজিদ রোডে অবস্থিত ‘চেম্বার অব কমার্স’-এর ২৫ শতক জমির ওপর গড়ে ওঠা দুই পাশের ভবন অবৈধ উপায়ে দখল করেছেন মাওলানা মোবারক হোসাইন আকন্দ। ভারতে চলে যাওয়া হিন্দু মালিকের নতুন ওয়ারিশ খুঁজে বের করে ক্রয়সূত্রে হওয়া মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করে এই জমিটি দখল করেন তিনি। তার সঙ্গে ছিলেন আরেক জামায়াত নেতা এবং মদিনা লাইব্রেরির মালিক সাবের হোসেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তৎকালীন জেলা প্রশাসক দিদারুল আলমের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে মাত্র ২০ মিনিটের নোটিশে উচ্চ আদালতের আদেশের কথা বলে ওই ভবনগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে ৩২ জন দোকানদার ও ভাড়াটিয়া নিঃস্ব হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে জমির মালিক ও সিন্ডিকেটের সাথে চুক্তি অনুযায়ী, বিনা পুঁজিতে মার্কেট ও জমির ৭৫ শতাংশ মালিকানা হাতিয়ে নেন মোবারক হোসাইন। সেখানে নির্মাণ শুরু করেন শতকোটি টাকার ভবন।
স্থানীয়রা জানান, জেলা শহরের মসজিদ রোডে অবস্থিত তিনতলা ওই ভবনটি ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া চেম্বার অব কমার্সের। ভবনটির প্রথম তলায় ১৪টি এবং দ্বিতীয় তলায় ১৮টি দোকান ছিল। আর তৃতীয় ছিল চেম্বার্স অফিস। জমিটির মোট পরিমাণ ২৫ শতক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই জমির আদি মালিক ছিলেন একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি। তিনি জমিটি বিক্রি করে ভারতে চলে যাব। জমির ক্রেতা ছিল চেম্বার অব কমার্স। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আদি মালিকের নতুন ওয়ারিশ খুঁজে বের করে তাকে দিয়ে মামলা দায়ের করান সাবের ও মোবারক হোসাইন। আদালত ওয়ারিশের পক্ষে রায় দিলে মাত্র ২০ মিনিটের নোটিশে ভবনটি গুড়িয়ে দেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক দিদারুল আলম। জুলা অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে মোবারক হোসাইনের সঙ্গে দিদারুল আলমের বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। দোকানদারদের অভিযোগ, সেই সম্পর্কের জেরে প্রায় বিনা নোটিশেই তাদের উচ্ছেদে সহায়তা করেন জেলা প্রশাসক।
আদালতের রায়ে জমির মালিনা পান স্থানীয় লিলুর ছেলে নির্মল পাপ্পু। তবে জমি ‘উদ্ধার’ করে দেয়ার আগে তার সঙ্গে জেলা জামায়াত আমির ও সাবের হোসেনের চুক্তি হয়। সে চুক্তি অনুযায়ী মামলা পরিচালনাসহ যাবতীয় আর্থিক ব্য্যভার বহন করেন সাবের। আর জমির মালিকানা পেয়ে অর্ধেক দাবি করে বসেন সাবের ও মোবারক। এছাড়া ওই জমির ওপর বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে অর্থ লগ্নির ঘোষণা দিয়ে সেখান থেকেও অর্ধেক দাবি করেন মোবারক হোসাইন আকন্দ। এ হিসেবে মোট ৭৫ শতাংশের মালিক বনে যান এই দুজন। পরবর্তীতে আরও অতিরিক্ত ৫ শতাংশ চান জেলা জামায়াত আমির। তবে ওই সময় এই শর্তে রাজি হতে বাধ্য হন পাপ্পু।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উচ্ছেদ হওয়া এক দোকানদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জামায়াতের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা কিছুই বলতে পারেননি। এছাড়া পাপ্পু তাদের গুটি হিসেবে ব্যবহার হলেও পরে জমির মালিকানা হারিয়ে ফেলেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রতিবাদ করলে বাকিটুকুও পাবে না বলে সেও চুপচাপ মেনে নেয়। এভাবেই বিনা পুঁজিতে কোটিপতি বনে গেছেন মোবারক হোসাইন আকন্দ।
এদিকে ওই ভবনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য জেলা জামায়াত আমির অস্বীকার করে আসছেন বলে জানিয়েছে একটি দলীয় সূত্র। তাদের দাবি, হিন্দু লোক কিংবা সাবের মিয়া প্রকাশ্যে অবৈধ দখলকৃত ভবনের মালিক হলেও, তাদের নেপথ্যে মূলহোতা হিসেবে কাজ করছেন মোবারক। এছাড়া ওই ভবনের ম্যানেজার কাম কেয়ারটেকার মো. জয়নাল মোবারকের সম্পৃক্ততার তথ্য স্বীকার করেছেন।
একইসাথে শতকোটি টাকার এই ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড অমান্যের অভিযোগ উঠেছে। এতে পার্শ্ববর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামে মসজিদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। মসজিদ কমিটির একাধিক সভায় এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানিয়েছে একটি সূত্র।
এ বিষয়ে মসজিদ কমিটি সদস্য মো. সাব্বির খান বলেন, মসজিদের সাথে নির্মাণাধীন বহুতল ভবনটি বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি করা হয়নি। জামায়াত নেতাদের নিয়ন্ত্রণেই এই বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে। নিয়মবহির্ভূত যেকোনো কাজই অন্যায়, আমরা অন্যায়ের বিচার চাই।
তিতাস টাওয়ারের অর্থ আত্মসাৎ
মোবারক হোসাইন আকন্দ ব্রাহ্মণবাড়িয়া মসজিদ রোডে অবস্থিত ‘তিতাস টাওয়ার’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ২০২২ সালের শেষ নাগাদ ওই ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। কিন্তু গত চার বছর ধরে এর পূর্ণাঙ্গ হিসাব অংশীদারদের বুঝিয়ে দেননি তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ভবনের একজন অংশীদার বলেন, এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ অংশীদাররা একাধিকবার যোগাযোগ করেও সুরাহা না পেয়ে কেন্দ্রীয় জামায়াতের নিকট লিখিত অভিযোগ করেছেন, যা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনে দলীয় আদেশ অমান্য
গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোবারক হোসাইন আকন্দের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে নেতাকর্মীদের মধ্যে। জোটের সম্ভাব্য প্রার্থীর বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও অর্থের বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশের নির্দেশ, জোটের আরেক প্রার্থীকে অসহযোগিতা এবং খোদ দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা প্রদানের পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী ও দেশবরেণ্য আলেম হাফেজ মাওলানা নেসার আহমেদকে ‘দুষ্কৃতিকারী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশনের জন্য কয়েকজন সাংবাদিককে নির্দেশ দেন তিনি। সে সময় জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন একসাথে জোটবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছিল। যদিও পরবর্তীতে ওই জোট আর হয়নি।
এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জোটের চূড়ান্ত প্রার্থী ও এনসিপি নেতা আশরাফ মহাদীকে সহযোগিতা না করে গোপনে নিজ দলের নেতাকর্মীদের তাকে ভোট না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মোবারক হোসাইনের বিরুদ্ধে। একইসাথে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর-বিজয়নগর) আসনে নিজ দলীয় প্রার্থী জুনায়েদ হাসানের বিরুদ্ধে মামলার জন্য এনসিপির প্রার্থী মো. আতাউল্লাহকে উৎসাহ ও পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব নিয়ে চাপা ক্ষোভ আছে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা জামায়াতের একজন নেতা বলেন, গত ১৫ বছরের রাজনৈতিক দমন-পীড়নের সময়েও মোবারক হোসাইনের বিরুদ্ধে বড় কোনো মামলা বা গ্রেপ্তারের ঘটনা না ঘটার পেছনে জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল আলম খোকন এবং সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিনের সাথে তার গোপন যোগাযোগের গুঞ্জন রয়েছে। ওই সময়ে যখন নেতাকর্মীরা ঘরে থাকতে পারছিল না, তখনও বিনা বাধায় চলাফেরা করতেন মোবারক হোসাইন আকন্দ।
এসব বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জামায়াত আমির মোবারক হোসাইন আকন্দ কল রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।